প্রোটিয়াসের বাবা অ্যান্টোনিও ধমকে উঠলেন তার বাড়ির পরিচারককে–অ্যাই ব্যাটা প্যানথিনো! তখন থেকে তোকে ডাকতে ডাকতে আমার গলা শুকিয়ে গেছে। এতক্ষণ কোথায় ছিলি?
প্যানথিনো জবাব দিল, আর্জের মঠে, আপনার ভাইয়ের কাছে।
দাবড়ে উঠলেন অ্যান্টোনিও, কেন রে হতচ্ছাড়া? এতক্ষণ কোন ঠাকুরের সেবা করছিলি মঠে বসে? নাকি আমার ভাই আটকে রেখেছিল তোকে?
না হুজুর, জবাব দেয় প্যনিথিনো, আসলে হয়েছে কি উনি তার ভাইপো অর্থাৎ আপনার ছেলের কথা খুবই চিন্তা করেন কি না, তাই সে নিয়েই কথা বলছিলেন আমার সাথে।
ভাই কী কথা বলছিল আমার ছেলের ব্যাপারে, জানতে চাইলেন অ্যান্টোনিও।
উনি বলছিলেন যে যৌবনে পা দেবার সাথে সাথে সাধারণ লোকেরা তাদের ছেলেদের বাড়ির বাইরে ছেড়ে দেয় মানুষ হবার জন্য, বলতে থাকে প্যানথিনো, সেই ছেলেদের মধ্যে কেউ যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিতে, কেউ যায় জাহাজে চেপে নতুন দ্বীপ আবিষ্কার করতে, আর কেউবা সেনাদলে নাম লিখিয়ে যুদ্ধে যায় সৌভাগ্যের সন্ধানে। আপনার ভাই বলছিলেন যে প্রোটিয়াসেরও সেরাপ করা উচিত ছিল। উনি আরও বলছিলেন যে প্রোটিয়াস এখন যৌবনে পা দিয়েছে। এবার যদি সে দেশ-বিদেশে না যেতে পারে, তাহলে সে পৃথিবীর কিছুই দেখতে পাবে না। পৃথিবীতে নানা ধরনের মানুষ রয়েছে। তাদের স্বভাব কেমন, সেও তার জানা হবে না। উনি আপনাকে জানাতে বলেছেন যেন প্রোটিয়াসকে আর আপনি বাড়ির মধ্যে আটকে না রাখেন।
এ সব কথা যদি আমার ভাই বলে থাকে, তাহলে সে খাটি কথাই বলেছে, সায় দিয়ে বললেন অ্যান্টোনিও, পরিশ্রম করলেই অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায় বলে আমার বিশ্বাস। তা প্যানটিনো, আমার ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তুই যখন ভাইয়ের সাথে এত আলোচনা করিস, এত ভাবিস তার জন্য, তাহলে তুই বল কোথায় পাঠানো যায় তাকে?
এ নিয়ে আর এত ভাবন কী, বলল প্যানথিনো, আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন যে উন্নতিলাভের আশায় প্রোটিয়াসের বন্ধু ভ্যালেন্টাইন মিলানের রাজসভায় গেছে।
হাঁ, আমি তা শুনেছি, বললেন অ্যান্টোনিও।
কত্তা! আমার মতে প্রোটিয়াসকে সেখানে পাঠিয়ে দিলেই ভালো হয়, বলল অ্যান্টোনিও, দেশ-বিদেশের প্রচুর লোক রোজ আসে সম্রাটের রাজসভায়। অনেক কিছু সে জানতে-শিখতে পারবে। যদি সে তাদের সাথে মেলামেশা করে। তারপর বারোমাস রাজসভায় লেগেই আছে তির ছােড়া, বন্দুকবাজি, তলোয়ার লড়াই প্রভৃতি অস্ত্র প্রতিযোগিতা। সে সব প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে প্রোটিয়াস যদি তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে, তাহলে সম্রাটের নজরে পড়ার সম্ভাবনা আছে।
ঠিকই বলেছ। তুমি প্যানথিনো, সায় দিয়ে বললেন অ্যান্টোনিও, আমিও চেষ্টা করছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রোটিয়াসকে মিলানের সম্রাটের রাজসভায় পাঠাবার।
আমি বলছি কি কত্তা, খামোখা দেরি না করে কালই রওনা করে দিন ছোটো কত্তা প্রোটিয়াসকো, বলল প্যানথিনো।
কিন্তু কাল কেন? জানতে চাইলেন অ্যান্টোনিও।
ডন অ্যালফানসোকে নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে কত্তা? বলল পানিথিনো, আগামীকাল কয়েকজন ভদ্রলোকের সাথে উনি চাকরির খোজে রওনা দিচ্ছেন মিলানে সম্রাটের দরবারে। আমি বলছি কি প্রোটিয়াসকেও আপনি কাল তাদের সাথে জাহাজে তুলে দিন।
সে তো খুবই ভালো কথা, বললেন অ্যান্টোনিও, আগামী কালই ডন অ্যালফানসো ও তার সাখীদের সাথে প্রোটিয়াসও রওনা দেবে মিলানের পথে। তাহলে আর দেরি নয়। প্যানথিখনো; ওর জামা-কাপড় আর প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্রগুলি তুই এবেলাই গুছিয়ে বাক্সে ভরে ফ্যাল!
প্রোটিয়াস কিন্তু তখনও জানে না যে বাড়ির পুরোনো চাকরের পরামর্শ মতো তার বাবা একরকম নির্বাসন দণ্ডের মতো তাকে মিলানে পাঠাবার ব্যবস্থা করেছেন। কিছুক্ষণ আগে জুলিয়ার প্রেমপত্র পেয়ে সে খুশিতে ডানা মেলে উড়ছে কল্পনার আকাশে। বারবার ঘরিয়ে ফিরিয়ে চিঠিখানা দেখছে সে। শুরু থেকে চিঠিটা পড়ছিল প্রোটিয়াস। মাঝে মাঝে ন্যাকের কাছে নিয়ে শুকছিল তার গন্ধ; ঠিক সে সময় তাকে খজতে সেখানে এলেন তার বাবা অ্যান্টোনিও!
মন দিয়ে ছেলেকে চিঠি পড়তে দেখে অ্যান্টোনিও জিজ্ঞেস করলেন, ওটা করে চিঠি? কে লিখেছে?
কিছু না ভেবেই বলে বসিল প্রোটিয়াস, মিলান থেকে আমার এক বন্ধু ভ্যালেন্টাইন লিখেছে চিঠিটা। চিঠিটা নিয়ে এসেছে তারই এক বন্ধু।
চিঠিটা দাও তো, বলেই হাত বাড়ালেন অ্যান্টোনিও, পড়ে দেখি মিলানের কী খবর লিখেছে তোমার বন্ধু।
এই রে সেরেছে। নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে উঠল প্রোটিয়াস, জুলিয়ার প্রেমপত্রটা এবার ওর হাতে তুলে দিতে হবে। উনি এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন চিঠিটা পড়তে না পারলে ওর ঘুম হবে না। আজ রাতে। এখন কী করব! সাথে সাথে নিজেকে সামলে নেয় প্রোটিয়াস। জামার হাতায় চিঠিটাকে গুজে রেখে সে বলল, কি করবে তুমি আমার বন্ধুর চিঠি পড়ে? মিলানের এমন কোনও খবর এতে নেই। যা তুমি ভাবছি। ও কেমন সুখে আছে মিলানের সম্রাটের দরবারে, দরবারে সব কাজে ওর ডাক পড়ে যখন-তখন—এই কথাই লেখা আছে চিঠিতে। সেই সাথে আমারও সেখানে যেতে লিখেছে।
সে কথা লিখেছে বুঝি? বললেন অ্যান্টোনিও, তোমার বন্ধু ভ্যালেন্টাইকে তো বেশ ভালো ছেলে বলেই মনে হচ্ছে।
নিজের মনে হাসতে হাসতে প্রোটিয়াস বলল, হাঁ, ও লিখেছে যে আমিও তার মতো সৌভাগ্যবান হতে পারি, যদি আমি মিলানে সম্রাটের দরবারে যাই।
