রাজকুমারী থাইসা খুবই দুঃখ পেলেন পেরিক্লিসের ভাগ্য-বিড়ম্বনার কথা শুনে। ফিরে এসে বাবাকে বললেন, বাবা! উনি টায়ার রাজ্যের এক সম্রাস্ত বংশের সন্তান— নাম পেরিক্লিস। সব রকম কলা এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদশী উনি। ঝড়ের দাপটে জাহাজ ডুবি হয়ে সবাই সমুদ্রের অতলে। ডুবে গেছে। একমাত্র উনিই ভাসতে ভাসতে আমাদের দেশের উপকূলে এসে পৌঁছেছেন। মেয়ের মুখে সবকিছু শুনে রাজাও খুব দুঃখ পেলেন। তিনি মেয়েকে কথা দিলেন যে ভাবেই হোক পেরিক্রিসের দুঃখ-দুৰ্দশা মোচন করবেন। এবার অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য রাজার অনুরোধে সবাই মহিলাদের সাথে নিয়ে শুরু করলেন সৈনিক নৃত্য। রাজা নিজেও যোগ দিলেন নাচের আসরে। কিছুক্ষণ বাদে পেরিক্লিসের সামনে রাজা বললেন, আমি তো শুনেছি টায়ারের লোকেরা মেয়েদের সাথে ভালো নাচতে পারে। খুব খুশি হব। আপনি যদি আমাদের সাথে নাচে যোগ দেন। রাজার অনুরোধ এড়াতে না পেরে পেরিক্লিসও মহিলাদের সাথে নাচতে শুরু করলেন। অনুষ্ঠান শেষে পেরিক্লিসের নাচের ভূয়সী প্রশংসা করে সবাইকে সেদিনের মতো বিশ্রাম নিতে বলে চলে গেলেন রাজা।
এবারে নজর ফেরানো যাক পেরিক্রিসের নিজ রাজ্য টায়ারের ঘটনাবলির দিকে। আগেই বলা হয়েছে নিজ রাজ্য ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি দেবার আগে তিনি শাসনভার সাপে দিয়ে এসেছিলেন তাঁর মন্ত্রী হেলিকেনাসের উপর। হেলিকেন্যাস তার দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করলেও রাজা কোথায় আছেন, কবে ফিরবেন—এজাতীয় প্রশ্নের মুখোমুখি প্রায়ই হতে হয় তাকে! একদিন প্রাসাদের সভাকক্ষে এসকেন নামক জনৈক সভাসদ ওই জাতীয় প্রশ্ন করলেন তাকে; কথায় কথায় সেদিন নানা প্রসঙ্গ উঠল। হেলিকেন্যাস সভাসদদের জানালেন যে অ্যান্টিওকের ব্যভিচারী রাজা ও তার মেয়ে উভয়েই বাজ পড়ে মারা গেছে। কিছুদিন আগে অ্যান্টিওকাস নাকি তার মেয়েকে নিয়ে রথে চেপে কোথাও যাচ্ছিলেন। সে সময় তাদের উপর বাজ পড়ে — ছিড়ে টুকরো টুকরো হয় তাদের দেহ। এভাবেই নিজেদের পাপের সাজা পেলেন তারা। হয়তো ঈশ্বর এ ভাবেই পাপীকে শাস্তি দেন। হেলিকেনাসের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন এসকেন। তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি এভাবে পাপিষ্ঠ রাজাকে শাস্তি দেবেন। ঈশ্বর। এর পরই অন্যান্য সভাসদর রাজা পেরিক্লিস কোথায় আছেন? তিনি ফিরে আসবেন কিনা?-এ জাতীয় প্রশ্ন করে বিব্রত করে তুলতে লাগলেন হেলিকেন্যাসকে। অনেকে আবার এও বললেন রাজা পেরিক্লিস আর বেঁচে নেই এবং সে কথা ইচ্ছে করেই তাদের জানাননি হেরিকেনাস। তাদের বক্তব্য, এই যদি প্রকৃত পরিস্থিতি হয় তাহলে হেলিকেন্যাস যেন টায়ারের সিংহাসনে বসে রাজ্যশাসনের ভার নিজ হাতে তুলে নেন। তারা হেলিকেন্যাসকে আশ্বাস দিলেন যে তিনি সিংহাসনে বসলে সবাই তার আনুগত্য স্বীকার করে সৰ্ব্বতোভাবে সাহায্য করবেন তাঁকে।
কিন্তু সিংহাসনে বসতে মোটেই আগ্রহী নন হেলিকেন্যাস। তিনি সবিনয়ে সভাসদদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন যারা রাজা পেরিরিকসকে সত্যিই ভালোবাসেন, তারা যেন দেশ এবং রাজার স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্তত এক বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। যদি এই সময়ের মধ্যে রাজা পেরিক্লিস ফিরে না আসেন, তাহলে নিজের অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই বয়সে রাজ্য শাসনের ভার নিজের হাতে তুলে নেবেন তিনি। সভাসদদের এটা পছন্দ না হলে তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো একজনকে বেছে নিয়ে তার হাতে টায়ারের শাসনভার তুলে দিতে পারেন। তিনি তাদের এও বললেন তাদের প্রিয় রাজা পেরিক্লিস মারা গেছেন বলে যারা ধারণা করছেন, তেমন কোনও দুর্ঘটনার কথা জানা নেই তার।
হেলিকেনাসের কথা শেষ হতেই সভাসদরা একবাক্যে জানালেন তারা তার মত অনুযায়ী চলতে ইচ্ছক, তারাও তার মতো ভালোবাসেন রাজাকে। একথা জেনে হেলিকেন্যাস আশ্বস্ত হলেন যে তার উপর সভাসদদের আস্থা আগের মতেই অটুট আছে।
রাজা সাইমোনাইডিস বসে রয়েছেন তাঁর পেন্টাপলিসের রাজপ্ৰসাদে। তাঁর আমন্ত্রণে দেশ বিদেশ থেকে যে সব রাজা, রাজপুত্র আর নাইটরা এসেছেন, তারা সবাই জানেন তাদেরই একজনের সাথে রাজকুমারীর বিয়ে দেবেন। রাজা। হঠাৎ সে সময় রাজকুমারী থাইস। তাঁর বাবাকে চিঠি লিখে জানালেন যে বাবার পছন্দমতো কাউকে বিয়ে করা এ মুহূর্তে তাঁর পক্ষে সম্ভবপর নয়। এর পাশাপাশি থেইসা কাকে বিয়ে করতে চান সে কথাও জানিয়েছেন বাবাকে। মেয়ের লেখা চিঠিটা পেয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন রাজা।
সকালবেলা প্রাসাদে বসে মেয়ের লেখা চিঠিটা মন দিয়ে পড়ছিলেন রাজা, সেই সময় থেইসাকে বিয়ে করতে ইচ্ছক নাইটেরা এলেন রাজার কাছে তাদের দেখে চিঠি থেকে মুখ তুলে রাজা বললেন, মাননীয় নাইটগণ! আমি খুব দুঃখিত যে আমার মেয়ে থাইসা বিয়ের ব্যাপারে তার মত পালটিয়েছে। সে বলেছে আগামী এক বছরের মধ্যে সে কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। আমি অনেক চেষ্টা করেও তার এই আকস্মিক পরিবর্তনের কারণ জানতে পারিনি?
নাইটদের মধ্যে একজন বললেন, আমরা কি একবার রাজকুমারীর সাথে দেখা করতে পারি?
গম্ভীর স্বরে রাজা সাইমোনাইডিস বললেন, আমি দুঃখিত মাননীয় নাইট, থেইসা তার নিজের মহলে নিজেকে এমন ভাবে আটকে রেখেছে যে কারও পক্ষে তার সাথে দেখা করা সম্ভব নয়। দেবী সিনথিয়ার নামে সে শপথ নিয়েছে ডায়নার মতো আগামী এক বছর কুমারী জীবন কাটাবে সে। দেহ মনের সমস্ত শক্তি দিয়ে এই শপথ পালন করবে সে।
