থার্সাসের মানুষদের এই চরম দুঃখ-দুৰ্দশা দেখে হতাশ হয়ে পড়লেন সেখানকার শাসনকর্তা ক্লিওন। অনেক ভেবেচিন্তেও তিনি হদিস পেলেন না। কীভাবে প্রজাদের দুর্দশা দূর করা যায়।
থার্সাসের লোকদের যখন এই অবস্থা, সে সময় কয়েকজন অনুচরসহ জাহাজে চেপে সেখানে এস হাজির হলেন রাজা পেরিক্লিস। তিনি রাজাকে অভিবাদন করে বললেন, থার্সাসে যে দুৰ্ভিক্ষ চলছে সে খবর আমি আগেই পেয়েছি। তাই আমি জাহাজে করে তাদের জন্য প্রচুর খাদ্য-শস্য নিয়ে এসেছি। এতে অন্তত কিছুদিনের জন্য তাদের খাদ্যাভাব মিটবে। তবে এর বিনিময়ে আমার কিছু চাইবার আছে মহারাজ।
রাজা ক্লিওন বললেন, যখন খাদ্যাভাবে আমার লোকেরা শেয়াল-কুকুরের মতো মরছে, সে সময় আপনি তাদের জন্য জাহাজভর্তি খাবার নিয়ে এসেছেন। এর বিনিময়ে আমার যদি কিছু করার থাকে তা আমি আশুই করব। আপনি নিঃসঙ্কোচে বলুন কী চাই আপনার।
বিশেষ কিছু নয় মহারাজ, বললেন রাজা পেরিক্লিস, ‘এই কয়েকজন অনুচরসহ আমি কিছুদিন আপনার রাজ্যে থাকতে চাই।
এ আর এমন কী! আপনার যতদিন ইচ্ছে থাকুন। এখানে, আমি বরঞ্চ খুশিই হব তাতে, বললেন রাজা ক্লিওন, আমি আপনাকে যে কোনও রকম সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
পেরিক্লিস কিছুদিন কটালেন। থার্সারের রাজা ক্লেওনের রাজপ্রাসাদে। এর মাঝে তিনি চিঠিপত্রের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছিলেন অমাত্য হেলিকেনাসের সাথে। তার একটা চিঠিতেই পেরিক্লিস জানতে পারলেন কিছুদিন আগে তাকে হত্যা করার জন্য রাজা অ্যান্টিওকাস তার মন্ত্রী থেলিয়ার্ডকে টায়ারে পাঠিয়েছিলেন। তার নিরুদ্দেশ যাত্রার খবর শুনে অ্যান্টিওকে ফিরে গেছেন থেলিয়ার্ড। খবরটা শুনে চিন্তায় পড়ে গেলেন পেরিক্লিস। কারণ তিনি এখানে আছেন জানতে পারলে অ্যান্টিওকাস আবার লোক পাঠাবেন তাকে হত্যা করতে। তাই রাজা ক্লিওনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জাহাজে চেপে পুনরায় যাত্রা করলেন অজানার উদ্দেশে।
থার্সাস ছেড়ে যাবার পর দুটো দিন ভালোভাবেই কাটল। কিন্তু তৃতীয় তিন সকালে ঘন মেঘে। ছেয়ে গেল সারা আকাশ। কিছুক্ষণ বাদেই শুরু হল তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠল। হাওয়ার দাপটে। ঝড়ের তাণ্ডবে ভেঙে পড়ল জাহাজের মাস্তুল। পাহাড়ের মতো উচু উচু ঢেউগুলো জাহাজটাকে নিয়ে যেন ছেলেখেলা করতে লাগল। অশান্ত সমুদ্রের সাথে পাল্লা দিতে দিতে এক সময় জাহাজটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। রাজা পেরিক্লিস ভাঙা জাহাজের একটা বড়ো টুকরো আঁকড়ে ধরে অসহায়ভাবে ভাসতে লাগলেন সমুদ্রে। বহুক্ষণ এভাবে কাটাবার পর সমুদ্রের অশান্ত ঢেউ তাকে এনে ফেলল কুলে। একটানা অশাস্ত সমূদ্রের সাথে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন পেরিক্লিস। কুলে আছড়ে পড়ার সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন তিনি। জ্ঞান এলে তিনি দেখলেন ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেছে। রাতের অন্ধকার দূর হয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। ঝড়ের তাণ্ডবে ভাঙা জাহাজের সাথে সাথে তার অনুচররাও যে কে কোথায় চলে গেছে তা কেউ জানে না। কিন্তু এভাবে জলের ধারে হাত-পা ছড়িয়ে কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়! তাছাড়া ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে এসেছে।
যে করেই হোক তাকে বাঁচতে হবে এই আশা নিয়ে সব ক্লাস্তি ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। পেরিক্লিস। একপাশে পাহাড় আর অন্যপাশে সমুদ্রকে রেখে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চললেন তিনি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূর্যের তেজ বাড়তে লাগল। বহুদূর হাঁটার পরও কোনও লোকালয়ের দেখা মিলল না। সূর্য যখন ঠিক মাথার উপর উঠে বসেছে, সে সময় দেখা মিলল একদল জেলের। ঝড়-বৃষ্টির পর তারা সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিল। এখন তারা ঘরে ফিরছে বড়ো বড়ো জাল আর মাছ নিয়ে। জলে ভেজা কাপড়-চোপড় পরা পেরিক্লিসকে দেখে তারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল— জানতে চাইল তার পরিচয়। পেরিক্লিস তার আসল পরিচয় ইচ্ছে করেই গোপন করলেন তাদের কাছে। তিনি তাদের বললেন যে তিনি একজন বণিক। ঝড়ের তাণ্ডবে জাহাজ ডুবির ফলে সর্বস্ব হারিয়ে তিনি এসে পড়েছেন এই অজানা দ্বীপে। তার দুঃখের কথা শুনে সমবেদনা জানাল জেলেরা। তারা তাকে সাথে নিয়ে চলল নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দেবার জন্য। যেতে যেতেই পেরিক্লিস তাদের কাছে শুনতে পেলেন এই শহরের নাম পেন্টাপােলিস — এটি গ্রিসের অন্তর্গত। এর রাজার নাম সাইমোনাইডিস। সুশাসন আর বিচক্ষণতার জন্য প্রজারা তাকে আদর করে বলে মহান সাইমোনাইডিস। তার এক মেয়ে আছে— নাম থাইসা। সে যেমন রূপসি তেমনি গুণবতী।
জেলেদের কথা-বার্তায় সূত্র থেকেই পেরিক্লিস জানতে পারলেন আগামীকাল মেয়ে থাইসার জন্মদিন উপলক্ষে বিরাট এক উৎসবের আয়োজন করেছেন রাজা সাইমোনাইডিস। দূর দূর দেশ থেকে রাজা, রাজপুত্র আর নাইটরা এসে হাজির হবেন সেই উৎসবে। তাদের মধ্যে যিনি অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শিতা দেখাতে পারবেন, রাজকন্যা নিজে পুরস্কৃত করবেন তাকে। এ কথা শুনে খুবই দুঃখ পেলেন তিনি। ভাগ্য বিপর্যয় না হলে হয়তো এ উৎসবে তিনি আমন্ত্রিত হতেন।
কিছুক্ষণ বাদে জেলেদের মধ্যে একজন তার জালের মধ্য থেকে একটা জং-ধরা লোহার বর্ম বের করে সবাইকে দেখিয়ে বলল, সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে সে সেটা পেয়েছে। বর্মটার দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠলেন পেরিক্লিস। ভালো করে সেটা নেড়ে-চেড়ে দেখে মনে মনে বললেন, আরে! এটাই তো আমার বাবার দেওয়া সেই বর্ম। বর্মটা দেবার সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন, এই বর্মটা আমি তোকে দিয়ে গেলাম! বৰ্মটা যখন তুমি পরবে তখন এও আমার মতো তোমার প্রাণ বাচাবে। বাবার অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী সব সময় এই বর্মটা পারতাম। ঝড়ের সময় এটা আমার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। দেখছি সমুদ্র এটা আমায় ফিরিয়ে দিয়েছে। যার জালে বর্মটা উঠেছে, পেরিক্লিস তার কাছে সেটা ভিক্ষে চাইলেন। তিনি জেলেকে বললেন, ভাই বর্মটা তুমি আমায় ভিক্ষে দাও। ওটা একসময় এক রাজার ছিল। ওটা পড়লে আমায় বড়ো লোকের মতো দেখাবে। তুমি আমায় রাজপ্ৰসাদের পথটা দয়া করে দেখিয়ে দাও। আমি কথা দিচ্ছি সময় সুযোগ এলে আমি অবশ্যই এর যোগ্য প্রতিদান দেব।
