প্রোটিয়াস! তার প্ৰেমিক! সে কিনা আসবে ডিউকের মেয়েকে গান শোনাতে? তাহলে সেই হয়েছে প্রোটিয়াসের নতুন প্রেমিক? আসলে হঠাৎ করে পুরুষের ছদ্মবেশে এতদূর আসাটা ঠিক হয়েছে কিনা, সেটাই ভাবচ্ছিল জুলিয়াকে। কিন্তু সরাই মালিকের মুখে ডিউকের মেয়ের প্রেমিকের নাম প্রোটিয়াস শুনেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল জুলিয়া। সে ঠিক করল সন্ধের পর নিজে ডিউকের বাগানে গিয়ে দেখবে প্রোটিয়াস তার নতুন প্রেমিকাকে কী গান শোনায়, কী ব্যবহার করে তার সাথে — এসব কিছুই নিজের চোখে দেখবে সে।
নয়
এক অল্পবয়সি ছোকরার ছদ্মবেশে সাহসে ভর করে জুলিয়া এসে হাজির ডিউকের প্রাসাদে। কৌশালে ডিউকের মেয়ে সিলভিয়ার সাথে দেখা করে তার সাথে ভাব জমাল। সে বলল তার নাম সেবাস্টিয়ান। গ্রাম থেকে সুদূর মিলানে সে এসেছে কাজের খোজে। সে কথায় কথায় সিলভিয়াকে জানাল যে প্রোটিয়াসের অপেক্ষায় রয়েছে তার প্রেমিকা জুলিয়া। একেই সিলভিয়া জেনেছিল যে ভ্যালেন্টাইনের নির্বাসনের মূলে রয়েছে প্রোটিয়াস, এবার তার প্রেমিকার কথা শুনে সে বেজায় রেগে গেল প্রোটিয়াসের উপর। কিছুক্ষণ বাদে ডিউকের প্রাসাদে এল প্রোটিয়াস। সিলভিয়ার ঘরের খোলা জানোলা দেখে তার মনে পড়ে গেল বন্ধু ভ্যালেন্টাইনের কথা।
নিজের মনেই বলল প্রোটিয়াস, আমি আমার পুরোনো বন্ধু ভ্যালেন্টাইনের সাথে বেইমানি করেছি। সিলভিয়াকে পাবার আশায়। ডিউক তাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন শুধু আমারই জন্য। এবার আমি চেষ্টা করছি সিলভিয়ার কাছ থেকে থোরিওকে সরিয়ে দেবার। আমি যখন সিলভিয়ার ংসা করি, তখন তা অসহ্য লাগে থুরিওর। তাই সে আমায় গালি দেয় খুচরো প্রেমের কারবারি বলে। সে এও বলে আমি নাকি জুলিয়ার প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। কিন্তু থুরিও এখনও আমায় চিনতে পারেনি। এত সব কাণ্ড ঘটে যাবার পরও সিলভিয়াকে পাবার লক্ষ্য থেকে সরে আসতে আমি রাজি নই। আমার জেদের সাথে তুলনা চলে শুধু স্প্যানিয়েল কুকুরের। এবার দেখা যাক ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়, কোথাকার জল কোথায় দাঁড়ায়?
সন্ধে হবার কিছুক্ষণ বাদে থুরিও এসে হাজির সেখানে। প্রোটিয়াসকে দেখে সে অবাক হয়ে বলল, আরো স্যার প্রোটিয়াস, আপনি তো দেখছি আগে-ভাগেই হাজির?
কেন, আগে আসতে আমার কি কোনও নিষেধ আছে স্যার থুরিও? বলল প্রোটিয়াস, ভালোবাসা জিনিসটা কি আপনার একচেটিয়া না তাতে অন্য কারও অধিকার আছে?
হেসে স্যার থুরিও বললেন, ভালোবাসা? আপনি কাকে ভালোবাসেন বলছেন, সিলভিয়াকে?
অবশ্যই আমি তাকে ভালোবাসি, উত্তর দিলে প্রোটিয়াস।
বড়োই সুসংবাদ দিলেন মশাই, বললেন থুরিও, এবার তাহলে শুরু করা যাক গান-বাজনা। আশা করি তাতে আপনার আপত্তি নেই।
স্যার থুরিওর কথা শেষ হবার সাথে সাথেই সিলভিয়ার জানালার নিচে উপস্থিত শিল্পীরা হইচই করে বাজনা বাজিয়ে নাচতে-গাইতে শুরু করে দিল। তাদের সাথে প্রোটিয়াস নিজেও গাইতে লাগল।
খোলা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সিলভিয়া বলল, কে চোঁচাচ্ছে?
এবার নতজানু হয়ে সিলভিয়াকে অভিবাদন জানিয়ে বলল প্রোটিয়াস, হে আমার প্রিয়া! শুভ সন্ধ্যা।
গলাটা যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে, বলল সিলভিয়া, কথাটা কে বলল?
এভাবে শুধু একজনই তো তার হৃদয়ের কথা ব্যক্ত করতে পারে বলল প্রোটিয়াস, শীঘ্রই তাকে চিনতে পারবে তার কথা শুনে।
ওহো স্যার প্রোটিয়াস, আপনি! ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল সিলভিয়া, তাই বলুন।
হ্যাঁ, আমিই সে প্রোটিয়াস, তোমার ভৃত্য এবং একনিষ্ঠ সেবক।
সে তো বুঝতে পারছি। অধৈর্যের সুর সিলভিয়ার গলায়, পুরোনো বন্ধুকে নির্বাসনে পাঠিয়েও আপনার সাধ মেটেনি? আর কী চান আপনি?
হে আমার প্ৰেয়সী সিলভিয়া! গদগদ স্বরে বলে ওঠে প্রোটিয়াস, আমি কী চাই তাও তোমায় বলে দিতে হবে? হৃদয়ের ভাষা শুনেও তুমি কি বুঝতে পারছি না আমি কী চাই?
থামুন মিথ্যেবাদী, বেইমান, ঠগ কোথাকার, গলা চড়িয়ে প্রোটিয়াসকে ধমকে দিল সিলভিয়া, নিজের প্রেমিককে ভুলে গিয়ে আমার জন্য গান গাইতে আপনার লজ্জা করছে না? যান, বাড়ি গিয়ে খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়ুন। শুয়ে শুয়ে প্রেমিকার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ুন। ভবিষ্যতে আর কখনও আমায় পাবার জন্য এরূপ তোষামোদ করবেন না। আর তা করলেও আপনার কোনও লাভ হবে না।
প্ৰেয়সী, তুমি ঠিকই বলেছ, গালাগালি খেয়ে একটুও দমে না গিয়ে বলল প্রোটিয়াস, আমি সত্যিই ভালোবাসতোম একটি মেয়েকে। কিন্তু অল্প কিছুদিন হল সে মারা গেছে।
মিথ্যেবাদী! বলেই জানালার আড়ালে দাঁড়ানো পুরুষবেশী জুলিয়া সামলে নিলে নিজেকে। হায়! সবার সামনে এই মূহূর্তে যদি আমার আসল পরিচয়টা প্রকাশ করতে পারতাম! বলেই সে আক্ষেপ করে নিজের মনে। গলা নামিয়ে সে সিলভিয়াকে লক্ষ্য করে বলল, লেডি সিলভিয়া! উনি মিথ্যে কথা বলছেন। সার প্রোটিয়াসের প্রেমিকা আজও জীবিত।
চেঁচিয়ে বলে উঠল সিলভিয়া, স্যার প্রোটিয়াস, আপনি মিথ্যে কথা বলছেন। আপনার প্রেমিকা যে আজও জীবিত তা আমার অজানা নেই। আর সেই ভ্যালেন্টাইনের বাগদত্ত আমি, তাকে দেশ ছাড়া হতে হয়েছে আপনারই জন্য। ভ্যালেন্টাইনকে আমি কথা দিয়েছিলাম যে বিয়ে করব। সেই ভ্যালেন্টাইন। কিন্তু আজও জীবিত; তাই এ অবস্থায় যে প্ৰেম আপনি আমায় নিবেদন করছেন তা শুধু অন্যায় নয়, অবৈধও বটে।
