বেনেডিকের আহ্বান সম্পর্কে রাজপুত্র ও ক্লডিও কথা বলছেন, এমন সময় এক ম্যাজিস্ট্রেট বোরাশিওকে বন্দী করে ধরে আনলেন রাজপুত্রের সামনে। ডন জনের বদমায়েশি নিয়ে আরেকজনের কাছে বড়াই করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল সে।
ক্লডিওর সামনে বোরাশিও সব স্বীকার করল। জানাল, মার্গারেটকে সে-ই হিরোর পোষাক পরে জানলায় দাঁড়াতে বলেছিল, যাতে সবাই তাকে হিরো মনে করে। ক্লডিও ও রাজকুমার তাই-ই ভেবেছিলেন। যেটুকু সন্দেহ রয়ে গিয়েছিল, সেটুকুও কেটে গেল ডন জনের পলায়নের সংবাদে। বদমায়েশি ধরা পড়ে যাওয়ায় ভাইয়ের রাগের হাত থেকে বাঁচতে সে মেসিনা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
ক্লডিও বুঝলেন যে, হিরোর বিরুদ্ধে আনা তাঁর অভিযোগগুলি ভিত্তিহীন ছিল। আর এই কড়া কথাগুলিই হিরোর মৃত্যুর কারণ হয়েছে ভেবে কিন্তু দুঃখে কাতর হয়ে গেলেন। তাঁর মনে পড়ল হিরোর ছবি। মনে পড়ল, তাকে প্রথম ভালবাসার কথা। রাজকুমার জিজ্ঞাসা যখন করলেন, কথাগুলি তাঁর মনে ইস্পাতের ফলার মতো বিঁধেছে কিনা, ক্লডিও উত্তরে বললেন, বোরাশিও কথা শুনে তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি যেন নিজের গলায় বিষ ঢালছেন।
অনুতপ্ত ক্লডিও বৃদ্ধ লিওনেটোর কাছে তাঁর সন্তানকে অপমান করার জন্য ক্ষমা চাইলেন। বললেন, লিওনেটো যা শাস্তি দেবেন, তাই তিনি মেনে নেবেন। তিনি নিজের বাগদত্তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন, তার জন্যই তাঁকে শাস্তি সহ্য করতে হবে।
লিওনেটো তাঁকে শাস্তি দিলেন। শাস্তি হল, পরদিন ক্লডিওকে হিরোর খুড়তুতো বোনকে বিয়ে করতে হবে। কারণ সে-ই এখন লিওনেটের উত্তরাধিকারিণী এবং সে-ও অনেকটা হিরোরই মতো। ক্লডিও লিওনেটোর কাছে শপথ করে বলল, এই অপরিচিতা যদি ইথিওপও হন, তাহলেও তিনি তাঁকে বিবাহ করবেন। তাঁর হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। সারা রাত তিনি কাঁদলেন। লিওনেটো হিরোর জন্য যে সমাধিসৌধটি বানিয়েছিলেন, সেখানে বসে বিলাপ করতে লাগলেন।
সকালবেলা রাজকুমার ক্লডিওকে নিয়ে গেলেন গির্জায়। সেখানে সেই পাদ্রি, লিওনেটো ও তাঁর ভাইঝি আগেই উপস্থিত হয়েছিলেন দ্বিতীয় বিবাহোৎসবে। লিওনেটো ক্লডিওর হাতে সমর্পণ করলেন প্রতিশ্রুত বধূকে। বধূর মুখে ছিল একটি মুখোশ, যাতে ক্লডিও মুখটি চিনতে না পারেন। ক্লডিও মুখোশ-পরিহিতা মেয়েটিকে বললেন, “এই পবিত্র পাদ্রির সামনে তোমার হাতটা আমায় দাও। আমি তোমার স্বামী হব, যদি আমাকে বিবাহ কর।” অপরিচিতা বলল, “যতদিন বাঁচি, তোমার স্ত্রী হয়েই যেন বাঁচি।” এই বলে সে মুখোশটি খুলল। সে প্রমাণ করল যে, সে লিওনেটোর ভাইঝি নয়, স্বয়ং তাঁর কন্যা লেডি হিরো। আমরা নিশ্চিত যে, তাকে দেখে ক্লডিও খুব অবাক হয়েছিলেন। তিনি হিরোকে মৃত মনে করেছিলেন। তাই আনন্দে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। রাজপুত্রও সমান আশ্চর্য হয়েছিলেন। তিনি বলে উঠলেন, “এই কী সেই হিরো নয়, যে হিরো মারা গিয়েছিল?” লিওনেটো বললেন, “প্রভু, সে তো মারা গিয়েছিল, কিন্তু তার বদনামটা বেঁচে ছিল।” পাদ্রি বললেন, অনুষ্ঠানের শেষে তিনি এই আপাত কেরামতের ব্যাখ্যা দেবেন। তিনি বিবাহের অনুষ্ঠান চালিয়ে গেলেন। মাঝখান থেকে উদয় হলেন বেনেডিক। তিনি একই সময় বিয়াত্রিসকে বিয়ে করতে চাইলেন। বিয়াত্রিস তখন আপত্তি জানাল। বেনেডিক বললেন, হিরোর কাছ থেকে তিনি জেনেছিলেন যে বিয়াত্রিস তাঁকে ভালবাসে। একটা মজাদার ব্যাখ্যা দেওয়া হল। দেখা গেল দু’জনকেই কৌশলে প্রেমের ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। তাঁরা কেউ কাউকে ভালবাসতেন না। কিন্তু মিথ্যা এক ঠাট্টার বশে তাঁরা একে অপরের প্রেমের পাশে বাঁধা পড়েছিলেন। কিন্তু এই প্রেম যতই ঠাট্টার ফসল হোক না কেন, এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে কোনো গম্ভীর ব্যাখ্যাও তাকে টলাতে পারল না। বেনেডিক যেহেতু বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কোনো কিছুই তাঁকে বিবাহের সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারল না। তিনি ঠাট্টাটা বজায় রাখলেন। বললেন, দয়া করেই বিয়াত্রিসকে বিয়ে করছেন তিনি। কারণ তিনি শুনেছিলেন, তিনি বিয়াত্রিসকে বিয়ে না করলে, সে দুঃখেই মরে যাবে। বিয়াত্রিস বলল, সে বেনেডিকের প্রাণ বাঁচাতে তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল কারণ সে শুনেছিল, তার জন্য নাকি বেনেডিক খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। এইভাবে দুই পাগলের চার হাত এক হল ক্লডিও ও হিরোর বিবাহের পর। বৃত্ত সম্পূর্ণ করার জন্য, সব বদমায়েশির মাথা ডন জনকে মেসিনায় আবার ধরে আনা হল। ওই খিটখিটে লোকটাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য মেসিনায় তার ব্যর্থ ষড়যন্ত্র এবং সেখানকার আনন্দময় ভোজসভার সাক্ষী করে রাখা হল তাকে।
মার্চেন্ট অব ভেনিস
আসলে ইতালি দেশটা একটা উপদ্বীপ। উত্তর ছাড়া অন্য তিন দিক দিয়েই একে বেষ্টন করে। আছে ভূমধ্যসাগরের জলরাশি। আদ্রিয়াতিক উপসাগর হিসেবেই পরিচিত সমুদ্রের পূর্ব অংশটি। ভূগোলের ছাত্ররা সবাই এটা জানে। তারা এও জানে এরই উপর অবস্থিত মধ্যযুগীয় ইউরোপের শ্রেষ্ঠ বাণিজ্য নগর ভেনিস।
শুধু উপরে নয়, আদ্রিয়াতিক সাগরের ভেতরে অবস্থিত ভেনিস নগরী। এভাবেই কথাটা ঘুরিয়ে বলা চলে আদ্রিয়াতিক শুধু যে ভেনিসের নাড়িতে আর রন্ধেরন্ধে প্রবেশ করেছে তাই নয়, সমুদ্র আর নগর যেন একাকার হয়ে মিশে গেছে। এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে সুন্দর একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেবার প্রথা প্রচলিত ছিল ভেনিস নগরে। প্রতি বছর একটা বিশেষ দিনে বিবাহ বন্ধনের প্রতীক হিসেবে একটা মহামূল্য রত্নাঙ্গুরীয় জলে নিক্ষেপ করতেন ভেনিসের শাসনকর্তা ডোগবা ডিউক।
