নিজের মেয়ের সমাধিতে ফুল দিয়ে বিষণ্ণ মনে টায়ারে ফিরে আসছিলেন পেরিক্লিস। মাঝপথে তার জাহাজ এসে দাঁড়াল মিটিলেন বন্দরে। দূর থেকে পেরিক্রিসের জাহাজটিকে দেখে কৌতূহলী হয়ে উঠলেন মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাস। কোন দেশের জাহাজ, কে রয়েছেন জাহাজে এসব জানতে দু-জন সভাসদকে নিয়ে বড়ো নৌকায় চেপেটায়ারের জাহাজের কাছে এলেন তারা তখন জাহাজের ডেকে চেয়ারে বসে আরাম করছিলেন ক্লান্ত রাজা পেরিক্লিস মিটিলেনের একজন সভাসদ জনৈক নাবিককে সাথে নিয়ে উঠে এলেন জাহাজের ডেকে। এদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলেন অমাত্য হেলিকেন্যাস। হেলিকেন্যাসকে উদ্দেশ্য করে সেই নাবিক বলল, প্ৰভু হেলিকে নাস! নৌকায় অপেক্ষা করছেন মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাস। তিনি আসতে চান আমাদের জাহাজে।
দুজন সভাসদকে ডেকে নিয়ে হেলিকেন্যাস বললেন, যান, আপনারা গিয়ে মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাসকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ওপরে নিয়ে আসুন।
নিয়ে তারা উঠে এল জাহাজের ওপরে। সেখানে তাকে অভিবাদন জানালেন মন্ত্রী হেলিকেন্যাস। ইশারায় পেরিক্লিসকে দেখিয়ে তিনি বললেন, ইনিই আমাদের প্রভু টায়ারের রাজা পেরিক্লিস। শোকে তিনি এত কাতর। যে প্রায় তিনমাস ধরে খাওয়া-দাওয়া একরকম বন্ধই করে দিয়েছেন। কারও সাথেই কথা বলেন না তিনি।
লাইসিমেকাস বললেন, আমি কি একবার ওর সাথে দেখা করতে পারি?
নিশ্চয়ই পারেন, বললেন হেলিকেন্যাস, তবে ওর সাথে দেখা করে কোন ও ফল হবে না। কারণ আপনার সাথে উনি একটা কথাও বলবেন না। স্ত্রী ও একমাত্ৰ কন্যার বিয়োগে উনি খুবই কাতর হয়ে পড়েছেন।
লাইসিমেকাস এগিয়ে এসে অভিবাদন জানালেন পেরিক্লিসকে। জবাবে কিছু না বলে বিষণ্ণ মুখে বসে রইলেন পেরিক্লিস।
হেলিকেন্যাসকে ডেকে একপাশে সরিয়ে এনে লাইসিমেকাস বললেন, আমি একটা কথা
বলতে চাই আপনাকে। আমাদের মিটিলেনে একটি কুমারী মেয়ে আছে! রূপে-গুণে সে অতুলনীয় আর চমৎকার তার গানের গলা। আমার বিশ্বাস তার গান শুনলে রাজা পেরিক্লিস আবার তার কথা বলার ক্ষমতা ফিরে পাবেন। আপনার অনুমতি হলে ওই মেয়েটিকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারি। আমি।
কাজ হবে বলে মনে হয় না। যাই হোক আপনি যখন বলছেন তখন একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
হেলিকেনাসের নির্দেশে একজন সভাসদ বড়ো নৌকায় চেপে রওনা হলেন। কিছুক্ষণ বাদে তিনি ফিরে এলেন মেরিনাকে সাথে করে। তার আগেই ডেক ছেড়ে নিজের কামরায় চলে গেছেন রাজা পেরিক্লিস। হেলিকেন্যাস সেখানে পৌঁছে দিলেন মেরিনাকে।
পেরিক্লিসকে অভিবাদন জানিয়ে মেরিনা বললেন, মহারাজ! আপনার মতো আমিও বুকের মাঝে অসহ্য যন্ত্রণা আর দুঃখ বহন করে চলেছি। শুনেছি। আমার বাবাও নাকি রাজা ছিলেন। সমুদ্র ঝড়ে জাহাজ ডুবি হয়ে আমি বাবা-মার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি।
আপন মনে পেরিক্লিস বললেন, এই মেয়েটিও দেখতে ঠিক আমার স্ত্রী আর মেয়ের মতে, কথাগুলি অনুচ্চ স্বরে বললেও তা ঠিকই পৌঁছেছে মেরিনার কানে।
মেরিনার দিকে তাকিয়ে পেরিক্লিস বললেন, কী নাম তোমার?
আমার নাম মেরিনা, জবাব দিল সে।
মেরিনা নামটা শুনে কেমন যেন চমকে উঠলেন পেরিক্লিস। তিনি বললেন, তোমার নাম শুনে আমি যে কতটা চমকে গেছি তা তোমায় বোঝাতে পারব না। কে তোমার এই নাম দিয়েছিল?
মেরিনা জবাব দিল, মৃত্যুর আগে আমার ধাত্রী লাইকোরিডা নিজ মুখে বলে গেছে যে আমরা বাবা একজন নামি রাজা ছিলেন। আমার মাও নাকি ছিলেন রাজবংশীয়। সমুদ্রবক্ষে জন্মেছিলাম বলে জাহাজের মধ্যেই বাবা আমার নাম রেখেছিলেন মেরিনা। আমি এও শুনেছিলাম ঝড়-জলের তাণ্ডব সহ্য করতে না পেরে আমায় জন্ম দিয়েই মা মারা যান। মেরিনার কথা শুনে উত্তেজনায় থারথার করে কেঁপে উঠল পেরিক্রিসের ঠোট। তিনি চাপা স্বরে আপন মনে বলতে লাগলেন, মেয়েটি বলছে। ওর বাবা রাজা ছিলেন আর মাও নাকি রাজবংশীয়; সমুদ্রে জন্মেছিল বলে ওর বাবা নাম রেখেছিল মেরিনা। এ সব কি আমি স্বপ্ন দেখছি। এই তো কদিন আগে মারা গেছে সে। আমি নিজে তার সমাধিতে ফুল ছিটিয়ে এসেছি। তবু ওকে একবার বাজিয়ে নেওয়া যাক। মেরিনার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, তোমার পুরো জীবনকাহিনি শুনতে চাই আমি! জন্মের পর তোমার কী হল, কী করে তুমি এখানে এলে — সব খুলে বল আমায়।
মেরিনা বলতে লাগল, আমাকে জন্ম দিয়েই মা মারা যান। শুনেছি তার মৃতদেহ নাকি সমুদ্রের জলে ফেলে দেওয়া হয়। তারপর আমার পিতা থাসাসের শাসকের কাছে রেখে দেন। আমাকে! আমাকে খাইয়ে-দাইয়ে বড় করে তোলেন ক্লিওন আর তার স্ত্রী। তারপর কেন জানি না আমাকে গোপনে হত্যা করার জন্য একজন গুপ্তঘাতককে নিয়োগ করেন ক্লিওনের স্ত্রী। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলাম ধাত্রী লাইকোডিয়ার সমাধিতে ফুল দেব বলে। মাঝপথে ঘাতক আমায় ভুলিয়েভালিয়ে নিয়ে গেছিল।সমূদ্রতীরে। আমি কাতর স্বরে প্রাণভিক্ষা চাইলাম সে ঘাতকের কাছে। সে সময় একদল জলদসু্য এসে আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে জাহাজে তোলে, তারপর এক সময় এসে পৌঁছলাম এই মিটিলেনে।
এটুকু বলার পর মেরিনার নজরে এল শিশুর মতো কাঁদছেন তার শ্রোতা।
মেরিনা বলল, আমার জীবনকাহিনি শুনে আপনি কাঁদছেন! বিশ্বাস করুন রাজা পেরিক্লিসের মেয়ে আমি। জানি না। আমার বাবা এখনও বেঁচে আছেন। কিনা।
