রাজকুমারের পরিকল্পনা ছিল এই রকম: তাঁরা রাজপুরুষেরা মিলে বেনেডিকের মাথায় ঢুকিয়ে দেবেন যে, বিয়াত্রিস তাঁর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। আর হিরো বিয়াত্রিসকে বুঝিয়ে দেবে যে, বেনেডিক তার প্রেমে পড়েছে।
রাজকুমার, লিওনেটো ও ক্লডিও আগে নামলেন মাঠে। একদিন কুঞ্জবিতানে বই পড়ছিলেন বেনেডিক। রাজকুমার তাঁর সহকারীদের নিয়ে কুঞ্জবিতানের পিছনে এসে এমন জায়গায় বসলেন যাতে তাঁদের কথা স্পষ্ট বেনেডিকের কানে যায়। খানিক বিশ্রম্ভালাপের পর রাজকুমার বললেন, “এদিকে এসো, লিওনেটো। তখন কী বলছিলে? তোমার ভাইঝি বিয়াত্রিস নাকি সিনিওর বেনেডিকের প্রেমে পড়েছে? ও মেয়ে আবার কারোর প্রেমে পড়তে পারে নাকি? আশ্চর্য হলাম!” “আমিও ভাবতে পারিনি, প্রভু,” লিওনেটো উত্তর দিলেন। “ওর আচরণ দেখে তো মনে হত, বেনেডিককে ও আদৌ পছন্দ করে না। অথচ সেই বেনেডিককেই তার পছন্দ। এ তো দারুণ ব্যাপার,” বললে ক্লডিও। সে আরও জানালো, হিরোও তাকে একই কথা বলেছে। বিয়াত্রিসের বেনেডিককে এত পছন্দ যে, বেনেডিক তাকে গ্রহণ না করলে সে দুঃখে মরেই যাবে। কিন্তু লিওনেটো ও ক্লডিও দু’জনেই বলল, বিয়াত্রিসকে ভালবাসা বেনেডিকের পক্ষে অসম্ভব। কারণ, তিনি সমস্ত সুন্দরী মেয়েকেই পরিহাস করেন। বিশেষত, এই মেয়েটিকে তিনি বিশেষ অপছন্দ করেন।
রাজকুমার বিয়াত্রিসের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছিলেন। তিনি সব শুনলেন। বললেন, “বেনেডিককে একথা বললেই ভাল হয়।” ক্লডিও বলল, “কী লাভ? সে এটা নিয়ে মজা করবে, বেচারি মেয়েটা আরও কষ্ট পাবে।” রাজপুত্র বললেন, “অমন করলে ওকে ফাঁসি দেওয়া হবে! বিয়াত্রিস ভারি ভাল মেয়ে। অসাধারণ বুদ্ধিমতী মেয়ে। শুধু একটাই বোকামি সে করেছে বেনেডিককে ভালবেসে।” এই বলে রাজকুমার তাঁর সহকারীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সেখান থেকে চলে গেলেন। সব শুনেটুনে বেনেডিক বসলেন ভাবতে।
বেনেডিক কান খাড়া করে এই কথোপকথন শুনছিলেন। বিয়াত্রিস তাঁকে ভালবাসে শুনে তিনি মনে মনে ভাবলেন, “এও সম্ভব নাকি?” তারপর ভাবলেন, “না, হয়েও পারে। সবাই কেমন গম্ভীর হয়ে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করছিল। ওরা আবার হিরোর থেকে ব্যাপারটা জেনেছে। বিয়াত্রিসের উপরে ওদের ভারী দরদ দেখছি! আমাকে ভালবাসে! কেন? নিশ্চয় প্রতিশোধ নিচ্ছে। আমি তো কোনোদিন বিয়ের কথা ভাবিইনি। বলেছিলাম, আমি আইবড়ো অবস্থাতেই মরব। তার মানে নিশ্চয়ই এই নয় যে আমাকে বিয়ে করে বাঁচতে হবে। ওরা বলছিল, মেয়েটা সুন্দরী ও গুণবতী। কথাটা ঠিকই। কিন্তু অমন বুদ্ধিমতী মেয়েকে শুধুমাত্র আমাকে ভালবাসার জন্য বোকা বলার কী আছে? এই যে বিয়াত্রিস এদিকেই আসছে। আজ তো ওকে ভারী সুন্দর লাগছে! দেখি চুপিচুপি, ওর মধ্যে ভালবাসার কোনো চিহ্ন দেখতে পাই কিনা।” বিয়াত্রিস বেনেডিকের দিকে এগিয়ে এল এবং স্বভাবসিদ্ধ খোঁচা দিয়ে বলল, “আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমাকে পাঠানো হয়েছে, আপনাকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো জন্য।” বেনেডিক কোনোদিন বিয়াত্রিসের সামনে নরম কথা বলেননি। কিন্তু সেই মুহুর্তে তিনি বলে ফেললেন, “সুন্দরী বিয়াত্রিস, এতটা কষ্ট করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ জানাই।” তারপর বিয়াত্রিস তাঁকে আর দু-তিনটে কড়া কথা শুনিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। বেনেডিক ভাবলেন, এই অশোভন কথাগুলির মধ্যে অন্য কোনো গোপন অর্থ নিহিত রয়েছে। তিনি উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, “আমি যদি ওকে দয়া না করি, তাহলে আমি দুষ্ট। আমি যদি ওকে ভাল না বাসি, তাহলে আমি একটা ইহুদি। যাই, ওর একটা ছবি জোগাড় করি।”
বেনেডিক পাতা ফাঁদে পা দিলেন। এবার বিয়াত্রিসকে ফাঁদে ফেলার পালা হিরোর। সে তার দুই সহচরী আরসুলা আর মার্গারেটকে ডেকে পাঠাল। মার্গারেটকে বলল, “ভাই মার্গারেট, বৈঠকখানায় যাও। সেখানে বিয়াত্রিস রাজপুত্র ও ক্লডিওর সঙ্গে কথা বলছে। বিয়াত্রিসের কানে তুলে দাও, আমি আর আরসুলা বাগানে ওর সম্পর্কে কী যেন বলাবলি করছি। সেই যেখানে হানিসাকল লতা সূর্যালোকের দ্বারা পুষ্ট হয়ে সূর্যের আলোকেই অকৃতজ্ঞ গোলামের মতো ঢুকতে বাধা দেয়, সেই কুঞ্জবিতানে আমরা রয়েছি। ওকে আমাদের কথায় আড়ি পাততে উসকানি দিও কিন্তু।” এই সুস্নিগ্ধ কুঞ্জবিতানেই খানিকক্ষণ আগে বেনেডিককে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। হিরো এখানেই বিয়াত্রিসকে পাঠানোর কথা বলল মার্গারেটকে।
মার্গারেট বলল, “আমি ওকে আনছি ওখানে। এখুনি যাচ্ছি।”
আরসুলাকে পুষ্পবিতানে নিয়ে গিয়ে হিরো বলল, “উরসুলা, বিয়াত্রিস এলেই আমরা এই পথে এদিক-ওদিক হাঁটতে থাকব। তখন শুধু কথা হবে বেনেডিককে নিয়ে। আমি ওঁর নাম করলেই, তুমি ওঁকে সেরা পুরুষমানুষ বলে ওঁর গুণগান শুরু করে দেবে। আমি তোমাকে বলব, বেনেডিক কীভাবে বিয়াত্রিসকে ভালবাসেন, সেই কথা। নাও, শুরু করো। ওই দ্যাখো, বিয়াত্রিস কেমন ল্যাপউইং পাখির মতো চুপিচুপি আসছে আমাদের কথা শুনতে।” তারা কথা শুরু করল। হিরো কোনো কথার উত্তর দেওয়ার ভঙ্গিতে উরসুলাকে বলল, “না, সত্যি বলছি, আরসুলা, ওর স্বভাব খুব খারাপ। পাহাড়ি বুনো পাখির মতো উচ্ছৃঙ্খল।” আরসুলা বলল, “কিন্তু তুমি ঠিক জানো যে, বেনেডিক বিয়াত্রিসকে ভালবাসে?” হিরো বলল, “রাজপুত্র ও আমার ভাবী-স্বামী ক্লডিও তাই বলছিলেন। তাঁরা আমাকে ওকে সবকিছু খুলে বলতে বলেছিলেন। আমি রাজি হইনি। বেনেডিক যে বিয়াত্রিসকে ভালবাসেন, সে কথাটা ওকে না জানানোই ভাল।” আরসুলা বলল, “ঠিক বলেছ, ভালবাসার কথা ও কী বুঝবে। শুধু বিষয়টা নিয়ে তামাশা করবে।” হিরো বলল, “সত্যি বলতে কী, এত বুদ্ধিমান, এত মহৎ, তরুণ এবং দুর্লভ গুণের অধিকারী মানুষ আমি আর দেখিনি। আর ও কিনা তাকে অশ্রদ্ধা করে।” আরসুলা বলল, “ঠিক বলেছ, এমন দুর্ব্যবহার সহ্য করা যায় না।” হিরো বলল, “যায় তো না-ই। কিন্তু ওকে বোঝাবে কে? আমি বললে, আমার কথা তো তামাশা করে উড়িয়ে দেবে।” আরসুলা বলল, “না না, তুমি তোমার খুড়তুতো বোনকে ভুল বুঝছ। সত্যিকারের বিচার না করে সে সিনিওর বেনেডিকের মতো এক দুর্লভ ভদ্রলোককে প্রত্যাখ্যান করবে না।” হিরো বলল, “কেমন নামজাদা মানুষ বলো। আমার প্রিয়তম ক্লডিওকে বাদ দিলে সারা ইতালি খুঁজেও অমন মানুষ মিলবে না।” এইভাবে হিরো তাঁর সঙ্গিনীকে বিষয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত করলেন। আরসুলা বলল, “তোমার বিয়ে কবে, দিদিমণি?” হিরো তাকে বলল, পরের দিনই ক্লডিওর সঙ্গে তার বিয়ে। সেজন্য সঙ্গিনীকে সে তার নতুন পোষাকগুলি দেখিয়ে পরের দিন কী পরবে তা নিয়ে আলোচনা করতে চাইল। বিয়াত্রিস রুদ্ধশ্বাসে তাদের কথা শুনছিল। ওরা চলে যেতেই বলে উঠল, “আমার কানে এ কী আগুন ঢেলে দিয়ে গেল? এ কী সত্য? বিদায়, অশ্রদ্ধা ও অবজ্ঞা! বিদায়, কুমারীর গৌরব! বেনেডিক, ভালবাসো! তোমাকে আমার মূল্য চোকানোর সময় এসেছে। আমার বুনো হৃদয় তোমার প্রেমহস্তে বেঁধে দেবো আমি।”
