তাকে সাস্তুনা দিয়ে সেরিমন বললেন, আপনার মানসিক অবস্থা আমি বেশ বুঝতে পারছি রানি থাইসা। কিন্তু ঈশ্বরের উপর তো কারও হাত নেই। কাছেই ডায়ানা দেবীর মন্দির রয়েছে। আপনার মন চাইলে আপনি দেবীর আরাধনা করে দিন কাটিয়ে দিতে পারেন। দিন-রাত সাধনভজনে মেতে থাকলে আপনার মন শান্ত হবে। সেখানে আমার ভাইঝি। আপনার দেখাশোনা করবে।
থেরিসা বললেন, সেরিমন! আস্তরিক ধন্যবাদ ছাড়া আপনাকে আর কিছু দেবার নেই আমার। আপনার প্রতি আমার যে শুভেচ্ছা রইল তা এই সামান্য প্রতিদানের চেয়ে অনেক বড়ো। আমি দেবী ডায়ানার মন্দিরে গিয়ে বাকি জীবনটা তার আরাধনা করেই কাটিয়ে দেব।
সেরিমনের অনুরোধে কিছুদিন তার বাড়িতে থেকে ওষুধ-পত্র খেয়ে পূর্ণ বিশ্রাম নিলেন রানি থাইসা। তারপর একদিন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে সেরিমনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দেবী ডায়ানার মন্দিরের উদ্দেশে রওনা দিলেন রানি। তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল সেরিমনের ভাইঝি।
টায়ার বন্দরে এসে নোঙ্গর করল পেরিক্রিসের জাহাজ। সংবাদ পেয়ে অমাত্য আর সভাসদদের নিয়ে জাহাজ ঘাটে এলেন হেলিকেন্যাস। রাজকীয় সংবর্ধনা জানিয়ে তাঁরা রাজপ্রাসাদে নিয়ে এলেন পেরিক্লিসকে। এতদিন বাদে রাজাকে ফিরে পেয়ে আনন্দে মেতে উঠল প্ৰজারা। তারা এই জেনে নিশ্চিন্ত হল যে, সিংহাসন আর খালি থাকবে না। সবার মাঝে ফিরে আসতে পেরে পেরিক্লিসও খুশি হলেন। সিংহাসনে বসে তিনি আগের মতোই মনোযোগ দিয়ে রাজকাৰ্য পরিচালনায় মগ্ন হলেন। কিন্তু এরই মাঝে যখন স্ত্রী-কন্যার মুখ মনে পড়ে, তখন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেন না পেরিক্লিস। কাজ-কর্ম সব ছেড়ে চোখের জল সামলে নিয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি। পেরিক্লিস তখনও জানে না যে তার স্ত্রী থাইসা এখনও বেঁচে আছেন-দেবী ডায়ানার আরাধনা করে তিনি তার মন্দিরে দিন কাটান। ওদিকে থার্সাসের শাসক ক্লিওনের মেয়ে ফিলোটিনার সাথে একই ভাবে বড়ো হচ্ছে পেরিক্রিসের মেয়ে মেরিনা। দিনে দিনে শুক্লপক্ষের চাদের মতো বেড়ে উঠতে লাগল মেরিনা। যদিও ফিলোটিনা আর মেরিনা একই বয়সি, কিন্তু রূপ-গুণ কোনও দিক থেকেই মেরিনার পাশে দাঁড়াবার যোগ্য নয় ফিলোটিনা। একই সাথে নাচ-গান, শিল্প-কলা শেখে দুজনে, তবুও মেধার জোরে সবকিছুতেই ফিলোটিনাকে ছাপিয়ে যায় মেরিনা।
তাদের দু-জনের স্বভাবও আলাদা। থার্সাসের শাসকের তত্ত্বাবধানে বড়ো হলেও মেরিনার মনে কোনও অহংকার নেই। ছোটো-বড়ো, উচু-নিচু সবাই তার চোখে সমান। সে সহজভাবে তাদের সাথে মেলামেশা করে, চেষ্টা করে সবার মন জয় করার। সে খুবই বিনম্র। এর ফলে দেশের মানুষ ফিলোটিনার চেয়ে মেরিনার প্রশংসাই বেশি করে করতে লাগল। ফিলোটিনাকে হারিয়ে দিচ্ছে — ব্যাপারটা ক্লিওনের নজরে না এলেও তার স্ত্রী ডায়োনিজা কিন্তু সহজে ব্যাপারটা মেনে নিতে পারলেন না।
রূপ-গুণ, স্বভাব-চরিত্র সব দিক দিয়েই ফিলোটিনার চেয়ে অনেক উন্নত মেরিনা। তাই যতদিন সে তাদের আশ্রয়ে থাকবে, ততদিন ফিলোটিন আর দাঁড়াতে পারবে না মেরিনার পাশে। এ কথাটা বুঝতে পেরে হিংসায় জুলে উঠলেন ডায়োনিজা। শেষে পথের কঁটা দূর করতে এক গুপ্তঘাতককে দিয়ে মেরিনাকে হত্যার ব্যবস্থা করলেন ডায়োনিজা। অনেক টাকার বিনিময়ে লিওনাইন নামে এক গুপ্ত ঘাতক রাজি হল মেরিনাকে হত্যা করতে। ডায়োনিজা তাকে নির্দেশ দিলেন যে যেন সবার অলক্ষ্যে মেরিনাকে সাগরতীরে নিয়ে গিয়ে তাকে খুন করে মৃতদেহের গলায় পাথর বেঁধে যেন তাকে সমুদ্রে ফেলে দেয়। মেরিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সবার অলক্ষে তাকে সমুদ্রতীরে নিয়ে এল লিওনাইন। খুন করার আগে সে মেরিনাকে বলল শেষবারের মতো প্রার্থনা করতে। তার কথা শুনে মেরিনা বুঝতে পারল তাকে হত্যা করার জন্যই লোকটিকে নিয়োগ করা হয়েছে। মেরিনার প্রশ্নের জবাবে সে কথা স্বীকার করল লিওনাইন। মেরিনা শুনে অবাক হয়ে গেল। যখন সে জানল যে ডায়োনিজা ছােটোবেলা থেকে মাতৃস্নেহে তাকে মানুষ করেছেন তাকে, তিনিই আবার লিওনাইনকে নিয়োগ করেছেন তাকে হত্যা করতে। লিওনাইনের কাছে প্ৰাণভিক্ষা চাইল মেরিনা। ঠিক সে সময় একদল জলদসু্য এসে হাজির সেখানে। লিওনাইন যখন মেরিনাকে হত্যা করার জন্য তৈরি হচ্ছে, সে সময় তারা জোর করে মেরিনাকে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চেপে বসল জাহাজে। জাহাজে ওঠার সাথে সাথে পাল তুলে ছেড়ে দিল জাহাজ। জলদসু্যরা কিন্তু মেরিনাকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যে আসেনি। তাদের কয়েকজন যখন ডাঙায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সে সময় তাদের চোখে পড়ে মেরিনাকে। তখনই তারা সিদ্ধান্ত নেয় ক্ৰীতদাসী হিসেবে একে বেচিতে পারলে বাজারে চড়া দাম মিলবে।
জলদস্যুদের সর্দার কিন্তু দাসবাজারের বদলে চড়া দামে মেরিনাকে বেচে দিল মিটিলেনের এক পতিতালয়ে। ও সবজায়গায় যে সব নতুন মেয়ে আসে, খন্দেরের মনোরঞ্জনের জন্য সেখানকার যে বয়স্ক পতিতা তাদের ছলা-কলা আর আদব-কায়দা শেখায়, সবাই তাকে মাসি বলেই ডাকে। সেরূপ এক মাসিও রয়েছে মিটিলেনের পতিতালয়ে। মেরিনাকে খদ্দেরের মনোরঞ্জন করার কায়দা-কানুন শেখাতে তার পিছনে উঠে-পড়ে লাগল সেই মাসি। ততদিনে মেরিনা বুঝতে পেরেছে সে এক নরক থেকে অন্য এক নরকে এসে পড়েছে। সুন্দর, সুখী জীবনের লোভ দেখানো সত্বেও সে কিছুতেই রাজি হয়না পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতে। এমন কি চাবুক মারার ভয় দেখিয়েও বাধ্য করা যায় না। তাকে। মেয়েটি যে এমন অবাধ্য হবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি পতিতালয়ের মালিক এবং মাসি। তারা ভাবতে লাগলেন। কীভাবে মেয়েটিকে সর্বতোভাবে পতিতা করে গড়ে তোলা যায়। ওদিকে দালালদের মারফত মেরিনার রূপের কথা অনেক খন্দেরের কানেই পৌঁছেছে। তার দেহের স্বাদ পেতে অনেকেই পাগল হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে করেই মেরিনাকে শুনিয়ে শুনিয়ে এ কথা বলাবলি করল মাসি আর দালাল। দালাল এও বলল রাতের বেলায় কোনও না কোনও খদের আনবে মেরিনার কাছে। তবুও মেরিনা তার সিদ্ধান্তে অটল – জুলন্ত আগুন, উদ্যত ছুরি কিংবা সমুদ্রের জল, এরা যদি একসাথে মিলেমিশে আমায় মেরে ফেলার ভয় দেখায় — তাতেও ভয় না পেয়ে আমি নিজের সতীত্ব রক্ষা করে যাব। এ কাজে দেবী ডায়ানা আমার সহায় হবেন।
