এ কথা শুনে পেরিক্লিসকে আশ্বাস দিয়ে ক্লিওন বলে উঠলেন, এতো খুব আনন্দের কথা। অল্প কিছুদিন আগে আমার স্ত্রী ডাইওনিজও একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছে। আমরা তার নাম রেখেছি ফিলোটিনা। আপনার মেয়ের সমবয়সি। আমাদের কাছে মেরিনা থাকলে যেমন মাতৃস্নেহ পাবে তেমনি পাবে বোনের স্নেহ-ভালোবাসা। নিজের মেয়ের মতো একই রকম শিক্ষা দিয়ে আমরা তাকে বড়ো করে তুলব। এখন মেরিনা আমাদের কাছেই থাকি; একটু বড়ো হলে না হয়। আপনি ওকে নিয়ে যাবেন। আশা করি ততদিনে ওর লেখা-পড়া, নাচ-গান, কলাবিদ্যা শেখা অনেকটাই এগিয়ে থাকবে। আমার স্ত্রী কাছে থাকলে মাতৃহারা মেরিনা তার মায়ের অভাবও বোধ করবে না। মেয়েকে আমাদের হাতে সঁপে দিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত মনে টায়ারে ফিরে যান পেরিক্লিাস। সেখানে আপনার অপেক্ষায় রয়েছে সবাই।
ক্লিওনের কথা শুনে আশ্বস্ত হলেন পেরিক্লিস। তিনি মেরিনাকে ক্লিওন এবং তার স্ত্রীর হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে টায়ারে ফিরে গেলেন। ধাত্রী লাইকোরিডা কোনওমতেই রাজি হল না। মেরিনাকে ছেড়ে থাকতে। সেও রয়ে গেল থার্সাসে।
ওদিকে সত্যি সত্যি থাইসা কিন্তু মারা ধাননি। আসলে প্রসবের পর তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তার উপর প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডব তার ঘন ঘন বাজ পড়ার আওয়াজ শুনে তিনি মানসিক স্থিতি হারিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অনেকক্ষণ ধরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকার দরুন মাঝি-মাল্লারা ধরে নিয়েছিল তিনি মারা গেছেন। তাই সমুদ্রের রীতি অনুযায়ী তারা তাকে বাক্সে পুরে সমুদ্রের জলে ফেলে দেয়। অনেকক্ষণ ধরে জলের মধ্যে থাকার পর শেষ রাতের দিকে তার অচেতন অবস্থা কেটে যায়, স্বাভাবিক মানুষের মতোই ঘুমোতে থাকেন তিনি। ঘুমন্ত থাইসাকে নিয়ে ভাসতে ভাসতে সেই কাঠের বাক্সটি এসে ঠেকল এফিসাসের উপকূলে। শেষ রাতে স্থানীয় কিছু জেলে মাছ ধরতে গিয়েছিল সমুদ্রে। বাক্সটিকে জলে ভাসতে দেখে তারা সেটিকে তুলে নেয় নৌকায়। কৌতূহলের বশে বাক্সের ঢাকনা খুলে দেখতে পায় থাইসাকে। তার নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখে স্বাভাবিক শ্বাস বইছে। উপকূলের খুবু কাছে থাকেন সেরিমন নামে রাজসভার এক জ্ঞানী সভাসদ। তিনি খুবই পরোপকারী। কারও অসুখ-বিসুখ হলে লোক-জন তার কাছেই ছুটে আসে। তিনিও সাধ্যমতো চিকিৎসা করে তাদের সুস্থ করে তোলেন। জেলেরা কাঠের বাক্সটি নিয়ে এল। তার কাছে। সেরিমন বাক্সের ঢাকনাটি খুলে থাইসকে বের করে বিছানার উপর শুইয়ে দিলেন। থাইসার পরনে মৃতদেহ সমাধিস্থ হবার পোশাক আর বাক্সের ভেতর নানারূপ সুগন্ধী শেকড়-বাকড় দেখে সেরিমন অনুমান করলেন যুবতিটি নিশ্চয়ই জাহাজে চেপে কোথাও যাচ্ছিলেন। কোনও কারণে সে পথিমধ্যে অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। বহুক্ষণ জ্ঞান ফিরে না। আশায় সমুদ্রের রীতি অনুযায়ী মাঝি-মাল্লারা তার দেহে সমাধি দেবার পোশাক পরিয়ে বাক্সে পুরে জলে ফেলে দেয়। বাক্সের ভিতর একটি কৌটো দেখে কৌতূহলী হয়ে সেরিমন সেটা খুলে দেখলেন তাতে রয়েছে একটা গোটানো কাগজ আর হিরের আংটি। কাগজটা খুলে দেখলেন তাতে গোটা গোটা অক্ষরে চিঠির মতো কী যেন একটা লেখা রয়েছে। কাগজটা চোখের সামনে নিয়ে সেরিমন সেটা পড়তে লাগলেন। তাতে লেখা রয়েছে —এই মৃতদেহটি যার চোখে পড়বে সেই ব্যক্তির উদ্দেশে আমিটায়ারের রাজা পেরিক্লিস জানাচ্ছি যে মৃতদেহটি আমার স্ত্রী রানি থাইসার। সমুদ্রযাত্রার সময় প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির দরুন তার মৃত্যু হয়েছে। সমুদ্রের রীতি অনুযায়ী মাঝি-মাল্লারা তার দেহ বাক্সে পুরে জলে ফেলে দেয়। কৌটোর ভিতর একটি হিরের আংটি রয়েছে। যিনি এই মৃতদেহটি পাবেন তাঁর কাছে অনুরোধ তিনি যেন আংটিটি বেচে সেই অর্থ দিয়ে রানিকে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করেন…।
চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে চর্চা করার দরুন দ্রব্যগুণ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান আছে সেরিমনের। তার সেবা-যত্নে একসময় সুস্থ বোধ করে চোখ মেলে তাকালেন থাইসা। সেরিমনের দেওয়া ওষুধ খেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠলেন। থাইস। পেরিক্লিসের লেখা চিঠি এবং হিরের আংটিটা থাইসাকে দেখিয়ে সেরিমন বললেন, এই চিঠিটা পড়ে আপনার পরিচয় জেনেছি। আমি। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে হলে আরও কিছুদিন আমার এখানে থেকে আপনাকে বিশ্রাম নিতে হবে। কাজেই আপনি ভাবনা-চিন্তা সব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিন। আপনি এখন এফিসাসে রয়েছেন। আমার নাম সেরিমন। আমি এখানকার রাজার একজন সভাসদ। চিকিৎসাশাস্ত্রে আমার যা সামান্য জ্ঞান আছে, আশা করি তা দিয়ে আপনাকে সুস্থ করে তুলতে পারব। আমার অনুরোধ, পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আপনি আমার এখানেই থাকুন।
হিরের আংটিটি সেরিমনকে দেখিয়ে থাইসা বললেন, আপনারা মতো মহৎ ব্যক্তির মুখেই এ কথা শোভা পায়। বিয়ের কিছুদিন বাদে আমি স্বামীর সাথে জাহাজে চেপে তাঁর রাজ্যে যাচ্ছিলাম। মাঝপথে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। সেই ঝড়ের মাঝেই আমার কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। তারপরআমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার শুধু এটুকুই মনে আছে। জ্ঞান ফিরে আসতেই দেখি আমি আপনার বাড়িতে শুয়ে আছি। জামা-কাপড় সব জলে ভেজা। এখন স্বামীর চিঠি পড়ে বুঝতে পারছি আমাকে মৃত ভেবে মাঝি-মাল্লারা আমার দেহটি বাক্সে পুরে সমুদ্রের জলে ফেলে দেয়। ঈশ্বরের দয়ায় প্ৰাণে বেঁচে আমি আপনার আশ্ৰয় পেয়েছি। আমি জানি না। স্বামী-কন্যার কী দশা হয়েছে। ঝড়-জলের হাত থেকে আমার স্বামী ও সদ্যোজাত কন্যাটি রক্ষা পেয়েছে কিনা জানি না। এখন আপনিই বলুন মহাত্মা সেরিমন, এভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ? কীভাবে দিন কটাব আমি? বেশ বুঝতে পারছি চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসই এখন আমার একমাত্র সম্বল।
