এ যেন মেঘনা চাইতেই জল। এ সময় অদূরে খালের ধারে দেখা গেল আন্তনিওকে। এ সময় তাকে এখানে দেখতে পেয়ে সেটাকে দৈব যোগাযোগ বলে মেনে নিলেন ব্যাসানিও। তিনি আশায় রইলেন এই ভেবে যে এবার তার কার্যোদ্ধার হবে। কিন্তু আন্তনিওকে দেখেও না দেখার ভান করল শাইলক। সে এমন ভাব দেখাতে লাগল যেন ধারের ব্যাপারটা নিয়ে সে চিন্তামগ্ন।
কাছে এসে আন্তনিও ব্যাসানিওর কাছে জানতে চাইলেন সে কোনও আশার আলো দেখতে পেয়েছে কিনা। ব্যাসিনিও জনাস্তিকে তার বন্ধুকে জানাল এই মাত্র শাইলকের সাথে কথা হয়েছে এবং মনে হয় সে রাজি আছে। তখন শাইলককে উদ্দেশ করে বললেন আন্তনিও, ওহে শাইলাক! তুমি আমাদের এই উপকারটা করবে কি?
সুপ্তোত্থিতের মতো আন্তনিওর দিকে তাকিয়ে বলল শাইলক, এক বছরের জন্য এক হাজার ডুকট, তাই না? বাধা দিয়ে বললেন ব্যাসানিও, না হে, তিন মাসের জন্য তিন হাজার ডুকাট। আর তার জন্য জামিন হবেন আন্তনিও — এ কথা তো বারবার বলেছি তোমায়! একটু আগেই তো তুমি বলেছিলে আন্তনিওর সাথে দেখা হলে ভালো হয়। এই তো তিনি এসে গেছেন। এবার তোমার যা জিজ্ঞেস করার তা করে নাও।
ব্যাসানিওর কথা যেন শুনতেই পেল না। শাইলক। সে আপন মনে বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল। ব্যাসানিও স্পষ্ট শুনতে পেলেন শাইলকের কথা। সে বলছিল, আমি কুত্তা? কুত্তার কি টাকা থাকে? সে কি কাউকে তিন হাজার ডুকাট ধার দিতে পারে? তিন মাস কেন, এক মাসের জন্যও সে তা পারে না। অথচ এই কুত্তার কাছেই এসেছেন অভিজাত বংশীয় মাননীয় খ্রিস্টান ভদ্রলোকেরা….।
ব্যাসানিও রেগে গিয়ে বললেন, কী বলছি তুমি?
শাইলক উত্তর দিলেন, বলছি আমি তো একটা কুত্তা। মহামান্য আন্তনিও হাজার বার আমায় কুত্তা বলে গালাগাল দিয়েছেন। প্রকাশ্যে হাজার লোকের সামনে তিনি একাজ করেছেন। অথচ আমার কী অপরাধ তা আমি জানি না। তিনি বলেছেন টাকা ধার দিয়ে সুদ নেওয়া কুত্তার কাজ। আমার অভিমত অকারণে আমি কেন টাকা ধার দেব। লোকের উপকারের জন্য? বেশ তো, আমি যখন লোকের উপকার করতে যাব, তখন লোকেরাও উচিত প্রতিদানে আমার উপকার করা। বিনামূল্যে কারও কাছ থেকে কিছু নেওয়া কি উচিত? উপকার চাইলে তার দাম দিতে হবে। সেই দামটাই সুদ। দাম না দিয়ে রুটি, মাংস কিছুই কেনা যায় না। অথচ যারা রুটি বেচে, মাংস বেচে টাকা নেয়, কই মহামান্য আন্তনিও তো কখনও তাদের কুত্তা বলেন না!
শাইলকের কথা শুনে রীতিমতো রেগে গেলেন আন্তনিও। তিনি বললেন, এ কথা ঠিক যে আমি তোমায় কুত্তা বলেছি। তবে রুটি বেচে পয়সা নেওয়া আর ধার দিয়ে সূদ নেওয়া এক কথা নয়। আর তোমার সুদের চাপাটাও খুব কম নয়। আমি নিজের চোখেই দেখেছি। ওই চাপে পড়ে কত লোক পথের ফকির হয়ে গেছে। আমি নিজে সুদ নেই না, সেজন্য প্রচণ্ড ঘৃণা করি সুদখোর লোককে। তাদের মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি তোমাকে। আমি তোমায় কুত্তা বলেছি আর চিরকাল বলব সে কথা। তোমার কাছে ধার চাইছি বলে তুমি মনে কর না যে অন্যভাবে আমি তোমায় সম্বোধন করব।
কুটিল হেসে শাইলক বলল, তবুও তুমি আমার কাছ থেকে ধারা পাবার আশা করা? কেন করব না, বললেন আস্তানিও, কারণ ওটাই তো তোমার পেশা। তোমার কাছ থেকে টাকা নিলে তো তোমারই উপকার হয়। কেউ টাকা ধার না নিলে সুন্দ পাবে কোথায়? আর সুদ না পেলে তুমি দু-দিনেই গুকিয়ে যাবে, তবে অভাবে নয়, মনস্তাপে। টাকা ধার নিয়ে আমি তার সুন্দ দেব, তাহলে কেন ধার দেবে না তুমি? আমি সুদ দেব আবার কুত্তা বলে তোমায় গালাগাল দেব। তবুও তুমি হাসিমুখে ধার দেবে! এবার বল কত সুদ চাও তুমি। আমি তোমায় এত চড়া সুন্দ দিতে রাজি আছি যা তুমি আজ পর্যন্ত কারও কাছ থেকে পাওনি। চড়া সুদ আমি এজন্যই দেব যাতে রিয়ালতোর উপর দাঁড়িয়ে বলতে পারি, তোমরা সবাই দেখ ওই কুত্তা শাইলক আমার কাছ থেকে কীরূপ চড়া সুন্দ আদায় করেছে। তুমি স্বপ্নেও ভেব না। ধার চাইছি বলে আমি তোমায় বন্ধুভাবে মেনে নিচ্ছি। আর তুমিও আমায় বন্ধু ভেবে ধার দিও না। মনে কর শক্রকে বিপদে ফেলার আশায় তুমি তাকে ধার দিচ্ছি।
এরপর গভীর হয়ে বললেন আন্তনিও, কিন্তু তোমার সিদ্ধান্তটা তো জানা গেল না। স্পষ্ট করে বল তুমি আমায় টাকা ধার দেবে কিনা?
গভীর মনস্তাপের সাথে বলল শাইলক, টাকা দেব না কেন? তোমাদের যখন দরকার তখন নিশ্চয়ই দেব। তবে আমার নিয়ম হচ্ছে ধার দিয়ে সুদ নেওয়া আর তোমাদের হচ্ছে সুদ না নেওয়া। বেশ তো তোমাদের নিয়মই আমি মেনে নিচ্ছি। এক পয়সাও সুদ নেব না আমি। এতে যদি তোমাদের বন্ধুত্বের কিছুটাও পেতে পারি, আমার বিবেচনায় সেটাই পরম লাভ।
শাইলকের কথা শুনে প্ৰথমে বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি আন্তনিও। তবে কি শাইলক সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা এতদিন ধরে মনে পুষে রেখেছেন তিনি? তবে কি সত্যিই ও খারাপ লোক নয়? বেশ তো, ফলেন পরিচিয়তে। এই ধারের ব্যাপারটাতেই বোঝা যাবে ওর আসল পরিচয়।
শাইলক বলল, বেশ তো শুভস্য শীঘ্ৰং। তবে আমার কাছে তো অত টকা নেই। কাছেই আমার এক আত্মীয় আছে তার নাম তুবাল। যা কম পড়বে তা ওর কাছ থেকে নিয়ে নেব। যাই, ওর বাড়ি থেকে বাকি টাকাটা নিয়ে আসি। তোমরা এর মধ্যে উকিলের কাছে গিয়ে দলিল লেখা পড়ার কাজটা সেরে ফেল। সুন্দ-ফুদ নয়, দলিলে শুধু একটা কথা লেখা থাকবে-অবশ্য সেটা তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়— দলিলে তোমরা শুধু লিখে দিও যদি তিনমাসের মধ্যে টাকাটা পরিশোধ না হয় –অবশ্য আন্তনিওর কাছ থেকে টাকাটা আমি নেব, ব্যাসানিওকে অকারণ জড়ােব না। এর মধ্যে — যে জমিনদার প্রকারান্তরে সেই দেনাদার। তাই দলিলটা আন্তনিওই দেবেন। –আর সুদের পরিবর্তে স্রেফ তামাশার জন্যই একটা শর্ত লেখা হবে তাতে যে….।
