তা দেখে উত্তেজিত হয়ে পেরিক্লিস বললেন, কী ব্যাপার! আমার কথা শুনতে পাননি। আপনি? বললাম সেনাপতিকে ডেকে আনুন। তা না করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আপনি কি দেখছেন?
হেলিকেন্যাস উত্তর দিলেন, মহারাজ! আমি আপনার একজন অনুগত অমাত্য। আমার কাজ রাজ্য পরিচালনার ব্যাপারে আপনাকে যথাসাধ্য সাহায্য করা। আমি লক্ষ করছি অ্যান্টিওক থেকে ফিরে আসার পর থেকে আপনি ভীষণ মানসিক অশাস্তির মাঝে দিন কাটাচ্ছেন। মনে হচ্ছে কোনও কারণে আপনি ভয় পেয়েছেন —সর্বদাই একটা আতঙ্কের মাঝে সন্ত্রস্ত হয়ে আছেন। মহারাজ! আপনি যদি বিশ্বাস করে আমায় সব কথা খুলে বলেন, তাহলে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করে দেখব কীভাবে আপনাকে এই সংকট থেকে মুক্ত করা যায়।
হেলিকেনাসের কথায় ভরসা পেয়ে অ্যান্টিওকে যে সব ঘটনা ঘটেছে তা তাকে খুলে বললেন রাজা। তিনি বললেন, অ্যান্টিওক্যাসের মধ্যে এমন একটা ধারণা জন্মেছে যে নিজের মেয়ের সাথে তার ব্যভিচারের কথাটা আমি চারদিকে রটিয়ে দেব। আমি জানি চুপচাপ বসে থাকার লোক নন। উনি। যে কোনওভাবেই হোক টায়ারে উনি আঘাত হানবেনই। বুঝলেন হেলিকেন্যাস, সে সব কথা ভেবেই ভয় পাচ্ছি। আমি। এখন আপনিই বলুন আমি কি করব।
আপনি যা ভাবছেন তা মোটেই অযৌক্তিক নয় মহারাজী, বললেন হেলিকেন্যাস, টায়ার যদি উনি আক্রমণ নাও করেন তাহলেও তিনি একবার না একবার আপনার প্রাণনাশের চেষ্টা করবেন। আমার পরামর্শ যদি চান তাহলে বলি কি আপনি কিছুদিনের জন্য এ রাজ্য ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিন। আপনি এখানে নেই জানলে আপনার উপর অ্যান্টিওক্যাসের যে রাগ জমে আছে তা স্বাভাবিকভাবেই উবে যাবে। এমনও হতে পারে আপনার অনুপস্থিতিতে তার মতো অহংকারী রাজা মারা গেলেন। যাইহোক, আপনি যোগ্য লোকের হাতে রাজ্য পরিচালনার ভার দিয়ে নিশ্চিন্তে কিছুদিনের জন্য বাইরে চলে যান। আমি কথা দিচ্ছি। দেহের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করে যাব।
পেরিক্লিস বললেন, ঠিক আছে, আপনার পরামর্শও আমি কিছুদিনের জন্য টায়ার ছেড়ে যাচ্ছি। আমার অনুপস্থিতিতে এ রাজ্য আপনিই পরিচালনা করবেন। আমি যেখানেই থাকি না। কেন, চিঠিপত্রের মাধ্যমে আপনার সাথে যোগাযোগ রাখব।
এবার হেলিকেন্যাসকে টায়ারের শাসক পদে নিযুক্ত করে রাজা পেরিক্লিস তার কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর, প্রচুর খাবার-দাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে জাহাজে চেপে পাড়ি দিলেন অজানার পথে। পরদিন নতুন দায়িত্ব নিয়ে রাজসভায় এলেন হেলিকেন্যাস। সমবেত অমাত্য এবং সভাসদদের উদ্দেশ করে তিনি বললেন, কোনও বিশেষ কারণে নিজের অজান্তে আমাদের রাজা পেরিক্লিাস অন্যায় আচরণ করে ফেলেছেন অ্যান্টিওকের রাজা অ্যান্টিওক্যাসের প্রতি। সে আচরণের জন্য রাজা নিজে খুব অনুতপ্ত। অন্যায়ের শাস্তি স্বরূপ তিনি খালাসির বেশে সমুদ্রপথে কোনও এক অজ্ঞাত স্থানে যাত্ৰা করেছেন। বন্ধুগণ! আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এ অবস্থায় রাজার জীবনের কোনও নিরাপত্তা নেই। অনুগ্রহ করে আপনারা তার অন্যায় আচরণ বা তার অনুতাপের বিষয়ে আমায় কোনও প্রশ্ন করবেন না। যাবার সময়ে তিনি তার অনুপস্থিতিতে রাজ্য শাসনের দায়িত্বভার আমার ওপর দিয়ে গেছেন। সময় অভাবে তিনি আপনাদের সবাইকে আলাদা করে এ ব্যাপারে কিছু বলে যেতে পারেননি।
এসব কথা হেলিকেন্যাস যখন তার সতীর্থ অমাত্য আর সভাসদদের বলছিলেন, সে সময় সেখানে এসে হাজির হলেন অ্যান্টিওক্যাসের প্রধানমন্ত্রী থেলিয়ার্ড—উদ্দেশ্য বিষপ্রয়োগে রাজা পেরিক্লিসকে হত্যা করা। পেরিক্রিসের চলে যাবার কথা শুনে হাফ ছেড়ে বঁচিলেন তিনি। অ্যান্টিওকে ফিরে গিয়ে রাজাকে এ কথা জানালে নিশ্চয়ই তিনি তার প্রাণ নেবেন না – ভেবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন তিনি।
সভাসদদের অভিবাদন জানিয়ে থেলিয়ার্ড বললেন, রাজা অ্যান্টিওক্যাসের দূত হিসেবে আমি এক জরুরি বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছি। রাজা পেরিক্রিসের জন্য। এসে শুনি তিনি নিরুদেশ যাত্রা করেছেন। দেশে ফিরে গিয়ে আমি রাজাকে সে কথাই বলব।
হেলিকেন্যাস বললেন, রাজার জন্য যে বিশেষ বার্তা আপনি বয়ে নিয়ে এসেছেন তা জানতে আমরা আগ্রহী নই। তবে আপনি আমাদের সম্মানীয় অতিথি। অনুগ্রহ করে আজকের দিনটা থেকে গেলে আমরা খুব খুশি হব।
তাদের কথা রাখতে শুধু সেদিনের রাতটুকুটায়ারের প্রাসাদে অতিথি হয়ে কটালেন থেলিয়ার্ড। পরদিন সকালে অ্যান্টিওকে চলে গেলেন তিনি।
একসময় টায়ারের অন্তর্ভুক্ত থার্সাস নগরী এতই সমৃদ্ধিশালী ছিল যে সেখানে কখনও খাদ্যাভাব হয়নি। দুঃখ যে কী তা সেখানকার লোকেরা কখনও অনুভব করেনি। নাগরিকদের প্রয়োজন মেটার পর থাসাঁসের উৎপাদিত ফসল পাঠিয়ে দেওয়া হত আশে-পাশের শহরে। কিন্তু সেই থার্সাসেই একদিন দেখা দিল অনাবৃষ্টি। বৃষ্টি না হওয়ায় ফসল ফলাল না খেতে, ফলে চরম খাদ্যাভাব দেখা দিল সেখানে। খাদ্য জোগাড় করতে সেখানকার লোকেরা ঘর-বাড়ি, গোরু-ঘোড়া সব কিছু বিক্রি আরম্ভ করল। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলে! শেষমেশ এমন অবস্থা দাঁড়াল থার্সাসে, যে ভিক্ষা দেবার লোকও রইল না। সেখানে। ক্ষুধার জ্বালায় অখাদ্য কৃখাদ্য খেতে শুরু করল সেখানকার লোকেরা! ফলস্বরূপ দেখা দিল মহামারী। কুকুর-বেড়ালের মতো বিনি চিকিৎসায় মরতে লাগল থাসাসের লোকেরা।
