মেসিনার রাজপ্রাসাদে বাস করত দুই মেয়ে – মেসিনার গভর্নর লিওনেটোর কন্যা হিরো ও ভাইঝি বিয়াত্রিস।
বিয়াত্রিস ছিল মিশুকে স্বভাবের। কিন্তু তার বোন হিরো ছিল গম্ভীর প্রকৃতির মেয়ে। বিয়াত্রিস সবসময় তার বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তার মাধ্যমে মাতিয়ে রাখত বোনকে। যা কিছু ঘটত, অবধারিতভাবে তাকে হাসির খোরাক করে তুলত বিয়াত্রিস।
সেবার এক যুদ্ধের শেষে ঘরে ফেরার পথে সেনাবাহিনীর একদল উচ্চপদস্থ তরুণ যোদ্ধা মেসিনায় লিওনেটোর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন অ্যারাগনের রাজকুমার ডন পেড্রো, তাঁর বন্ধু ফ্লোরেন্সের লর্ড ক্লডিও এবং পাদুয়ার লর্ড বেনেডিক। এই শেষোক্ত ব্যক্তিটি ছিলেন যেমন বুদ্ধিমান, তেমনই উচ্ছৃঙ্খল।
এঁরা সবাই আগেও মেসিনায় এসেছিলেন। অতিথিবৎসল গভর্নর তাঁর মেয়ে ও ভাইঝির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাঁর এই পুরনো বন্ধুদের।
প্রাসাদে পৌঁছেই বেনেডিক লিওনেটো ও রাজকুমারের সঙ্গে মশকরা জুড়ে দিলেন। লোকের কথার মধ্যে নাক না গলিয়ে থাকতে পারত না বিয়াত্রিস। সে বেনেডিকের কথার মাঝখানে বলে বসল, “এ কী সিনিওর বেনেডিক, আপনি তো বকেই চলেছেন! দেখুন, কেউই আপনার কথা শুনছেন না!” বিয়াত্রিসের মতোই প্রত্যুৎপন্নমতি বেনেডিক। কিন্তু এহেন অভিনব অভিবাদন তাঁর ভাল লাগল না। তাঁর ধারণা ছিল, এমন বাচালতা ভদ্রনারীর পক্ষে শোভনীয় নয়। তাঁর মনে পড়ে গেল, আগের বার যখন তিনি মেসিনায় এসেছিলেন, তখন এই বিয়াত্রিস বেছে বেছে তাঁরই পিছনে লেগেছিল। বেনেডিক ও বিয়াত্রিস যে পরিমাণ স্বাধীনতা নিয়ে রঙ্গতামাশা করতেন, ঠিক ততটা আর কেউই করতে পারতেন না। তাই এই দুই তীক্ষ্মবুদ্ধিধর বাগযোদ্ধার মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া লেগে থাকত, যার অবশ্যম্ভাবী ফল হত পরস্পরের সাময়িক মনোমালিন্য ও বিচ্ছেদ। বিয়াত্রিসের উপস্থিতি তিনি এতক্ষণ খেয়াল করেননি। কিন্তু যে মুহুর্তে বিয়াত্রিস তাঁকে কথার মাঝপথে থামিয়ে কেউ তাঁর কথা শুনছেন না বলে খোঁটা দিল, অমনি তার উপস্থিতি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করলেন বেনেডিক। তিনিও পালটা জবাব দিলেন, “এই যে শ্রীমতী অবজ্ঞা দেবী, আপনি এখনো বেঁচে আছেন?” ব্যস! পুরনো যুদ্ধ নতুন করে বেধে গেল। লম্বা লম্বা সব যুক্তির ঝনঝনা শোনা গেল। সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিজের কৃতিত্ব সম্পর্কে বড়াই করতেন বেনেডিক। বিয়াত্রিস সেই কথা জানত। সে বলল, যুদ্ধে যতজনকে বেনেডিক মেরেছেন, সবাইকে সে একাই খেয়ে ফেলতে পারে। রাজকুমার বেনেডিকের কথায় মজা পাচ্ছেন দেখে সে বেনেডিককে বলে বসল ‘রাজকুমারের ভাঁড়’। বিয়াত্রিসের অন্য কথাগুলির চেয়ে এই কথাটিই সবচেয়ে বেশি বিঁধল বেনেডিকের। তিনি ভাবলেন, তাঁর হাতে নিহতদের খেয়ে ফেলার কথা বলে বিয়াত্রিস আসলে তাঁকে কাপুরুষ বলে ইঙ্গিত করল। তিনি ভুলেই গেলেন যে, আদতে তিনি একজন বড়ো মাপের যোদ্ধা। আসলে, ভাঁড়ামির অপমানে যে দারুণ বুদ্ধিমত্তা লুকিয়ে থাকে তার থেকে মারাত্মক আর কিছুই হয় না। কারণ, এই সব ক্ষেত্রে আনীত অভিযোগগুলির মধ্যে সত্যতা বিশেষ থাকে না। এই জন্যই বিয়াত্রিস তাঁকে ‘রাজকুমারের ভাঁড়’ বলায় তার উপর হাড়ে চটলেন বেনেডিক।
মৃদুস্বভাবা হিরো অবশ্য বিশিষ্ট অতিথিদের সামনে চুপ করেই রইল। সে তখন সুন্দরী যুবতী। তার রূপলাবণ্যে মোহিত হয়ে গেলেন ক্লডিও। অবশ্য রাজকুমার তখন বেনেডিক ও বিয়াত্রিসের মজার বাকযুদ্ধ শুনতে ব্যস্ত। লিওনেটোর কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, “এই সদারঙ্গময়ী তরুণীটি কিন্তু বেনেডিকের উপযুক্ত স্ত্রী হবে।” লিওনেটো উত্তরে বললেন, “বলেন কী! এরা তো বিয়ের হপ্তা না কাটতেই উন্মাদ হয়ে যাবে।” লিওনেটো উভয়ের ঝগড়াটে স্বভাবের দিকে ইঙ্গিত করলেন বটে, কিন্তু রাজকুমার এই দুই মহাবুদ্ধিধরকে পরিণয়সূত্রে বাঁধার কথা ভুলতে পারলেন না।
ক্লডিওকে নিয়ে প্রাসাদে ফেরার সময় রাজকুমার বুঝলেন এই বেলা শুধু বেনেডিক ও বিয়াত্রিসের বিয়ে দিলেই চলবে না। ক্লডিও যখন হিরোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুরু করলেন, তখন তার অর্থ বুঝতে বাকি রইল না রাজকুমারের। ক্লডিওকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হিরোকে তোমার মনে ধরে?” ক্লডিও উত্তরে বললেন, “প্রভু, শেষবার যখন মেসিনায় এসেছিলুম, তখন ওকে দেখি সৈনিকের দৃষ্টিতে। তখন ভালবাসার কথা ভাববার সময় ছিল না। কিন্তু এখন চারিদিকে শুধুই শান্তি আর আনন্দ। যুদ্ধের চিন্তা যখন আর নেই, তখন সেই শূন্যস্থান অধিকার করছে নানা মধুর ভাবনা। এখন দেখছি হিরোর রূপ। এখন মনে হচ্ছে, যুদ্ধে যাওয়ার আগেই ওর প্রেমে পড়েছিলুম আমি।” নিজমুখে এভাবে ক্লডিও হিরোর প্রতি নিজের ভালবাসার কথা স্বীকার করলে ভারি সন্তুষ্ট হলেন রাজকুমার। তক্ষুনি লিওনেটোর কাছে গিয়ে ক্লডিওকে জামাই হিসেবে গ্রহণ করার আর্জি জানালেন তিনি। লিওনেটোও রাজি হয়ে গেলেন। ক্লডিও ছিলেন দুর্লভ পদমর্যাদার লর্ড তথা রাজকুমারের অন্যতম প্রধান মিত্র। কোমল স্বভাবের মেয়ে হিরোকে ক্লডিওর প্রতি অনুরক্তা করে তুলতে বেশি সময় লাগল না রাজকুমারের। এরপর রাজকুমার ও ক্লডিও লিওনেটোর সঙ্গে কথা বলে শীঘ্র বিবাহের জন্য একটি তারিখ স্থির করে ফেললেন।
তখনও বিয়ের কয়েকটি দিন দেরি। এই ক’টা দিন ক্লডিওর কাছে অতীব দীর্ঘতর মনে হতে লাগল। সাধারণত, এমন মধুর অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে যুবকেরা অধৈর্য হয়ে ওঠে। রাজকুমার তাই ক্লডিওর বিরহযন্ত্রণা কমানোর চেষ্টা করলেন। এবং এই সুযোগে কীভাবে বেনেডিক ও বিয়াত্রিসকে প্রেমপাশে বদ্ধ করা যায়, তার ছক কষতে শুরু করলেন। রাজকুমারের এই খেলায় ভারি মজা পেলেন ক্লডিও। লিওনেটোও তাঁদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। এমনকি হিরোও জানালো যে, খুড়তুতো বোনটিকে উপযুক্ত স্বামী খুঁজে দিতে সে সর্বতোভাবে সাহায্য করবে।
