রাজার কথা শুনে বিষন্ন মনে যে যার দেশে চলে গেলেন নাইটেরা। তারা সবাই চলে যাবার পর রাজা পুনরায় খুঁটিয়ে পড়তে লাগলেন মেয়ের চিঠিটা। চিঠির শেষে মেয়ে লিখেছে বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে টায়ার থেকে পেরিক্লিস নামে যে নাইট এসেছেন তাকেই বিয়ে করবেন তিনি। নইলে বাকি জীবন চোখে কালো কাপড় বেঁধে কাটাবেন যাতে সূর্যের আলো বা পর পুরুষের মুখ দেখতে না হয়।
তার পছন্দের মানুষটিকেই মেয়ে বিয়ে করতে চায় জেনে খুশি হলেন রাজা সাইমোনাইডিস। সত্যি কথা বলতে কী, গতরাতে তার নাচ-গান শুনে তিনি নিজেই পেরিক্লিসকে তার জামাতার আসনে বসিয়েছেন। থাইসা আর পেরিক্লিস যে একে অপরকে ভালোবাসে তা বুঝতে বাকি রইল না রাজার। তবুও তাদের ভালোবাসা যে কতটা খাঁটি তা যাচাই করে নিতে চাইলেন তিনি। এর ঠিক কিছুক্ষণ বাদেই সেখানে এসে হাজির হলেন পেরিক্লিস। রাজা প্রথমে তার নাচ-গানের প্রশংসা করে থাইসা সম্পর্কে তার অভিমত জানতে চাইলেন। থাইসার রূপ গুণ, দুয়েরই প্রশংসা করলেন পেরিক্লিস। তখন রাজা তাকে দেখালেন। থাইসার লেখা চিঠিটা।
চিঠিটা পড়ে খুবই আশ্চর্য হয়ে গেলেন পেরিক্লিস। এত সব নাইটদের ছেড়ে থাইসা যে কেন তাকে বিয়ে করতে পাগল হয়ে উঠেছে তা কিছুতেই বুঝতে পারলেন না তিনি। সেই সাথে তার মনে হল নিশ্চয়ই সাইমোনাইডিসের কুনজর পড়েছে তার উপর। তবুও চুপচাপ না থেকে তিনি খোলাখুলিভাবে রাজাকে জানালেন যে তিনি অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করেন তার মেয়েকে। তাকে ভালোবাসার মতো দুঃসাহস তার নেই। রাজা বুঝতে পারলেন। থাইসার চিঠি পড়ে খুবই ঘাবড়ে গেছেন পেরিক্লিাস। তাকে আরও একটু যাচাই করে নেবার জন্য তিনি পেরিক্লিসকে শয়তান বলে অভিহিত করলেন। তিনি আরও বললেন ডাইনি বিদ্যার সাহায্যে সে তার মেয়েকে বশ করেছে। এর জবাবে ঈশ্বরের নামে শপথ নিয়ে পেরিক্লিস বললেন যে রাজার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যে। এমন কোনও কাজ করেননি তিনি।
পেরিক্লিসের প্রতিবাদ সত্ত্বেও রাজা তাকে বিশ্বাসঘাতক বললেন। তিনি আরও বললেন নিজের সম্পর্কে যে যা কিছু বলেছে তা সর্বৈব মিথ্যে। রাজা তাকে বিশ্বাসঘাতক, মিথ্যেবাদী বলায় রাগে জুলে উঠলেন পেরিকিস। তিনি আরও বললেন সাইমোনাইডিস রাজা না হলে তিনি তাকে বাধ্য করতেন। ওইসব গালি-গালাজ ফিরিয়ে নিতে।
তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে দেখে খুশি হলেন রাজা সাইমোনাইডিস। পেরিক্লিস যে সৎসাহসী তাতে কোনও সন্দেহ নেই তার। কিন্তু নিজের মনোভাব বাইরে প্রকাশ করলেন না তিনি। অনুচর পাঠিয়ে তিনি ডেকে আনলেন। থাইসাকে। মেয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে তিনি তার মনোভাবও যাচাই করতে চাইলেন। তিনি মেয়েকে বললেন তার অমতে পেরিক্রিসের মতো একজন অচেনা অজানা বিদেশি যুবককে ভালোবেসে খুব অন্যায় করেছে সে। এজন্য তার প্রতি তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন।
এভাবে পেরিক্লিসের সামনে বাবার বকুনি খেয়ে খুবই লজ্জা পেলেন থাইসা। তিনি চুপচাপ মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। থাইস। থাইসার অবস্থা দেখে আর চুপ করে থাকতে পারলেন না পেরিক্লিস। তিনি থাইসাকে বললেন, তুমি একজন সুন্দরী গুণবতী নারী। কিন্তু তা সত্ত্বেও অমি তোমায় প্রকাশ্যে প্রেম নিবেদন করিনি। কেন তুমি এ কথাটা বাবাকে বুঝিয়ে বলতে পারছি না?
তার কথার জবাবে থাইস বললে, আপনি যদি আমাকে প্ৰেম নিবেদন করেও থাকেন এবং তার ফলে আমি যদি আনন্দ পেয়ে থাকি, তাতে অন্যায় বা দোষণীয় কী আছে?
থাইসার জবাব শুনে চমকে উঠলেন পেরিক্লিস। রাজা বুঝতে পারলেন তাঁর মেয়ে সত্যিই ভালোবাসে পেরিক্লিসকে। এ অবস্থায় তাদের বাধা দেওয়া বৃথা। ভেতরে ভেতরে খুব খুশি হলেও বাইরে রাগ দেখিয়ে বললেন রাজা, এবার বিয়ে দিয়ে তোমাদের মনের আশা পূর্ণ করব। বিয়েতে তোমরা রাজি আছ তো?
তাঁরা দুজনে একসাথে বললেন, আমরা রাজি আছি। এবার আপনি খুশি হলেই সব দিক পূর্ণ হয়।
রাজা সাইমোনাইডিস বললেন, আমি সত্যিই খুশি হয়েছি। এবার তাড়াতাড়ি তোমাদের বিয়েটা দিয়ে দিই। তোমরা সুখে-স্বচ্ছন্দে এ প্রাসাদে বাস কর।
রাজার উদ্যোগে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বিয়ে হল থাইসা আর পেরিক্লিসের। রাজার ইচ্ছায় তাঁরা প্রাসাদেই দাম্পত্য জীবন কাটাতে লাগলেন। পুরো একবছর না যেতেই গর্ভবতী হলেন থাইস।
পেরিক্রিসের নিজ রাজ্য টায়ারের অবস্থা কিন্তু ওদিকে ঘোরালো। এক ধরনের ক্ষোভ আর হতাশা জমাট বেঁধে উঠেছে রাজ্যের মন্ত্রী, সভাসদ আর অমাত্যদের মনে। রাজার দীর্ঘ অনুপস্থিতি আর তার কারণ জানতে চাইলে মন্ত্রী হেলিকেনাসের সদুত্তরের বদলে কেমন একটা গা-ছাড়া ভাব- এসব দেখে দেখে ক্ৰমেই তাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নানা রকম সন্দেহ জাগছে তাদের মনে। এভাবে কিছুদিন কাটাবার পর একদিন তাঁরা সবাই এসে হাজির হলেন হেলিকেনাসের কাছে। রাজা পেরিক্রিসের ব্যাপারে নানারূপ প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন তাকে। তাদের সবারই এক কথা-রাজা পেরিক্রিসের খোজ না পাওয়া পর্যন্ত শাস্ত হবেন না তারা। তারা এও বললেন এভাবে রাজসিংহাসন শূন্য রেখে রাজ্যশাসন করাটা তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না।
সভাসদদের মনোভাব বুঝতে পেরে হেলিকেন্যাস বললেন, আমি জানি আপনাদের ক্ষোভের সঙ্গত কারণ আছে! আপনারা জেনে রাখুন এবারে সময় হয়েছে তাকে ফিরিয়ে আনার। পৃথিবীর যে প্রান্তেই তিনি থাকুন না কেন, তাকে ফিরিয়ে এনে টায়ারের শূন্য সিংহাসনে বসানোই আমাদের প্ৰতিজ্ঞা। আপনারা এও জেনে রাখুন। যদি তাকে খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে আপনারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে যে কোনও সভাসদকে রাজসিংহাসনে বসাতে পারেন। হেলিকেনাসের আশ্বাস, পেয়ে তখনকার মতো চলে গেলেন মন্ত্রী ও সভাসদরা। তিনি বুঝতে পারলেন এবার আর অপেক্ষা করার সময় নেই। যে করেই হোক ফিরিয়ে আনতে হবে রাজা পেরিক্লিসকে। তিনি সবকিছু জানিয়ে একটা চিঠি লিখে দূত মারফত পেন্টাপোলিসে পাঠিয়ে দিলেন।
