সেই জেলে বলল, তাহলে তুমি ঠিক করেছ রাজপ্রসাদে যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা হবে তাতে তুমি যোগ দেবে?
তুমি ঠিকই ধরেছি! ওখানে অস্ত্ৰ প্ৰতিযোগিতায় আমি আমার পারদর্শিতা দেখাব, সায় দিয়ে পেরিক্লিস বললেন।
জেলে বলল, বেশ! সমুদ্রের অতল থেকে তুলে আনা এই বর্ম পরে যদি তোমার ভাগ্য ফেরে, তাহলে আমাদের কথা কিন্তু ভুলে যে ও না।
পেরিক্লিস বললেন, আমি কথা দিচ্ছি। তেমন সুদিন এলে আমি অবশ্যই তোমাদের কথা মনে রাখব। তবে শুধু বর্ম হলে তো হবে না, প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে হলে একটা ঘোড়াও দরকার আমার।
পোশাক আর ঘোড়ার ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি। তুমি এবার তৈরি হও।
তোমরা যে আমার কী উপকার করলে তা আমি ভাষায় বোঝাতে পারব না, বললেন পেরিক্লিস, ঈশ্বর তোমাদের ভালো করুন।
এবার তার বাবার দেওয়া জং-ধরা লোহার বর্ম পরিধান করে জেলেদের জোগাড় করা তেজী ঘোড়ায় চেপে যথাসময়ে প্রতিযোগিতা ক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন পেরিক্লিস। রাজার মেয়ে থাইসার জন্মদিন উপলক্ষে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে রাজপ্রাসাদের চারদিকটা। এ উপলক্ষে যে অস্ত্ৰ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে তাতে যোগ দেবার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন, রাজা, রাজপুত্র আর নাইটরা। প্রাসাদ প্রাঙ্গণের একদিকে বসেছেন তারা। বাইরে দাঁড়িয়ে তাদের ঘোড়াগুলির দেখভাল করছেন সহিসেরা। এতসব আয়োজন দেখে বল-ভরসা পেলেন পেরিক্লিস। প্রাসাদের বাইরে একটা খুঁটিতে ঘোড়াটাকে বেঁধে রেখে অভ্যাগতদের পাশে গিয়ে বসলেন তিনি। কিছুক্ষণ বাদে চড়া সুরে বেজে উঠল বাজনা। ধীর পায়ে কন্যা থাইসার হাত ধরে প্রাসাদ প্রাঙ্গণে এলেন রাজা সাইমোনাইডিস। তাদের অভ্যর্থনা জানাতে সমবেত অতিথিরা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। প্রাসাদের একপাশে তৈরি হয়েছে একটা সুসজ্জিত মঞ্চ। সেখানে দুটি আসনে পাশাপাশি বসলেন তারা। সুন্দরী থাইসার পরনে ঢিলেঢালা রেশমের পোশাক, কানে-গলায় হাতে দুর্লভ হিরে মণিমুক্তাখচিত অলংকার। রাজা তার নিজ আসনে বসে সৌজন্য সহকারে হাত নাড়ার পর সবাই তার নিজ নিজ আসনে বসে পড়লেন।
এবার রাজার নির্দেশে শুরু হল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। স্পার্ট থেকে এসেছেন একজন নাইট যার ঢালের গায়ে আঁকা রয়েছে একটা ছবি আর উদ্ধৃতি। রাজা নিজে সেটা পড়ে শোনালেন মেয়েকে, তাতে লেখা — সেই তোমাকে প্রকৃত ভালোবাসে যে তোমারা জন্য প্ৰাণ দিতে পারে। এরপর এলেন। দ্বিতীয় নাইট যিনি আদতে ম্যাসিডনের রাজপুত্র। তিনি দেখালেন কীভাবে নারীর কাছে হেরে গেলেন একজন নাইট।
এরপর কয়েকজন নাইট একে একে মঞ্চে উঠে তাদের খেলা দেখালেন। সব শেষে এলেন পেরিক্লিস — তিনি হলেন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ষষ্ঠ নাইট। তাকে চিনতে না পারলেও তার আচার-আচরণ তার গভীর ব্যক্তিত্বের প্রভাবে তার প্রতি আকৃষ্ট হলেন রাজা সাইমোনাইডিস।
পেরিক্লিসকে দেখে মন্তব্য করলেন রাজকুমারী থাইস – এ নাইটকে দেখে মনে হচ্ছে ইনি যেন একটা শুকিয়ে যাওয়া গাছ, যার মাথায় কোনওমতে টিকে আছে কয়েকটা সবুজ পাতা।
মেয়ের কথা কানে যেতেই বলে উঠলেন রাজা, একে দেখেই বুঝতে পারছি চরম দুৰ্দশার মাঝেও কঠোর সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন ইনি। তোমার সাহায্যে তার দুর্ভাগ্যকে জয় করার আশা নিয়েই এ প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে এসেছেন ইনি।
একজন সভাসদ আবার আড়াচোখে পেরিক্রিসের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গের সাথে মন্তব্য করলেন, দেখে তো মনে হয় না। কখনও যুদ্ধে গেছেন। লোকটা একেবারে কাণ্ডজ্ঞানহীন।
সভাসদদের কথা শুনে রাজা সাইমোনাইডিস বলে উঠলেন, বাইরের চেহারা দেখে কাউকে। বিচার করার অর্থ নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। যাই হোক, সবাই এসে গেছেন, আশা করি আপনারা এবার সংযত হবেন। চলুন, গ্যালারিতে যাই আমরা।
নিজের নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসলেন রাজা সাইমোনাইডিস। তার পাশের আসনে বসলেন। রাজকুমারী থাইসা। অভাগত সবাই যে যার আসনে গিয়ে বসলেন। এবার অভ্যাগতদের খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলেন রাজা। খানিকবাদে তার নজর পড়ল পেরিক্লিসের উপর। দুঃখ-দুৰ্দশার চাপে তাকে ক্লান্ত দেখালেও বীরের মতো ব্যক্তিত্ব আর রাজার মতো সুন্দর মুখশ্ৰী ভীষণভাবে আকৃষ্ট করল রাজাকে।
দূর থেকেইশারায় পেরিক্লিসকে দেখিয়ে রাজা চাপা স্বরে তীর মেয়েকে বললেন, ওই যুবকও যে আজকের অস্ত্ৰ প্ৰতিযোগিতায় যোগ দিয়েছিল সে কথা বেশ মনে আছে আমার। আমি বুঝতে পারছি না। এত আনন্দের মাঝেও কেন ওকে এত বিযগ্ন দেখাচ্ছে! মনে হয় আমাদের কোনও আচরণে হয়তো উনি দুঃখ পেয়েছেন। যাই হোক, তুমি এক কাজ কর। তুমি নিজে একপাত্র সুস্বাদু সুরা নিয়ে গিয়ে ওকে পরিবেশন কর। সেই সাথে ওর নাম, পরিচয় সবকিছু জেনে নিও।
রাজার নির্দেশে একপােত্র সুস্বাদু সুরা নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে তা পেরিক্লিসকে পরিবেশন করলেন থাইসা-সেই সাথে জানাতে চাইলেন তার নাম-ধাম ও পরিচয়! হাসিমুখে থাইসার দেওয়া সুরা হাতে নিয়ে পেরিক্লিস বললেন, আমার নাম পেরিক্লিস। আমি টায়ার রাজ্যের এক সন্ত্রান্ত বংশের সন্তান। সবরকম কলা এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী আমি। একদল যাত্রীর সাথে সমুদ্রপথে এক দুঃসাহসিক অভিযানে পাড়ি দিয়েছিলাম আমি। প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডবে জাহাজ ডুবি হয়ে সমুদ্রের অতলে তলিয়ে গেছে সবাই। করুণাময় ঈশ্বরের কৃপায় একমাত্র আমিই ভাসতে ভাসতে এ দেশের উপকূলে এসে পড়েছি।
