আন্তনিওর কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন ব্যাসানিও। তিনি বললেন, কী বলছি হে? তিন হাজার ডুকাট টাকা তোমার কাছে নেই? এ কথা কি বিশ্বাসযোগ্য? অন্য কেউ হলে না হয় ভাবতাম আমায় সাহায্য করবে না বলে অর্থাভাবের অজুহাত দিচ্ছে। কিন্তু তোমার সম্বন্ধে সে কথা মনে আনাও পাপ। তোমাকে আমি বহুদিন ধরে চিনি। তোমার সম্বন্ধে আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে?
আন্তনিও বললেন, তুমি যদি আমায় চেন, তাহলে বিশ্বাস কর আমার কথা। এই মুহূর্তে তিন হাজার ডুকাটি আমার হাতে নেই। তা বলে কি নিঃস্ব, মোটেই নয়। আমার সম্পত্তি আছে বইকি। গুদামভরা পণ্য রয়েছে, সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে আমার বিশাল বিশাল জাহাজ। নিঃস্ব না হলেও এখন আমার হাতে নগদটাকা নেই। তিন হাজার ডুকাট কেন, দু-মাস বাদে এলে আমি ত্ৰিশ হাজার ডুকাটিও অক্লেশে তুলে দিতে পারব তোমার হাতে। কিন্তু এই মুহূর্তে তিন হাজার কেন, তিনশো। দিতেও আমি অপারগ। আন্তনিওর কথা শুনে নিরাশ হয়ে বলল ব্যাসানিও, দুমাস বাদে পোর্সিয়া কি আর আমায় বিয়ে করতে রাজি হবে? তুমি তো জান না পৃথিবীর নানা দেশ থেকে পাণিপ্ৰথীরা এসে হাজির হয়েছে। বেলমন্টের প্রাসাদে। তাদের অনেকেই নানা গুণ–সম্পন্ন, নেপলসের রাজাও রয়েছেন তাদের মাঝে। তাছাড়া রয়েছেন জার্মানির কাউন্ট প্যালাটাইন, ফরাসিদের একজন, ব্রিটেনের একজন এবং স্কটল্যান্ডের একজন জমিদার, এমনকি মিশরের একজন প্রতিনিধিও এসেছেন। খানকতক মমি উপহার নিয়ে। এতসব প্রার্থীকে বাতিল করে পোর্সিয়া দুমাস অবিবাহিতা থাকবেন। এ আশা আমি করি না।
এতসব নামি প্রার্থীর কথা শুনে সত্যিই ভয় পেয়ে গেল আন্তনিও। সত্যিই তো, যে কোনও সময় ঠিক হয়ে যেতে পারে পোর্সিয়ার বিয়ে। তাহলে তো ছাই পড়বে ব্যাসানিওর সব আশায়।
শেষমেশ তাকে বলতেই হয়, বন্ধু, তাহলে তুমি এক কাজ কর। খোজ নিয়ে দেখ কোথায় ধার পাওয়া যায় তিন হাজার ডুকাট। অবশ্য শুধু হাতে কেউ তোমায় এত টাকা ধার দেবে না। তুমি সবাইকে বলবে এই ধারের জন্য জামিন থাকবেন আন্তনিও। আশা করি তা হলে ধার পেতে অসুবিধে হবে না তোমার। দুমাসের মধ্যে আমার জাহাজগুলি ফিরে আসবে সে আশা আমি রাখি। তাহলেই সে ধার শোধ করে দেব। আমার পক্ষে কষ্টকর হবে না।
ব্যাসানিও বললেন, আর এর মধ্যে যদি পোর্সিয়ার কৃপা পেয়ে যাই তাহলে জাহাজ আসা পর্যন্ত তোমায় অপেক্ষা করতে হবে না!
আন্তনিও হা হা করে হেসে উঠে বললেন, সে তো বটেই। আশা করি জাহাজ ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না তোমায়। কিন্তু খারাপ দিকটাও ভাবা দরকার। ধর, যদি পোর্সিয়া তোমায় অপছন্দ করে তাহলেও নিরাশ হবার কিছু নেই। তুমি মহাজনের কাছে তিন মাসের সময় চাইবে। তাহলেই যথেষ্ট। আর দুমাসের মধ্যে আমার জাহাজগুলি তো এসেই যাবে। তখন এই ধার শোধ দেওয়া আমার পক্ষে মোটেই কষ্টকর হবে না।
তোমার নাম করলে আর কেউ সুদ চাইবে না, কারণ তুমি তো ধার দিয়ে সুদ নেও না, বললেন ব্যাসানিও।
আন্তনিও বললেন, আমি জানি খ্রিস্টান মহাজনেরা সুন্দ নেবে না, কারণ টাকা ধার দিয়ে সুদ নেওয়া বাইবেলে নিষিদ্ধ। তাছাড়া ভেনিসের জন সাধারণের কাছে আমার একটা ব্যক্তিগত খাতির আছে। তুমি খোজ নিয়ে দেখা খ্রিস্টান মহাজনের কাছে ধারা পাওয়া যায় কিনা। না পেলেও তাতে ভয় পাবার কিছু নেই। কোনও ইহুদি যদি ধার দিতে চায় তাহলে আমরা সেটা নেব। আমরা যে কোনও সুন্দ দিতে রাজি। কারণ আমাদের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন।
আন্তনিওর মহত্ত্বে নূতন করে মুগ্ধ হয়ে আবার ধারের চেষ্টায় বেরিয়ে পড়লেন ব্যাসানিও। আগে যারা ব্যাসানিওকে দেখলে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিত, এবার তারাই আন্তনিওর নাম শুনে খাতির করে তাকে বসিয়ে ধারের প্রস্তাবনা ভালোভাবে জেনে নিত। কিন্তু দুৰ্ভাগ্য ব্যাসানিওর, সে সময় কোনও খ্রিস্টান বণিকের হাতেই টাকা ছিল না। তাদের সবার জাহাজও সে সময় আন্তনিওর মতো সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে ব্যবসা করত। দু-মাসের মধ্যেই সব জাহাজ বন্দরে ভিড়বে। তখন আন্তনিওর নাম করে যােত ইচ্ছে ধার নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু জাহাজ না ফেরা পর্যন্ত আন্তনিওর মতো সবাই সাময়িকভাবে নিঃস্ব। কাজেই তিন হাজার ডুকাট বের করা এখন কারও পক্ষে সম্ভবপর নয়।
হতাশ হয়ে পড়লেন ব্যাসানিও। পোর্সিয়াকে বিয়ে করা আর বোধ হয় তার ভাগ্যে নেই। এই ভেনিস শহরে দুমাসের আগে টাকা পাবার কোনও আশা নেই। আর এই দুমাসের মধ্যে পোর্সিয়ার পাণিপ্রার্থীরা কেউ সফল হবে না, এ আশা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।
বণিকদের দ্বারে দ্বারে ধার চেয়ে বিফল হয়ে একদিন অপরাস্তুে যখন বাড়ি ফিরে আসছেন। ব্যাসানিও, এমন সময় খাল ধার থেকে কে যেন ডেকে উঠল তাকে। সাথে সাথে ফিরে দাড়ালেন তিনি। দেখলেন এক লম্বা দাড়িওয়ালা নুঢুক্ত দেহ তির্যকদূষ্টির বৃদ্ধ ডাকছে তাকে। তিনি চিনতে পারলেন লোকটিকে —ও আর কেউ নয় ইহুদি শাইলক। প্যালেস্টাইনের অধিবাসীদের বলা হয়। ইহুদি। প্ৰভু যিশুর আবির্ভাব ও ধর্মপ্রচারের আগে ইহুদি ধর্ম প্রচলিত ছিল প্যালেস্টাইনে। এই ইহুদি পুরোহিতদের প্ররোচনায় যিশুখ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করেছিল রোমের শাসকেরা।
টাকা-পয়সার লেনদেনই ছিল ইহুদিদের প্রধান উপজীবিকা। ইউরোপের সমস্ত দেশেই ছড়িয়ে ছিল তারা। সমাজ ও রাষ্ট্রে আর্থিক ব্যবস্থাপনার উপর প্রচুর প্রভাব ছিল তাদের। ব্যবসা-বাণিজ্যের বড়ো একটা ধার ধারত না তারা। দুর্দশাগ্ৰস্ত লোককে টাকা ধার দিয়ে চড়া হারে সূদ নিত তারা। এই ভেনিস শহরে শাইলকের মতো নির্মম সুদখোর আর কেউ ছিল না। এমনকি অন্যান্য ইহুদিরাও তার এই অস্বাভাবিক অর্থ-লালসার জন্য ঘৃণা করত শাইলককে।
