ওদিকে মেরিনা অকস্মাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় মহা ফাপরে পড়েছেন থার্সাসের শাসক ক্লিওন। অনেক খোঁজাখুঁজি সত্ত্বেও মেরিনার হদিশ পায়নি তার লোকেরা। এ অবস্থায় কী যে করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না ক্লিওন। এমন সময় একজন অনুচর মারফত জানতে পারলেন কিছুদিন ধরেই ডায়োনিজা নাকি গুপ্তঘাতকের সাহায্যে মেরিনাকে হত্যা করার চক্রান্ত করেছেন। পেশাদার গুপ্তঘাতক লিওনাইনের সাথে তাকে বহুবার প্রাসাদের বাইরে কথা বলতে দেখা গেছে।
এ কথা শুনে আক্ষেপ করে বললেন ক্লিওন, এ তুমি কী করলে ডায়োনিজা! এখন আমি কোথায় খুঁজে পাব মেরিনাকে?
ক্লিওনের বিশ্বস্ত চর যে তার সাথে কথা বলছে তা দেখতে পেয়েছেন ডায়োনিজা! ক্লিওনের আক্ষেপ শুনে তিনি দ্রুত সেখানে এসে বললেন, কী সব যা তা বলছ! যা গেছে তা কি আর ফিরে আসে? জেনে রােখ, মেরিনার রূপের দৌলতে কেউ মুখ ফিরে তাকাত না আমাদের মেয়ের দিকে। সবাই শুধু মেরিনার রূপ-গুণের প্রশংসা করত। মেয়ের স্বার্থেই আমি এ কাজ করেছি।
অসহায়ভাবে ক্লিওন বললেন, কিন্তু এর পরিণাম কী হতে পারে তা কখনও ভেবেছ? পেরিক্লিস তার মেয়েকে দেখতে চাইলে কী বলবে তাকে?
বলব, রোগে ভুগে কদিন আগে মারা গেছে মেরিনা, জবাব দিলেন ডায়োনিজ, আগে ভাগেই মেরিনার নামে একটা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে রাখবে। পেরিক্লিস মেয়েকে দেখতে এলে তুমি কাঁদতে কাঁদিতে তারই সামনে স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দেবে। অবশ্য তার আগে মেরিনার গুণের প্রশংসা খোদাই করিয়ে রাখবে ওই স্তম্ভের গায়ে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লিওন বললেন, সুন্দর হয়েও তুমি যে এত ফেরেববাজ, স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর হতে পার তা আগে জানা ছিল না। আমার।
মুখে স্ত্রীকে গালাগালি দিলেও শেষপর্যন্ত কিন্তু স্ত্রীর প্রস্তাবকেই মেনে নিতে হল ক্লিওনকে। সমুদ্রের ধারে মেরিনার সমাধি গড়ে তাতে একটা সুন্দর স্তম্ভ গড়ালেন তিনি। শিল্পীদের দিয়ে মেরিনার প্রশংসাসূচক অনেক সুন্দর সুন্দর কথা খোদাই করালেন সেই স্তম্ভের গায়ে।
এদিকে বহুদিন মেয়ের খোঁজ-খবর না পেয়ে খুবই চঞ্চল হয়ে উঠেছেন রাজা পেরিক্লিস। ক্লিওনকে অনেক চিঠি দিয়েও কোনওটির উত্তর পেলেন না। শেষমেশ স্থির করলেন তিনি নিজেই মেয়েকে দেখে আসবেন।
একদিন মন্ত্রী হেলিকেন্যাসকে সাথে নিয়ে তিনি এসে হাজির হলেন থার্সাসে। সে খবর পেয়ে স্ত্রী ডায়োনিজকে সাথে নিয়ে ক্লিওন এলেন জাহাজঘাটে। জাহাজ থেকে পেরিক্লিস নেমে আসতেই স্ত্রীর শেখানো মতো ক্লিওন কাঁদিতে কাঁদিতে পেরিক্লিসকে জানালেন তার মেয়ে মেরিনার মৃত্যুর কথা। মেরিনা। আর বেঁচে নেই জেনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন পেরিক্লিস। মৃত স্ত্রী থাইসার একমাত্র সন্তানকে বুকে ধরে তিনি স্ত্রী-শোক ভুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিষ্ঠুর বিধাতার তা সহ্য হল না। তিনি তাকেও অকালে কেড়ে নিলেন। শোকে যেন পাথর হয়ে গেলেন পেরিক্লিস। বলার মতো কোনও কিছু খুঁজে পেলেন না তিনি।
ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন ডায়োনিজা। মেয়ের শোকে পেরিক্লিসকে বিতুল অবস্থায় দেখে এখন কী করতে হবে সে ব্যাপারে চাপা গলায় প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন স্বামীকে। ক্লিওন তাকে নিয়ে গেলেন সমুদ্রতীরে নির্মিত মেরিনার সমাধিস্থানে — সেখানে তার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। আগে থেকেই সাথে করে কিছু সাদা ফুল নিয়ে এসেছিলেন ডায়োনিজা। সেই ফুল স্ত্রীর হাত থেকে স্মৃতিস্তম্ভের গোড়ায় ছড়িয়ে দিলেন ক্লিওন। তা দেখে পেরিক্লিসও সেখানে কিছু ফুল ছিটিয়ে দিলেন। তারপর কাঁদতে কাঁদিতে ক্লিওনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মন্ত্রী হেলিকেন্যাসকে সাথে নিয়ে জাহাজে চেপেটায়ারে ফিরে গেলেন পেরিকিস।
ওদিকে মোটা টাকা দিয়ে মেরিনাকে কিনে নেবার পর থেকেই বেজায় মুশকিলে পড়ে গেছেন পতিতালয়ের মালিক। দালালদের মুখ থেকে মেরিনার রূপ-যৌবনের নানা কথা শুনে সেখানকার খরিদাররা রোজই আসছে তার সাথে রাত কাটাতে। কিন্তু মেরিনা তার সংকল্পে অটল। রাত কাটানো তো দূরে থাক, সে কাউকে তার দেহও ছুতে দিতে রাজি নয়। যে খদের আসে মেরিনা তাকেই ধর্মোপদেশ দেয়, চরিত্র সংশোধন করতে বলে। ফলস্বরূপ খদোররা এসেও মুখ কালো করে বাড়ি ফিরে যায়। কিছুতেই মেরিনাকে বাগ মানাতে না পেরে অনেক খদের পতিতালয়ে আসই ছেড়ে দিল। এসব দেখে-শুনে মেরিনার উপর বেজায় রেগে গেল পতিতালয়ের মালিক। সে নিজে ছিল যৌনরোগে আক্রান্ত। সে মতলব করল জোর করে মেরিনার সতীত্ব নষ্ট করে ওই কুৎসিত রোগের বীজ সে তার দেহে ঢুকিয়ে দেবে।
একদিন নতুন নারীর খোজে। সেই পতিতালয়ে এলেন মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাস। তাকে দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠল। পতিতালয়ের সবাই। দালাল মেরিনাকে নিয়ে এল। তার ঘরে। তাদের সাথে মাসিও এল; ইশারায় লাইসিমেকাসকে দেখিয়ে মাসি মেরিনাকে বলল, ইনি হলেন এই রাজ্যের শাসক। অসীম ক্ষমতা ওর। ইচ্ছে করলেই উনি যা খুশি তাই করতে পারেন। তুমি যদি ওকে খুশি করতে পার তাহলে আর ভাবতে হবে না তোমায়, সোনা-রূপা, হিরে-জহরত দিয়ে উনি তোমার সারা গা মুড়িয়ে দেবেন।
মাসির কথার অর্থ বুঝতে পারল মেরিনা। তবুও সে নিজের জেদ বজায় রেখে বলল, উনি ভালোবেসে আমায় কিছু দিতে চাইলে আমি তা শ্রদ্ধার সাথে নিতে রাজি আছি।
