রাজা পেরিক্লিস গলা চড়িয়ে হেলিকেন্যাসকে ডেকে বললেন, প্রিয় হেলিকেন্যাস! একবার এস এ ঘরে?
রাজার ডাক শুনে হেলিকেন্যাস ঘরের ভিতর গিয়ে দেখলেন এতদিন বাদে রাজার মুখে হাসি ফুটেছে। তা দেখে খুশি হলেন তিনি।
পেরিক্লিস বললেন, শোন হেলিকেন্যাস, ও বলছে ওর নাম মেরিনা। সমুদ্রে জন্মাবার দরুন ওর বাবা নাকি এই নাম রেখেছিলেন। দেখা মা! ঈশ্বরের লীলা বোঝা ভার। একদিন সমুদ্রে জন্মেছিল বলে এতদিন বাদে সমুদ্ৰই তোমায় আজ ফিরিয়ে দিয়েছে আমার কাছে। দেখা মা! এতক্ষণ পর্যন্ত তুমি যা বলেছ তা সবই সত্যি। তবুও সংশয় রয়ে গেছে আমার মনে। তুমি যদি সত্যিই পেরিক্লিসের মেয়ে হও, তাহলে বলতো তোমার মা’র নাম কী?
নিশ্চয়ই বলব, তবে তার আগে বলুন আপনি কে? জানতে চাইল মেরিনা।
আমি টায়ারের রাজা পেরিক্লিাস, জবাব দিলেন তিনি।
উত্তেজনা চেপে রেখে মেরিনা বলল, আমার মার নাম থাইসা।
কী বললে, তুমি থাইসার মেয়ে? এগিয়ে এসে মেরিনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাজা পেরিক্লিস বললেন, তুমি যে সত্যিই আমার মেয়ে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বুঝলে হেলিকেন্যাস, জীবনে শুধু দুঃখই নেই, আনন্দও আছে। আজ কত বছর বাদে ফিরে পেলাম নিজের মেয়েকে। যাও! মেয়ের জন্য নতুন পোশাক নিয়ে এস, বলে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন পেরিক্লিস। সামনে লাইসিমেকাসকে দেখে বললেন, হেলিকেন্যাস! ইনি কে? এঁকে তো চিনতে পারছি না।
আজ্ঞে! ইনি হলেন মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাস। একমাত্র এরই জন্য এতদিন বাদে আপনি ফিরে পেয়েছেন মেয়েকে
তইতো আপনাকে দেখে পরমাত্মীয় বলে মনে হয়েছিল, বলেই আনন্দের সাথে লাইসিমেকাসকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন পেরিক্লিস। ঈশ্বর আমাদের উভয়ের মঙ্গল করুন বলে কঠিন দৃষ্টিতে হেলিকানাসের দিকে তাকিয়ে বললেন পেরিক্লিস, বুঝতে পারছি মেরিনা যে সত্যিইআমার মেয়ে এ বিষয়ে তোমার সন্দেহ এখনও ঘোচেনি। রাজার কথার কোনও জবাব দিলেন না হেলিকেন্যাস।
বহুক্ষণ ধরে পেরিক্লিসের মনে একটা সূক্ষ্ম অনুভূতির বোধ হচ্ছে। কোথা থেকে মিষ্টি সুরের একটা গান ভেসে আসছে তার কানে। অথচ কেউ তা শুনতে পাচ্ছে না। সেই সূরা শুনতে শুনতে একসময় ঘূমিয়ে পড়লেন পেরিক্লিাস। ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখলেন দেবী ডায়ানা যেন তাকে বলছেন, এফিসাসে চলে যাও তুমি! দেখবে সেখানে তোমার স্ত্রী আমার আরাধনা করছে। ধাও! সেখানে গিয়ে তাকে গ্রহণ কর।
ঘুম ভাঙার পর জাহাজে চেপে পেরিক্লিস রওনা হলেন এফিসাসের পথে। একসময় জাহাজ এসে থামল সেখানে। মেরিনা, হেলিকেন্যাস আর কয়েকজন সভাসদকে সাথে নিয়ে দেবী ডায়ানার মন্দিরে গেলেন পেরিক্লিস। ঘটনাচক্রে সে সময় উপস্থিত ছিলেন। এফিসাসের সভাসদ সেরিমন— যার পরামর্শে একদিন বাকি জীবন কাটাতে থাইসা এসেছিলেন এই মন্দিরে। দেবী ডায়ানার বেদির সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সবাইকে জোর গলায় নিজের জীবনের ইতিহাস শোনালেন পেরিক্লিস। থাইসাও তখন সেখানে ছিলেন। এতদিন বাদে স্বামীর গলা শুনে আর তাকে সামনে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। থাইসা! সেরিমনের পরিচর্যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে পেলেন তিনি। তখন থাইসকে দেখিয়ে পেরিক্লিসকে বললেন সেরিমন, যার খোজে আপনি এতদূর এসেছেন, এই থাইসাই আপনার সেই হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী।
বহুদিন বাদে স্বামী-কন্যাকে এক সাথে ফিরে পেয়ে আনন্দের চোটে কী যে করবেন। থাইসা, তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। এবার তাদের সবাইকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন সেরিমন। যে বাক্সতে পুরে থাইসাকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছিল -সেই বাক্সটা আর তার ভেতরের সব জিনিস সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন সেরিমন। তিনি সেগুলি দেখালেন পেরিক্লিসকে। বিয়ের রাতে স্বামীর কাছ থেকে যে হিরের আংটিটিা উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন। থাইসা, এতদিন বাদে তিনি সেটা দেখালেন পেরিরিকসকে। আংটিটা একেবার দেখেই চিনতে পারলেন পেরিক্লিস। জন্ম দেবার পর থেকে যে মেয়েকে তিনি দেখেননি, সেই মেয়ে আজ এত বড়ো হয়েছে দেখে খুশি হলেন থাইসা। মাকে পেয়ে তার সামনে হাঁটু গেড়ে সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে বসেছিল মেরিনা, তাকে দু-হাতে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদিতে লাগলেন থাইসা।
এবার সেরিমনকে দেখিয়ে তিনি পেরিক্লিসকে বললেন, এনার দেখানো পথ অনুসরণ করে আমি এতদিন দেবী ডায়ানার আরাধনা করে এসেছি, আজ এতবছর পরে দেবী ডায়ানার কৃপাতেই তোমাদের ফিরে পেলাম আমি।
ইশারায় লাইসিমেকাসকে দেখিয়ে পেরিক্লিস বললেন, একবার এর দিকে চেয়ে দেখা থাইসা। ইনি হলেন মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাস। আমি স্থির করেছি। এর হাতেই সঁপে দেব মেরিনাকে ৷ এবার মেরিনার হাত লাইসিমেকাসের হাতে তুলে দিয়ে বললেন। থাইসা, তোমাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হোক।
এর পরও কিছু অবশিষ্ট আছে। এ কাহিনির ক্লিওন আর তার স্ত্রী যে মেরিনাকে হত্যা করার চক্রান্ত করেছিলেন সে কথা জানতে পেরে তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। থার্সাসের প্রজারা। এ অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে প্রজারা একদিন আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল তাদের প্রাসাদ। প্রাসাদ পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও, ক্লিওন আর তার স্ত্রী কিন্তু প্ৰাণে বেঁচে গেলেন। সম্ভবত আরও বড়ো শাস্তি তাঁদের পাওনা ছিল বলেই বেঁচে গেলেন তারা।
মাচ অ্যাডু অ্যাবাউট নাথিং
মাচ অ্যাডু অ্যাবাউট নাথিং
মূল রচনা: উইলিয়াম শেকসপিয়র
পুনর্কথন: মেরি ল্যাম্ব
অনুবাদ: অর্ণব দত্ত
