ও দিকে লাইসিমেকাস অধৈৰ্য হয়ে মেরিনার উদ্দেশে গলা চড়িয়ে বললেন, কী গো মেয়ে! তোমাদের কথা-বার্তা শেষ হল! আমি আর কতক্ষণ এখানে একা একা বসে থাকব?
তার কথা শুনে মাসি ছুটে এসে লাইসিমেকাসকে সেলাম জানিয়ে বলল, হুজুর! কিছু মনে করবেন না। আপনি। এই মেয়েটা এখনও আনকোরাই রয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও আমরা ওকে বাগ মানাতে পারিনি। তবে হুজুর যখন এসে গেছেন তখন আর চিন্তা নেই, আপনি ঠিক ওকে পােষ মানাতে পারবেন? — বলে মেরিনার হাত ধরে টানতে টানতে তাকে ঢুকিয়ে দিল লাইসিমেকাসের ঘরে। তারপর দালালকে সাথে নিয়ে অন্যদিকে চলে গেল মাসি। জীবনে বহু মেয়ে ঘেটেছেন লাইসিমেকাস। তিনি দেখেছেন তার ক্ষমতার পরিচয় পাবার পর সব মেয়েরই চোেখ-মুখের ভাবভঙ্গি পালটে যায়। তারা সবাই আপ্ৰাণ চেষ্টা করে তাকে খুশি করতে। কিন্তু এ মেয়েটা তাদের মতো নয় — এ সম্পূর্ণ বিপরীত। শিরদাঁড়া সোজা করে এমনভাবে সে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যে দেখে মনে হচ্ছে তাকে খুশি করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই এর। সেই সাথে ওর চোখের চাউনি কেমন নম্র আর বিনত, ঔদ্ধত্যের বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই তাতে। মেয়েটিকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে কৌতূহল বেড়ে গেল। লাইসিমেকাসের। এক সময় তিনি মুখ ফুটে বলেই ফেললেন, কী নাম তোমার?
আমার নাম মেরিনা বলল সে।
মেরিনা! বেশ ভালো নাম, বললে লাইসিমেকাস, এখন বল -তে কতদিন ধরে তুমি এ ব্যবসায় রয়েছ?
ব্যবসা? কীসের ব্যবসার কথা বলছেন। আপনি? থতমত খেয়ে বলল মেরিনা।
তুমিই বল! সে কথা কি আমি নিজের মুখে বলতে পারি! বললেন লাইসিমেকাস।
মিনতি জানিয়ে মেরিনা বলল, দোহাই আপনার! দয়া করে বলুন কোন ব্যবসার কথা বলছেন আপনি?
লাইসিমেকাস জানতে চাইলেন, কিতদিন হল এ ব্যবসায় এসেছ তুমি?
মেরিনা জবাব দিলে, যতদিনের কথা আমার মনে আছে ততদিন এসেছি এ ব্যবসায়।
তার দিকে তাকিয়ে লাইসিমেকাস বললেন, তাহলে আমায় ধরে নিতে হবে খুব অল্পবয়সেই এ ব্যবসায় এসেছ তুমি। ধর তোমার বয়স তখন পাঁচ-সাত।
যদি সত্যি সত্যিই আমি এ ব্যবসায় এসে থাকি তাহলে আমার বয়স তখন আরও কম, জবাব দিল মেরিনা।
তখন লাইসিমেকাস বললেন, তুমি জান এ বাড়ির সবাই তোমাকে বিক্রির মাল বলে ভাবে?
লাইসিমেকাসের দিকে তাকিয়ে মেরিনা বলল, জায়গাটা যদি ততই খারাপ তাহলে কেন এখানে আসেন। আপনি? আপনি তো এখানকার শাসক, মান্যগণ্য লোক। অসীম ক্ষমতা আপনার হাতে।
আমার কথা কে বলল তোমায়? নিশ্চয়ই তোমার গুরুঠাকুরানি, জানতে চাইলেন। লাইসিমেকাস।
অবাক হয়ে মেরিনা বলল, গুরুঠাকুরানি! সে আবার কে?
লাইসিমেকাস বললেন, আরে ওই মেয়েটা যে তোমায় ছলা-কলা কায়দা-কানুন শেখায়, সে তোমায় খানিক আগে এখানে পৌঁছে দিয়ে গেল। বেশ বুঝতে পারছি আমার পরিচয় আর ক্ষমতার কথা শুনে তুমি আমার মুখ থেকে আরও বেশি করে প্ৰেম-পিরিাতের কথা শুনতে চাইছ। নাও, এবার আমায় নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে চল।
গম্ভীর স্বরে মেরিনা বলল, আপনি যদি সত্যিই সদ্বংশের সন্তান হয়ে থাকেন তবে তার প্রমাণ দিন। আপনি এখানকার শাসক। আপনার কাছে আমি বিচারপ্রার্থী। আশা করি আপনার বংশ আর পদমর্যাদার উপযুক্ত বিচার করবেন। আপনি ৷
মেরিনার কথা শুনে বেজায় অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলেন লাইসিমেকাস। তিনি বললেন, এ সব কী বলছি তুমি? এক রাতের স্ফুর্তি লুটতে এসে এ তো ভালো বিড়ম্বনায় পড়া গেল দেখছি! যাই হোক, তুমি শাস্ত হও মেরিনা। তুমি অন্য কিছু চাও।
মেরিনা বলল, তাহলে জেনে রাখুন। আপনি, আমি এক কুমারী মেয়ে যে ভাগ্যের কোপে পড়ে বাধ্য হয়েছে এখানে আসতে। এই বাড়িটার কথাই কিছুক্ষণ আগে আপনি বলছিলেন না? এ এমন একটা জঘন্য নরক যার প্রতিটি অধিবাসীই কৃৎসিত রোগে আক্রান্ত। একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ আমাকে এই নরক থেকে উদ্ধার ক্রুতে পারবে না। এখন আমার অবস্থা এক ডানাভাঙা পাখির মতে- যার ক্ষমতা নেই ডানা মেলে উড়ে যাবার।
তুমি বেশ সন্দর কথা বলতে পার মেরিনা, বলে উঠলেন লাইসিমেকাস, তোমার কথা শুনলে যে কোন ও পতিতার মনেও ভালো হবার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠবে। — আমার কোনও সন্দেহ নেই সে বিষয়ে। যাই হোক, এই টাকাগুলো তুমি রেখে দাও, চেষ্টা করবে। এর সাহায্যে পালিয়ে যাবার।
ঈশ্বর আপনার ভালো করবেন, বলে। লাইসিমেকাসের দেওয়া টাকাগুলি রেখে দিল মেরিনা। দরজার দিকে যেতে যেতে লাইসিমেকাস বললেন, আমি চললুম। যদি কখনও তোমায় খবর পাঠাই তাহলে জানবে সেটা ভালো খবর। এই নাও, আরও কিছুটাকা রইল। এগুলো তুলে রােখ। দরকার মতো কাজে লাগিও — বলে আরও কিছু টাকা মেরিনার হাতে দিয়ে চলে গেলেন। লাইসিমেকাস।
সত্যিই মেরিনার কাজে লেগে গেল। লাইসিমেকসের দেওয়া টাকাগুলো। সে টাকা দিয়ে বিশ করল পতিতালয়ের মালিকের চাকর বোল্টকে। একদিন তারই সাহায্যে পতিতালয় থেকে পালিয়ে গিয়ে একজন সচ্চরিত্র লোকের আশ্রয় পেল মেরিনা। সেই ভদ্রলোক নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসেন মেরিনাকে। কিন্তু তার আশ্রয়ে থেকেও বসে বসে সময় কাটে না মেরিনার। থার্সাসে থাকাকালীন সে নাচ-গান, শিল্প-কলা সবই আয়ত্ত করেছিল। এখন ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের সে সব বিদ্যে শিখিয়ে পয়সা উপার্জন করতে লাগল। বোল্টের সাহায্যে সে উপার্জিত টাকা পতিতালয়ের মাসিকে সাহায্য হিসেবে পাঠাতে লাগল।
