ভেনিস শহরের বৈশিষ্ট্য এই যে এখানে কোনও রাজপথ ছিল না। ছোটো, বড়ো অসংখ্য খাল ব্যবহৃত হত লোক চলাচলের জন্য। সমুদ্রের জল সেই সব খাল দিয়ে অবাধে প্রবেশ করত গৃহস্থের অন্দরে। দু-বার জোয়ারের সময় দোকানের সিঁড়িগুলি পর্যন্ত দৈনিক ধুয়ে দিত সমুদ্রের জল। অন্যান্য শহরের রাস্তায় যেমন অগুনতি গাড়ি-ঘোড়া চলে, ভেনিসের জলপথে তেমনি দেখা যেত অসংখ্য গণ্ডোলা নৌকা। সেগুলির কোনটা থাকত যাত্রী-বোঝাই আবার কোনওটা মালে ভর্তি।
ভেনিসের এই বৈশিষ্ট্য এখনও বর্তমান। যদিও কাল ধর্মের প্রভাবে সে বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি আজ প্রায় অবলুপ্ত বললেই চলে। মধ্যযুগে ব্যবসায়িক সমৃদ্ধির কোনও সীমারেখা ছিল না। বণিকেরা সবাই ছিলেন ধনকুবের। তাদের জাহাজ পৃথিবীর সবদেশে যাতায়াত করত। ব্যাসানিও ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল স্মৃর্তি করা। ঘুমের সময়টুকু বাদ দিয়ে নাচ-গান, শিকার, জুয়ো খেলা –এরূপ একটা না একটা আনন্দে মেতে থাকতেন তিনি। পূর্বপুরুষের কষ্টার্জিত অৰ্থ এভাবেই বন্ধু-বান্ধবদের সাথে উড়িয়ে দিতেন তিনি। আন্তনিওর পক্ষে সম্ভব হত না। এ সব উৎসবে যোগ দেবার। কারণ বিলাসী হলেও তিনি ছিলেন কাজের লোক। কাজ-কর্ম নষ্ট করে এ সব উৎসবে যোগ দেবার কোনও সার্থকতা খুঁজে পেতেন না তিনি।
আয় থেকে অনেক বেশি ছিল ব্যাসানিওর ব্যয়। কাজেই তার ধনভাণ্ডার যে একদিন শেষ হবে সে তো জানা কথা। দেখতে দেখতে একদিন খালি হয়ে গেল তার ধনভাণ্ডার। কিন্তু তাতেও তার চৈতন্য হল না। ধার করেও নিজের ঠাট বজায় রাখতে লাগলেন ব্যাসিনিও।
একে একে সবই বিক্রির পর্যয়ে চলে এল —মফস্সলের জমিদারি, শহরের অতিরিক্ত ঘরবাড়ি, অপ্রয়োজনীয় জাহাজ, ব্যবহৃত আসবাবপত্র, সবই মহাজনের কাছে ধার নিতে হল তাকে আর সবশেষে আন্তনিওর কাছে ধার।
ধার করে এই রাজসিক ব্যয়ভার বেশিদিন টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই মাঝে মাঝে অর্থকষ্ট দেখা দিতে লাগল ব্যাসানিওর। এর একটা উপায় খুঁজে বের করতেই হবে তাকে। হয় তাকে অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে, নইলে বাবুগিরি ত্যাগ করতে হবে। খুবই সঙ্কটের মাঝে পড়ে গেল ব্যাসানিও। আর কতই বা ধার নেওয়া যায় আন্তনিওর কাছ থেকে! বন্ধুর কাছে হাত পাততে খুবই লজ্জা হয় ব্যাসানিওর।
কী করে নিজের ভাগ্য ফেরানো যায় সে কথাই সব সময় চিন্তা করেন ব্যাসানিও। বন্ধুরা তো সবাই সুখের পায়রা। তাদের কাছে সাহায্য চেয়ে কোনও লাভ নেই। প্রকৃত হিতৈষী বলে যদি কেউ থাকে তবে তা আন্তনিও। তিনি সর্বদাই বলেন, তুমি এর একটা উপায় বের কর বন্ধু। আর সে কাজে সাফল্য অর্জন করতে গেলে যা যা সাহায্য, সহযোগিতার দরকার আমার কাছ থেকে তুমি তা পাবে। কিন্তু বেচারা ব্যাসানিওর মাথায় কোনও মতলবই আসছে না।
শেষে একদিন ভগবান মুখ তুলে চাইলেন তার দিকে। বেলমন্ট গ্রামে মারা গেলেন এক ভদ্রলোক। তিনি ছিলেন সে গ্রামের জমিদার, সেই সাথে কোটিপতি। এই ভদ্রলোকটির বাড়িতে একসময় দু-চার দিনের জন্য আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন ব্যাসানিও।
এই মৃত জমিদারের আপনজন বলতে ছিলেন তার একমাত্র মেয়ে পোর্সিয়া। পিতার অগাধ সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী ছিলেন তিনি। তখনও পর্যন্ত বিয়ে হয়নি তার। যার গলায় তিনি বরমাল্য দেবেন। সে হবে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী। শুধু ধন-সম্পদে নয়, রূপ-গুণেও তিনি ছিলেন সেরা। প্ৰভাতের মতো নির্মল আর পবিত্র ছিল তার সৌন্দর্য। মন থেকে তাকে এখনও পর্যন্ত মুছে ফেলতে পারেননি ব্যাসানিও। তার মনে হয় সে সময় পোর্সিয়ার সামান্য কৃপাদৃষ্টি পড়েছিল তার উপর।
সম্প্রতি পিতৃবিয়োগ হয়েছে পোর্সিয়ার। পিতার অগাধ সম্পত্তির একমাত্র অধিকারিণী তিনি। আর ব্যাসানিওকে আজ কপর্দকশূন্য বললেও কম বলা হয়। দেনার দায়ে মাথার চুল বিকিয়ে গেছে তার। খুব শীঘ্র প্রচুর টাকার ব্যবস্থা না হলে পাওনাদারদের হাতে লাঞ্ছনার সীমা থাকবে না তার। কারাবাস তো স্বাভাবিক ব্যাপার, আর তা হলে অভিজাত বংশের সন্তান ব্যাসানিওর পক্ষে আত্মহত্যা ছাড়া গতি নেই।
এই সংকট থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র উপায় পোর্সিয়াকে বিয়ে করা। তাহলে শুধু সংকটমোচন নয়, জীবনে আর অর্থকষ্টের সম্মুখীন হতে হবে না। তাকে। বিলাস-ব্যসনে অপার আনন্দে কেটে যাবে তার জীবনের দিনগুলি।
এ কি নিছক দুরাশা? এক সময় পোর্সিয়া তাকে অনুগ্রহ করতেন বলে মনে পরে ব্যাসানিওর। কিন্তু সময় বদলে গেছে। তখন পোর্সিয়া নিজে ধনী হয়ে ওঠেনি। ব্যাসানিও তখন ছিলেন বিত্তশালী, স্মৃর্তিবাদ। আজ অভাবে তিনি ক্লান্ত। চেহারা, মেজাজ রুক্ষ। পোর্সিয়াকে আকর্ষণ করার শক্তি অপহৃত। তবু ভরসা পোর্সিয়া হালকা মানসিকতার মেয়ে নয়। সে একবার মন দিয়েছিল কাকে তাকে নিশ্চয়ই এত তাড়াতাড়ি ভুলে যায় নি। সুতরাং ভাগ্য নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া যেতে পারে।
এই ভেনিসীয় বণিকদের মধ্যে সবার শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন আন্তনিও। একদিকে তিনি ছিলেন প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী, অন্যদিকে সেই ঐশ্বর্যের সদ্ব্যবহারে মুক্তহস্ত ছিলেন তিনি। তার দরজা থেকে কখনও বিমূখ হয়ে কেউ ফেরেনি। আর্তের সেবায় এগিয়ে যাওয়াটাকেই তিনি নিজের পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করতেন।
