অ্যান্টোনিও বললেন, তোমার বন্ধু যে একজন গুণী লোক তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তুমি শুনে খুশি হবে যে তোমার বন্ধুর মত-ই আমার মত। জীবনের অনেকগুলো দিনই তুমি নিষ্কর্ম হয়ে কাটালে। এবার গা ঝাড়া দিয়ে ওঠা। আমার ইচ্ছে ভ্যালেন্টাইনের মতো তুমিও কিছুদিন মিলানে সম্রাটের দরবারে থােক। টাকা-পয়সার জন্য ভেব না। যতদিন পর্যন্ত তোমার পাকাপাকি ব্যবস্থা না হয়, আমি তোমার থাকা-খাওয়ার খরচের টাকা পাঠিয়ে দেব। তোমায় আগামীকালই রওনা হতে হবে মিলানের উদ্দেশে। হাতে মোটেও সময় নেই। তাই আর দেরি না করে চটপট তৈরি হয়ে নাও।
বাবার কথা শুনে মুখ শুকিয়ে গেল প্রোটিয়াসের। কোনোমতে সে বলল, আগামী কালই আমায় যেতে হবে? কিন্তু কী করে তা সম্ভব? তৈরি হতেও তো কমপক্ষে দুটো দিন সময়ের দরকার।
প্রোটিয়াসকে বাধা দিয়ে বললেন অ্যান্টোনিও, শুধু দুটো কেন, তৈরি হবার জন্য একদিনেরও প্রয়োজন নেই তোমার। আগে তুমি রওনা দেও, তারপর প্রয়োজনীয় সবকিছু পাঠিয়ে দেব তোমায়, এখানে একটি দিনও আর থাকার প্রয়োজন নেই; ওরে প্যানথিনো, ছোটো কত্তার জিনিসপত্র তুই সব গুছিয়ে দে, বলতে বলতে চারককে সাথে নিয়ে অ্যান্টোনিও বেরিয়ে এলেন ছেলের ঘর থেকে।
আক্ষেপ করতে করতে নিজ মনে বলতে লাগিল প্রোটিয়াস, হায় রে! এবার আমার কী হবে? আগুন থেকে বাঁচতে বাপ দিলাম। সাগরে; কিন্তু কপাল মন্দ। শেষে ডুবে মরতে হল। সেই সাগরে। বাবা রেগে যাবেন জুলিয়ার চিঠি দেখলে। তাই চেষ্টা করলাম সেটাকে বন্ধুর চিঠি বলে চালাতে। কিন্তু উলটো ফল হল তাতে। জোর করে বাবা আমায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন সেই বন্ধুর কাছে। ফলস্বরূপ আমায় দূরে চলে যেতে হচ্ছে জুলিয়ার কাছ থেকে। আচমকাই আমার প্রেম ঢাকা পড়ে গেল মেঘের ছায়ায়।
প্রোটিয়াস জানত যে বাবার সিদ্ধান্তের নড়াচড় হবে না। তাই জুলিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিতে সে দেখা করল তার সাথে। তারা উভয়ে হাতে হাত রেখে প্ৰতিজ্ঞা করল, যতদিন পর্যন্ত তারা বেঁচে থাকবে, উভয়ে উভয়কে ভালোবাসবে, একে অন্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে। এরপর আংটি বদল হল দুজনের। বিচ্ছেদের মুহূর্তে তারা শপথ নিল যে হাতের আংটি কখনও খুলবে না।
চার
বন্ধুর সম্পর্কে যা খুশি মুখে এল বলে কোনও মতে সেদিনের মতো পরিস্থিতি সামলে দিল প্রোটিয়াস, বাস্তবে কিন্তু সত্যি হয়ে দাঁড়াল তারা সে কথাটাই। দিন যাবার সাথে সাথে মিলানের ডিউকের সুনজরে পড়তে লাগল। তার বন্ধু ভ্যালেন্টাইন। এর পাশাপাশি এমন একটা ব্যাপার ঘটল যা ভাবাই যায় না। — প্রেমে পড়ল ভ্যালেন্টাইন। তার প্রেমিকা যে সে কেউ নয়, খোদ ডিউকের সুন্দরী মেয়ে সিলভিয়া, যে ভ্যালেন্টাইন ভেরোনা থাকাকালীন প্রেম থেকে সর্বদা দূরে থাকত, সেই কিনা মিলানে এসে প্রেমে পড়ে গেল ডিউকের মেয়েকে দেখে। এদিকে সিলভিয়ারও ভালো লেগে গেল স্বাস্থ্যবান সুন্দর তরুণ ভ্যালেন্টাইনকে দেখে। বলাই বাহুল্য, সুন্দরী সিলভিয়ার ডাকে সেদিন সাড়া দিয়েছিল ভ্যালেন্টাইন। এরপর থেকে সবার নজর এড়িয়ে প্রেম করতে লাগল দুজনে। সবসময় নজর রাখতে লাগল সিলভিয়া যাতে ডিউক এ ব্যাপারে কিছু টের না পান। এর একটাই কারণ — ডিউক খুবই ভালোবাসতেন ভ্যালেন্টাইনকে আর প্রায় প্রতিদিনই তাকে প্রাসাদে নিয়ে এসে তার সাথে ডিনার খেতেন। কিন্তু একমাত্র মেয়ে সিলভিয়ার বিয়ে তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন তার এক তরুণ সভাসদ ঘুরিওর সাথে। ডিউকের সভাসদ হলেও এই থুরিও ছিল মাথামোটা লোক, খুব কমই ছিল তার বুদ্ধিাশুদ্ধি। এ কারণে বাপের পছন্দসই ভাবী পত্রিকে মোটেই পছন্দ করত না সিলভিয়া। থুরিওর সাথে দেখা হলেই সে তার প্রতি অবজ্ঞার ভােব প্রকাশ করত নানা ভাবে।
এরই মধ্যে একদিন প্রোটিয়াস এসে হাজির মিলানে। তার সাথে ডিউকের পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে প্রোটিয়াসের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে এমন সব প্রশস্তি গাইলেন ভ্যালেন্টাইন যা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন ডিউক। তিনি তাকে আমন্ত্রণ করলেন সভায় যাবার জন্য। এরপর ডিউক একদিন ভ্যালেন্টাইন এবং প্রোটিয়াস—উভয়কেই তার প্রাসাদে ডিনারের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন।
একদিন বন্ধুর সাথে ডিউকের প্রাসাদে এল প্রোটিয়াস। ডিউকের মেয়ে সিলভিয়ার সাথে সেখানে তার পরিচয় করিয়ে দিলে ভ্যালেন্টাইন। এরই মাঝে একসময় প্রোটিয়াসকে একপাশে সরিয়ে এনে জানতে চাইল তার প্রেমিকা জুলিয়া কেমন আছে। সেই সাথে অকুণ্ঠে স্বীকারও করল। ভ্যালেন্টাইন এযাবত সে যা এড়িয়ে গেছে, সেই প্রেমই তাকে গ্ৰাস করেছে মিলানে আসার পর। সে উপলব্ধি করতে পেরেছে প্রেমের শক্তি কত ব্যাপক। ভ্যালেন্টাইন যে সিলভিয়ার প্রেমে পড়েছে তা মুখ ফুটে স্বীকার না করলেও প্রোমের প্রতি তার এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেখে তা বুঝতে অসুবিধা হল না প্রোটিয়াসের। কিন্তু সিলভিয়ার সাথে পরিচয় হবার পর সম্পূৰ্ণ পালটে গেছে তার মন। মন থেকে জুলিয়াকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় সিলভিয়াকে পেতে উদগ্রাব প্রোটিয়াস। আর প্রোটিয়াস ও এ ব্যাপারে সচেতন যে এ নিয়ে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হবে বন্ধু ভ্যালেন্টাইনের সাথে।
কথায় কথায় পরদিন সিলভিয়ার সাথে তার প্রেমের কথা প্রোটিয়াসকে খুলে বলল ভ্যালেন্টাইন। সে এও বলল যে ডিউক তার মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছেন স্যার থুরিও নামে এক সভাসদের সাথে, কিন্তু সিলভিয়ার মোটেই পছন্দ নয় স্যার থুরিওকে।
