চিঠি নিয়ে টায়ারের দূত এসে উপস্থিত হলেন পেন্টাপোলিসের রাজপ্রাসাদে। রাজা সাইমোনাইডিসের সাথে দেখা করে তিনি তাকে বললেন যে তাদের প্রিয় রাজা পেরিক্লিসের জন্য তিনি কিছু বার্তা নিয়ে এসেছেন। সসম্মানে দূতকে বসতে বলে তিনি পেরিক্লিসকে খবর পাঠালেন রাজসভায় আসার জন্য। সে সময় পেরিক্লিস তখন অস্তঃপুরে তার স্ত্রী থাইসার সাথে কথা বলে সময় কাঁটাচ্ছিলেন। হেলিকেনাসের দূত এসেছেন শুনে তিনি চলে এলেন রাজসভায়। তাঁকে আসতে দেখে টায়ারের দূত তার নিজের আসন ছেড়ে উঠে তাকে যথারীতি অভিবাদন জানিয়ে
হেলিকেনাসের চিঠি পড়ে তিনি জানতে পারলেন রথের উপর বাজ পড়ে মারা গেছেন পাপিষ্ঠ রাজা অ্যান্টিওকাস আর তার মেয়ে। তিনি এও জানতে পারলেন তার দীর্ঘ অনুপস্থিতির দরুন হেলিকেনাসের শাসন আর মানতে চাইছে না। টায়ারের মন্ত্রী আর সভাসদরা এবং তার খোজ না পেলে হেলিকেন্যাস বাধ্য হবেন সভাসদদের কাউকে সিংহাসনে বসাতে। হেলিকে নাসের কথার উত্তরে পেরিক্লিাস তাকে জানিয়ে দিলেন শীঘ্রই তিনি টায়ারে ফিরে যাবেন। রাজা সাইমোনাইডিসকে অভিবাদন জানিয়ে পেরিক্লিসের চিঠি নিয়ে টায়ারের দূত ফিরে গেল তার নিজ রাজ্যে।
দূত চলে যাবার পর রাজা সাইমোনাইডিসকে সবকিছু জানিয়ে পেরিক্লিস বললেন রাজসিংহাসন এবং দেশের স্বার্থরক্ষার জন্য তার অবিলম্বে টায়ারে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। পেরিক্রিসের দুঃসময়ের অবসান হয়েছে জেনে সাইমোনাইডিস আর আপত্তি করলেন না। এমনকি থাইসা গর্ভবতী জেনেও তিনি তাকে যাবার অনুমতি দিলেন। পরদিন এক শুভ সময়ে পেরিক্রিসের সাথে জাহাজে চেপে টায়ার অভিমুখে রওনা হলেন থাইসা। রাজা সাইমোনাইডিসের নির্দেশে গর্ভবতী থাইসার দেখাশোনার জন্য তার সঙ্গী হল ধাত্রী লাইকোরিডা।
পেন্টাপোলিস বন্দর ছেড়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করে একসময় পেরিক্লিসের জাহাজ এসে পৌছােল মাঝসমুদ্রে। খানিক বাদে ঈশান কোণে দেখা দিল একটুকরো ঘন কালো মেঘ। দেখেই গভীর হয়ে গেল মাঝিমাল্লাদের মুখ। দেখতে দেখতে সেই একটুকরো কালো মেঘ ছেয়ে ফেলল। সারা আকাশ। মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল উজ্জ্বল সূর্য। শুরু হয়ে গেল প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি। এই প্রাকৃতিক গোলযোগের মধ্যেই জাহাজের কেবিনে থাইসা জন্ম দিলেন এক কন্যা-সন্তানের। মেয়েকে দেখাবার জন্য তাকে পেরিক্রিসের কাছে নিয়ে এলেন ধাত্রী লাইকোরিডা। আর তার কাছেই শুনলেন পেরিক্লিসএর কন্যার জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছেন, থাইসা। ধাত্রী জানালেন গর্ভবতী হবার পরই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন থাইসা। ঝড়ের দাপট আর জাহাজের বাকুনি সহ্য করতে পারেননি তিনি।
থাইসার মৃত্যু-সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন পেরিক্লিস। তিনি মনে মনে ভাবলেন কেন যে ঈশ্বর তাকে থাইসার মতো একজন সুন্দরা গুণবতী স্ত্র দিয়ে আবার তাকে ফিরিয়ে নিলেন। — এ প্রশ্ন নিজেকে করলেন তিনি। এখন কেইবা স্তন্যপান করিয়ে এই ফুলের মতো শিশুটিকে বড়ো করে তুলবে? সমুদ্রে জন্মেছে বলে পেরিক্লিস মেয়ের নাম রাখলেন মেরিনা।
ওদিকে ঝড়ের দাপট কিন্তু তখনও সমানে চলছে। সে সময় দু-জন নাবিক এসে বলল জাহাজে মৃতদেহ থাকার দরুন প্রকৃতির আক্রোশ কমছে না। মৃতদেহ সমুদ্রে ফেলে দিলেই সমূদ্র আবার শান্ত হয়ে উঠবে। পেরিক্লিস তাদের বোঝাতে চাইলেন এ নিছক কুসংস্কার। জাহাজ ডাঙায় ভিড়লেই তিনি মৃতদেহ সমাধিস্থ করবেন। তিনি বললেন নাবিকেরা যেন ততক্ষণ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। কিন্তু তার অনুরোধে কোনও কাজ হল না।
দল বেঁধে নাবিকেরা বারবার এসে বলতে লাগল। মাঝসমুদ্রে ঝড় ওঠার পর যদি কোনও নাবিক বা যাত্রী মারা যায়, তাহলে তাকে সমূদ্রে ফেলে দেওয়াই প্রচলিত রীতি। তাদের বিশ্বাস রানির মৃতদেহ সমুদ্রে ফেলে দিলেই ঝড় থেমে যাবে।
পেরিক্লিস বুঝতে পারলেন হাজার চেষ্টা করেও তিনি এদের বোঝাতে পারবেন না। তার চোখের সামনেই প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃতদেহ এরা সমুদ্রে ফেলে দেবে আর হিংস্র হাঙ্গর এসে তাটুকরো টুকরো করে তাকে খাবে। তিনি আক্ষেপ করে বলতে লাগলেন, হায় ঈশ্বর! স্ত্রীর মৃতদেহ সমাধিস্থ করার মতো জায়গািটুকুও তুমি আমায় দিলে না? শেষমেশ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে স্ত্রীর মৃতদেহসমুদ্রে ফেলে দেবার আদেশ দিলেন নাবিকদের। তারা একটা বড়ো বাক্স নিয়ে এসে তার ভেতর সুন্দর করে বিছানা পেড়ে গুইয়ে দিল থাইসার মৃতদেহ। ধাত্রী লাইকোরিডা সুগন্ধী ছিটিয়ে দিল বাক্সর ভেতর। এরপর পুরু কৰ্ক দিয়ে বাক্সের মুখটা এটে নাবিকেরা সেটা ফেলে দিল উত্তাল সমুদ্রের জলে। তা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন পেরিক্লিস। এ দৃশ্য সইতে না পেরে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন তিনি।
সত্যি সত্যিই মৃতদেহ জলে ফেলে দেবার পর শান্ত হয়ে গেল সমুদ্র। নাবিকদের কাছে তিনি জানতে পারলেন জাহাজ এসে পৌঁছেছে। থার্সাসের উপকূলে। থার্সাসের নাম শুনে উৎসাহিত হয় উঠলেন পেরিক্লিস। তিনি স্থির করলেন। থার্সাসের শাসক ক্লিওনের উপর তিনি মেয়ে মেরিনার লালন-পালনের ভার দিয়ে যাবেন। এতদিন বাদে উপকারী বন্ধুকে দেখে খুব খুশি হলেন ক্লিওন আর তার স্ত্রী ডাইওনিজা। সেই সাথে তারা চরম দুঃখ পেলেন যখন পেরিক্লিসের কাছে শুনলেন তার স্ত্রী থাইসা মারা গেছেন। জন্ম-মৃত্যু সবই বিধির বিধান। কারও হাত নেই তাতে। তারা পেরিক্লিসকে বোঝালেন যা ঘটেছে তা মেনে নিতে। তখন একমাত্র কাজ শিশুকন্যা মেরিনাকে বড়ো করে তোলা। তখন পেরিক্লিস বললেন বহুদিন বাদে দেশে ফিরে যাচ্ছেন তিনি। রাজ্য পরিচালনার পাশাপাশি মেয়ের প্রতি নজর রাখা তীর পক্ষে সম্ভব হবে না। তিনি মেয়েকে বড়ো করার ভার দিতে চান ক্লিওন আর তার স্ত্রী ডাইওনিজার হাতে।
