চিঠিখানা পড়ে বেজায় রেগে গেলেন ডিউক। গালাগালি দিতে লাগলেন ভ্যালেন্টাইনকে, নচ্ছার! বেইমান! আমার কাছ থেকে এত উপকার এবং অনুগ্রহ পাবার পর শেষে কিনা এই প্রতিদান? এই মুহুর্তে আমি বিতাড়িত করছি আপনাকে আর সেই সাথে নির্বাসন দণ্ডও দিলাম। ভালো করে মন দিয়ে শুনুন ভ্যালেন্টাইন, এই মুহূর্তে মিলান ছেড়ে যেখানে খুশি আপনি চলে যাবেন। কাল সকলে এই শহরে আপনাকে দেখা গেলে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হবেন আপনি।
ডিউকের দেওয়া নির্বাসন দণ্ড মাথায় নিয়ে ভ্যালেন্টাইন বাধ্য হলেন সে-রাতে মিলান ছেড়ে চলে যেতে। যাবার পূর্বে সিলভিয়ার সাথে দেখা করার সুযোগটুকুও পেলেন না তিনি।
সাত
ওদিকে প্রোটিয়াসের প্রেমিকা জুলিয়া মনখারাপ করে বসে আছে ভেরোনায়। মনখারাপ হবারই কথা, কারণ বহুদিন ধরে তার কোন ও যোগাযোগ নেই প্রোটিয়াসের সাথে। প্রোটিয়াস কথা দিয়েছিল যে মিলানে গিয়ে নিয়মিত চিঠি-পত্র দেবে তাকে। অথচ আজ পর্যন্ত সে একটিও চিঠি লেখেনি। এ সব দুঃখের কথা পরিচারিকা লুসেট্টার কাছে বলে মনকে হালকা করছে জুলিয়া। লুসেট্টার বহু সাস্তুনা সত্ত্বেও মনের ক্ষোভ বেড়ে গেল জুলিয়ার। সে বলল লুসেট্টাকে, যতই তুই আমায় বােঝাবার চেষ্টা করিস না কেন, আমি কিন্তু ভুলছি না ত্রে ও সব ছেদাে কথায়। আমি তোকে বলে রাখছি, এত দূরে বসে তার পথ চেয়ে দিন গোনা আর আমার পোষাবে না। যেভাবেই হোক, এবার আমায় প্রোটিয়াসের কাছে মিলানে যেতে হবে। এটাই আমার শেষ কথা। যদি পরিস তো মাথা খাটিয়ে বের করা কীভাবে সেখানে যাওয়া যায়।
আমি বেশ বুঝতে পারছি তোমার মানসিক অবস্থা, কিন্তু ভেবেছ কি, সেখানে কী করে যাবে? বলল লুসেট্টা।
জুলিয়া বলল, ভেবে দেখলাম মেয়েমানুষ নয়, পুরুষের বেশে গেলে কারও কুনজর আমার উপর পড়বে না। এমনভাবে তুই আমায় সাজিয়ে দেয়াতে সবাই ভাবে আমি কোনও ধনী লোকের বাড়ির চাকর, খুঁজতে বেরিয়েছি নিজের মনিবকে।
কিন্তু ছেলে সাজতে হলে তো মাথার সব চুল আগে কেটে ফেলতে হবে, বলল লুসেট্টা। না, আমি চুল কাটব না, বলল জুলিয়া, এমনভাবে তুই আমার লম্বা চুলগুলি বেঁধে দিবি যাতে সবাই মনে ভাবে পুরুষ হয়েও আমি মেয়েদের মতো চুল রেখেছি।
লুসেট্টা বলল, বেশ, তাই দেব। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তোমার মনস্কামনা পূৰ্ণ হোক।
তাহলে আর দেরি না করে সাজিয়ে দে আমায়, বলল জুলিয়া, যাবার পূর্বে আমি আমার জিনিসপত্র, বিষয়-সম্পত্তি সবকিছু দেখাশোনার সব কিছু দায়িত্ব দিলাম তোকে। এখানকার খবরাখবর জানিয়ে মাঝে মাঝে তুই আমায় চিঠি দিস।
মিলান শহরের সীমান্তের কাছেই ম্যান্টুয়া। কোথায় যাবে ভেবে না পেয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ম্যান্টুয়ায় ঢুকে পড়ে নির্বাসিত ভ্যালেন্টাইন। ঢোকার সাথে সাথেই তাকে ঘিরে ধরে একদল ডাকত। তারা বলল, যদি প্ৰাণে বাঁচতে চাস, তাহলে সাথে যে টাকাকড়ি আছে তা ভালোয় ভালোয় দিয়ে দে।
অসহায়ভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল ভ্যালেন্টাইন, আমার নির্বাসন দণ্ড দিয়েছিলেন মিলানের ডিউক। কোনও টাকা-কড়ি নেই আমার কাছে।
ডাকাতদের একজন জানতে চাইল, তুমি কি ভেবেছ কোথায় যাবে?
ভাবছি ভেরোনায় যাব, উত্তর দিল ভ্যালেন্টাইন।
আর একজন ডাকাত জানতে চাইল, মিলানে তুমি কতদিন ছিলে?
মনে মনে হিসাব করে ভ্যালেন্টাইন বলল, তা কমদিন নয়, পুরো যোলো মাস। হয়তো আরও কিছুদিন থাকতাম, যদি কপাল খারাপ না হত।
প্রথম ডাকাত জানতে চাইল, তুমি কী এমন করেছিলে যার জন্য ডিউক তোমায় নির্বাসনে পাঠাল?
আমি একজনকে খুন করেছিলাম, ইচ্ছে করেই মিথ্যে কথাটা বলল ভ্যালেন্টাইন, মারপিট করতে করতে এমন বেধড়ক মারা তাকে দিয়েছি যে সে মরেই গেল। নির্বাসনের জন্য আমার কোনও দুঃখ নেই। কিন্তু মৃত লোকটার মুখ যখন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখনই যেন মুষড়ে পড়ে আমার মনটা। বারবার মনে হয় কাজটা ঠিক হয়নি। আমি মহাপাপ করেছি। ওকে খুন করে!
যা ঘটে গেছে তার জন্য মিছামিছিমিন খারাপ কোরো না, বলল ডাকাতদের একজন, যদিও আমরা ডাকাত কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের অনেকেই ভদ্রঘরের ছেলে। আমিও ভেরোনা থেকে নির্বাসিত হয়েছি। ভদ্রঘরের এক যুবতির টাকা-পয়সা চুরির দায়ে।
আর এক ডাকাত বলল, আর আমিও ম্যান্টুয়া থেকে নির্বাসিত হয়েছি মানুষ খুনের দায়ে।
তুমিও যখন অপরাধ করে মিলান থেকে নির্বাসিত হয়েছ, তখন আর তোমাকে আমাদের একজন বলে ভাবতে বাধা নেই, বলল প্রথম ডাকাত, তুমি দেখতে ভালো, চমৎকার স্বাস্ত। আর কথাবার্তাও বেশ ভালো। কোনও সন্দেহ নেই যে তুমি বেশ বুদ্ধিমান আর ঠান্ডা মাথার লোক, তুমি আজ থেকে আমাদের সাথে থাকবে। তুমিই হবে আমাদের দলের সর্দার। তুমি যা বলবে আমরা তাই মেনে নেব। আমার এ প্রস্তাবে রাজি হলে ভালো, নইলে এক্ষুনি মেরে ফেলব তোমায়।
তোমার প্রস্তাবে আমি রাজি আছি তবে একটা শর্ত আছে আমার, বলল ভ্যালেন্টাইন, যদি তোমরা কথা দাও যে আমার শর্ত মেনে চলবে, তাহলে আমার আপত্তি নেই তোমাদের সর্দার হতো।।
ডাকাতরা জানতে চাইল, কী শর্ত?
সরল অসহায় গরিব লোক আর মেয়েদের উপর কোনও অত্যাচার করা চলবে না। টাকাকড়ি কেড়ে নেবার জন্য তাদের উপর কোনও অত্যাচার করতে পারবে না। এই আমার শর্ত বলল ভ্যালেন্টাইন।
