অভিজাত বংশের সন্তান আন্তনিওর পক্ষে বিলাস-ব্যসনে থাকাটাই স্বাভাবিক। অনেক সময় তার ইচ্ছে না থাকলেও বন্ধু-বান্ধবের চিত্ত বিনোদনের জন্য বড়ো বড়ো ভোজের আয়োজন করতে হত। দেহ-সৌষ্ঠব বজায় রাখার জন্য মহার্ঘ্য বেশভূষায় সজ্জিত হতেন তিনি। অভাবগ্ৰস্ত অভিজাত যুবকদের সাহায্য করতে তিনি সব সময় প্রস্তুত থাকতেন। অনেকেই তার কাছ থেকে ধার নিয়ে আর পরিশোধ করত না। কেউ ঋণ পরিশোধ করতে এলেও তার কাছ থেকে কোনও সুদ নিতেন না তিনি।
আন্তনিওকে সর্বদাইঘিরে থাকতেন স্যালারিও, ব্যাসানিও, গ্রাসিয়ানো, লোরেঞ্জ প্রভৃতি অভিজাত বংশীয় যুবকেরা! আন্তনিওর মন ছিল যেমনি উদার তেমনি ছিল তার প্রচুর অর্থ–এই দুকারণে সবাই ইচ্ছে করত তাকে বন্ধুভাবে পেতে। সবার সাথে সুমধুর ব্যবহার করতেন স্নেহশীল আন্তনিও, যদিও তার কিছুটা পক্ষপাতিত্ব ছিল বন্ধু ব্যাসানিওর উপর।
ব্যাসানিও ছিলেন আন্তনিওর মতো এক অভিজাত বংশের সন্তান। ধন-সম্পদ তারও কিছু কম ছিল না। কিন্তু একটা বিষয়ে তার সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল আন্তনিওর সাথে। টাকা-পয়সা যতই ব্যয় করুন না কেন, ব্যবসাকে কখনও অবহেলার চোখে দেখতেন না আন্তনিও। সর্বদা সাত-সমুদ্র আলোড়িত করে ফিরত তাঁর বাণিজ্য তরী। ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতেন তিনি।
কিন্তু ভাগ্য পরীক্ষা কি করে? কোটিপতি পোসিয়ার পাণি-প্রার্থনা করতে গেলে কমসে কম লাখাপতির মতো জাকজমকের প্রয়োজন। একটা প্ৰবাদ আছে যে রাজা কোয়ান্টুরা এক ভিখারিণী মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস, শাস্ত্র বা রূপকথায় এমন কোনও উদাহরণ নেই যে একজন রানি সিংহাসন থেকে নেমে এসে একজন ভিক্ষুকের পায়ে আত্মসমর্পণ করেছেন।
মনে মনে একটা হিসাব করতে বসলেন ব্যাসানিও। পোসিয়ার পাণিপ্রার্থী হয়ে বেলমেন্টে যেতে হলে দামি সাজ-পোশাকের প্রয়োজন। সেই সাথে দশ-বারো জন জমকালো পোশাক পরা ভৃত্য, কিছু যানবাহন এবং প্রয়োজনীয় অর্থ থাকা চাই যা দিয়ে পাথেয় ও পারিতোষিক দেওয়া সম্ভব হবে। সুষ্ঠুভাবে এসব করতে গেলে অন্ততপক্ষে তিন হাজার ডুকাট স্বর্ণমুদ্রার প্রয়োজন।
হিসাব কষার পর কয়েকদিন বিষন্ন মনে চুপচাপ রইলেন ব্যাসানিও। ভাবতে লাগলেন কোথায় পাওয়া যাবে এই তিন হাজার ডুকাট স্বর্ণমুদ্রা? এক পয়সা যার সম্বল নেই সে এত টাকার অলীক স্বপ্ন দেখে কী করে?
তা ছাড়া কেইবা তাকে ধার দেবে এত টাকা? কিন্তু আশা মোহিনী। সে বারবার ব্যাসানিওর মনকে উত্তেজিত করে বলতে থাকে–একবার দেখিনা আন্তনিওর কাছে এ প্রস্তাবটা রেখে। সে ভালো লোক, তোমায় সত্যিই ভালোবাসে। আন্তনিওর কাছ থেকে তুমি টাকাটা হয়তো পেলেও পেতে পোর। তাছাড়া তুমি তো আর সে টাকাটা মেরে দিচ্ছ না। পোর্সিয়ার সাথে বিয়ে হলেই তুমি আন্তনিওর ধারা আর সেই সাথে আগের সমস্ত ধার শোধ করে দিতে পারবে। শেষমেশ বন্ধ আন্তনিওর কাছে যেতে বাধ্য হলেন ব্যাসানিও।
তিনি আন্তনিওকে বললেন, বন্ধু, তোমার কাছে ঋণের শেষ নেই আমার। অর্থ আর কৃতজ্ঞতার ঋণ উভয়ই সমান। কোনওদিন যে এসব শোধ করতে পারব সে আশা আমার নেই। এদিকে আমার যে কত শোচনীয় অবস্থা সে খবর জানা নেই তোমার। অবিলম্বে আমি যদি প্রচুর অর্থ জোগাড় করতে না পারি, তাহলে সবার সামনে অপমানিত হতে হবে আমাকে। এমন কি পাওনাদারদের নালিশের ফলে আমার কারারুদ্ধ হওয়াও আশ্চর্য নয়। এখনই এর একটা বিহিত না করলে নয়। আর তুমি ছাড়া আর কারও পক্ষে এ ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।
বন্ধুর এই করুণ অবস্থা দেখে খুবই কাতর হয়ে পড়লেন আন্তনিও। ভাবলেন, কীভাবে এ বিপদের নিরসন হতে পারে? ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইলেন ব্যাসানিওর মাথায় কোনও উপায় এসেছে কিনা। পোর্সিয়া ঘটিত ব্যাপারটা তখন আন্তনিওকে খুলে বললেন ব্যাসানিও। পোর্সিয়া যে এক সময় ব্যাসানিওর প্রতি অনুরক্তির আভাস দিয়েছিলেন সে কথাও বন্ধুকে জানাতে ভুললেন না ব্যাসানিও। তিনি হিসাব কষে বন্ধুকে দেখিয়ে দিলেন যে পোর্সিয়ার পাণিপ্রার্থী হতে গেলে সবার আগে দরকার তিন হাজার ডুকাটি স্বর্ণমুদ্রা। পোর্সিয়ার সাথে বিয়ে হলেই তিনি যে বন্ধুর প্রাপ্য সব টাকা শোধ দিয়ে দেবেন। সে কথাও বন্ধুকে জানাতে ভুললেন না ব্যাসানিও।
ধৈর্য ধরে ব্যাসানিওর সব কথা শুনলেন আন্তনিও। তারপর অসহিষ্ণুভাবে বললেন তাকে, তুমি কি আমায় চেন না যে আজ এভাবে দুঃখের কঁদুনি গাইছ? জেনে রাখ, আমার হাতে এক পয়সা থাকলে তার আধিপয়সা থাকবে তোমার প্রয়োজনের জন্য। আমি ধার হিসেবে টাকাটা তোমায় দেইনি। আর তুমি তা ফেরত দেবে সে আশাও আমি মনে স্থান দেইনি। টাকাটা ফেরত দিতে এলেও আমি তা নেব না। যদি না সে সময় প্রচণ্ড অর্থকষ্টে পড়ি।
তবে এখন এসব আলোচনা না করাই ভালো। তোমার মাথায় যে মতলবটা এসেছে তা নেহাত খারাপ নয়। অনেক দুঃস্থ যুবক মুক্তি পেয়েছে প্রেমের দেবতার কৃপায়। পাত্র হিসেবে তুমি যে অনুপযুক্ত সে কথা বলার সাহস কারও নেই। তুমি বিলাসী হলেও দুশ্চরিত্র নও। লেখাপড়া না জানলেও তুমি যে ভেনিসের প্রথম সারির অভিজাতদের একজন, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া তুমি বলছি যে বেলমন্টে থাকাকালীন পোর্সিয়া তোমার উপর কৃপাদৃষ্টি দেখিয়েছে, সে কথা সত্যি হলে তো সোনায় সোহাগা। আর তা সত্যিই না হলেও হতাশ হবার কিছু নেই। কারণ তোমাকে অগ্রাহ্য করা কোনও মেয়ের পক্ষে সম্ভবপর নয়। অনেক সময় জুয়া খেলে লাখ লাখ টাকা তুমি নষ্ট করেছ। আর এখন তিন হাজার ডুকাট টাকাও লোকসান হয়, সেটা এমন কিছু বেশি। নয়। কিন্তু মুশকিল হয়েছে কী জান অত টাকা তোমার নেই, আর আমারও নেই।
