আরে, ভ্যালেন্টাইন মনে হচ্ছে, জোর গলায় ডাকলেন ডিউক, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে একগাদা জরুরি কাজ যেন এখনই সেরে ফেলতে হবে। আপনি একবার। এদিকে আসন, জরুরি কথা আছে।
ডিউকের গলার আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল ভালেন্টাইন। পায়ে পায়ে ডিউকের কাছে এসে বলল, আপনি সঠিক অনুমান করেছেন মহামান্য ডিউক। সত্যিই আমার একটা জরুরি কাজ রয়েছে। সেটা সেরেই আমি এখুনি আসছি।
জরুরি কাজ! সেটা কী জানতে পারি? বললেন ডিউক।
আমতা আমতা করে ভ্যালেন্টাইন বলল, আজ্ঞে বন্ধুদের জন্য কয়েকটি চিঠি লিখেছি। প্রাসাদের বাইরে আমার একজন চেনা লোক অপেক্ষা করছে সেগুলি নেবার জন্য।
ও সব পরে হবে, ভ্যালেন্টাইনের দিকে চেয়ে বললেন ডিউক, এমন দিয়ে আমার কথাটা শুনুন। আমি খুবই সমস্যার মধ্যে আছি একটা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে। আমি জানি যে আপনি খুবই বুদ্ধিমান। তাই এ ব্যাপারে সবকিছু আপনাকে খোলাখুলি বলছি। এ বিশ্বাস আমার আছে যে বুদ্ধি বাতলিয়ে আপনি আমায় সাহায্য করতে পারবেন।
ডিউকের কথায় গলে গিয়ে ভ্যালেস্টাইন বলল, আপনি বলুন, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব আপনাকে সাহায্য করার।
ডিউক বললেন, আপনি হয়তো শুনেছেন স্যার থুরিওর সাথে আমার মেয়ে সিলভিয়ার বিয়ের কথা আমি বহুদিন আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, সিলভিয়া কেমন যেন অবাধ্য হয়ে পড়ছে। আমার মনোনীত পাত্র তার মোটেই পছন্দ নয়। তাই আমি স্থির করেছি বুড়ে বয়সে আবার বিয়ে করব। সিলভিয়া যদি তার পছন্দমতো কাউকে বিয়ে করে, তাহলে সে বিয়েতে আমি কোনও যৌতুক দেব না। আর আমার মৃত্যুর পর আমার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির কানা-কড়িও সিলভিয়া পাবে না।
ভ্যালেন্টাইন ক্ৰমেই অধৈর্য হয়ে উঠছে ডিউকের কথা শুনতে শুনতে। মনে মনে ভাবছে সে, এই বুড়োটা আর কতক্ষণ তাকে এভাবে আটকে রাখবে। কিন্তু মনের ভাব বাইরে প্রকাশ করা চলে না। তাই সে ঘুরিয়ে বলল, মহামান্য ডিউক, আপনার সব কথাই তো শুনলাম। এবার বলুন কীভাবে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।
মন দিয়ে আগে আমার সব কথা শুনুন ভ্যালেন্টাইন-~~~ তাকে বিশ্বাস করে যেন গোপনীয় কথা বলছেন এভাবে চারদিকে দেখে গলা নামিয়ে বললেন ডিউক, একটি যুবতি মেয়েকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। মেয়েটি দেখতে সুন্দর, তার স্বভাবও খুব নম্র এবং শান্ত। আমি চাই যে মেয়েটি আমায় প্রেম নিবেদন করুক, অথচ গোল বেধেছে। সেখানেই। আপনারা সবাই এ যুগের তরুণতরুণী। প্রেম নিবেদনের পুরোনো রীতি এখন বাতিল। কী ভাবে তাকে প্রেম নিবেদন করা যায় তা আমি আপনার কাছ থেকে শিখতে চাই। এখন আপনি বলুন। এ ব্যাপারে কী ভাবে আমায় সাহায্য করতে পাবেন।
ভ্যালেন্টাইন বললেন, এ কালের যুবকেরা মাঝে মাঝে তাদের প্রেমিকদের সাথে দেখা করে, নানারূপ শৌখিন জিনিস উপহার দেয়। তাদের। প্ৰেমপত্র লিখে গোপনে তা পাঠিয়ে দেয়। কারও হাত দিয়ে। নামি রেস্তোরায় নিয়ে গিয়ে ভালো ভালো খাবার খাওয়ায়। তারা এ ভাবেই জয় করে প্রেমিকদের মন।
যে মেয়েটিকে আমি পছন্দ কয়েছি বললেন ডিউক, একটি শৌখিন উপহারও আমি তাকে পাঠিয়েছিলাম। সেটা সে গ্রহণ করেনি, ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। মেয়েটির উপর তার বাবা-মার কড়া নজর। তা এড়িয়ে দিনের বেলা কেউ তার কাছে যেতে পারে না, আর মেয়েটিও পারে না বাড়ি থেকে বের হতে। এখন বলুন, কীভাবে তার সাথে দেখা হবে?
ভ্যালেন্টাইন বলল, দিনের বেলা দেখা না হলে রাতে তার সাথে দেখা করবেন।
আপনি বলছেন রাতের বেলা তার সাথে দেখা করতে, ভুরু কুঁচকে বললেন ডিউক, কিন্তু রাতের বেলা তো তার বাড়ির দরজা বন্ধ থাকে। তাহলে কীভাবে তার দেখা পাব?
দরজা যদি বন্ধই থাকে, তাহলে কি আর বাড়ির ভেতর ঢোকা যায় না? পরিণতির কথা না ভেবেই মুখ ফসকে বলে ওঠে ভ্যালেন্টাইন।
কিন্তু কীভাবে ঢোকা যাবে? জানতে চাইলেন ডিউক।
কেন! দড়ির তৈরি সিঁড়ি বেয়ে, জবাব দিল ভ্যালেন্টাইন, আপনি চাইলে ওরূপ একটা সিঁড়ি আমিই এনে দেব আপনাকে। আমার মতো। আপনিও একটা আলখাল্লা পরবেন। সিঁড়িটা ভাঁজ করে আলখাল্লার ভেতর গুজে নেবেন। তাহলেই আর কেউ টের পাবে না বাইরে থেকে। তারপর আপনি সহজেই আটকে দেবেন। সেই সিঁড়িটা প্রাসাদের কোনও খোলা জানালায়। আর ওই সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে ঢুকে যাবেন বাড়ির ভেতরে। তবে তার আগে আপনাকে জানতে হবে পছন্দের মেয়েটি কোন ঘরে থাকে। আমার মনে হয় বাড়ির কাজের লোকদের দরাজ হাতে বিকশিশ দিলেই আগেভাগে তারা আপনাকে সেটা জানিয়ে দেবে।
ভ্যালেন্টাইনের কথা শেষ না হতেই বলে উঠলেন ডিউক, সাবাস, বেশ ভালো বুদ্ধি দিয়েছেন তো! দয়া করে এবার আর একটু উপকার করুন। আজ রাতের জন্য আপনারা ঢোলা আলখাল্লাটা ধার দিন আমায়।
ভ্যালেন্টাইন তখনও আঁচ করতে পারেনি। ডিউকের আসল মতলবটা। তাই সেইতস্তত করতে লাগল আলখাল্লাটা গা থেকে খুলে দিতে। কিন্তু ডিউকের আর তাঁর সইছে না। একরকম জোর করেই তিনি আলখাল্লাটা খুলে নিলেন তার গা থেকে। সেটা কেড়ে নিয়ে ভেতরে হাত ঢুকোতেই হাতে এল দড়ির সিড়ি আর ভঁাজ করা একটা কাগজ। ওগুলো বের করে ভ্যালেন্টাইনের সামনেই খুলে ফেললেন তিনি। দেখা গেল জিনিস দুটির মধ্যে একটি ভাজ করা দড়ির সিঁড়ি, অপরটি তার মেয়ে সিলভিয়াকে লেখা একটি চিঠি। সে চিঠির নীচে সই রয়েছে ভ্যালেন্টাইনের। চিঠিটা খুঁটিয়ে পড়লেন ডিউক। দেখলেন তাতে লেখা রয়েছে কীভাবে ভ্যালেন্টাইন সিলভিয়াকে নিয়ে মিলান থেকে পালিয়ে যাবে তার বিস্তারিত পরিকল্পনা।
