কী যে বল দিদিমণি, বলেই মূহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নেয় লুসেট্টা, মুখ টিপে হোসে বলে, আমায় তুমি ভুল বুঝে না দিদিমণি। প্রেম সব সময় পবিত্র এবং স্বৰ্গীয়; আমার আসল বক্তব্য এই যে প্রেমে পড়ার পূর্বে ভালো করে সবকিছু ভেবে দেখা প্রয়োজন।
সায় দিয়ে জুলিয়া বলল, তা ঠিকই বলেছিস; কত পুরুষই তো আমার প্ৰেম-ভালোবাসা পেতে উদগ্রীব। তাই বলে যাকে তাকে তো আমি তা বিলিয়ে দিতে পারি না।
তা তো ঠিকই দিদিমণি, লুসেট্টা সায় দেয়।
এই এগলামুর লোকটার কথাই ধর না কেন, বলল জুলিয়া, ওর সম্পর্কে তোর ধারণা কী আর লোকটাই বা কেমন?
এগলামুর লোকটা দেখতে সুন্দর আর যোদ্ধা হিসেবে বেশ সুনামও রয়েছে, লুসেট্টা বলল, তবুও আমার অভিমত ঘর-সংসার করার জন্য এ লোককে বিয়ে করা ঠিক নয়।
অরি মার্কোশিয়? পুনরায় জানতে চাইল জুলিয়া, আমার মুখের একটু হাসির জন্য তিনি তো পাগল। তাছাড়া ওর প্রচুর টাকা-কড়িও রয়েছে। সেসব খবর রাখিস তুই?
টাকার কুমির হলেও লোকটা যেন কেমন, বলল লুসেট্টা, ওর হাব-ভাব, কথা-বার্তা, চলাফেরা, সবই যেন কৃত্রিম মনে হয়। নিজস্ব বলতে যেন ওর কিছু নেই। ছোটো মুখে কথাটা হয়তো বড়োই শোনাবে দিদিমণি, তবুও যখন তুললে তখন বলেই ফেলি, আমার মতে মানুষের মতো মানুষ একজনই রয়েছেন, তিনি হলেন প্রোটিয়াস।
তুই আর কাউকে পেলি না! এত লোকের মধ্যে শেষে কিনা প্রোটিয়াস? – লুসেট্টার মুখে ও নামটা শুনে অবাক হবার ভান করে বলল জুলিয়া, আমার তো ভুলেও ওর কথা মনে হয় না। তাছাড়া ওর মধ্যে এমন কী দেখেছিস যার জন্য তুই ওর হয়ে ওকালতি করছিস?
এজন্যই বলছি দিদিমণি যে তার সমস্ত মনপ্রাণ তিনি আপনাকেই সঁপে দিয়েছেন–একমাত্র আপনিই রয়েছেন তার মনের মণিকোঠায়, সেখানে আর কারও স্থান নেই, বলল লুসেট্টা।
জুলিয়া বলল, প্রোটিয়াস তো খুবই কম কথার লোক আর যিনি কম কথা বলেন তার প্রেমও তো ক্ষণস্থায়ী হবে।
তুমি ভুল করছ দিদিমণি, জুলিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল লুসেট্টা, যিনি কম কথা বলেন তীর হৃদয় প্রেমে ভরপুর। এরপ মানুষকে পাওয়া তো খুবই ভাগ্যের কথা। বলেই জামার ভেতর থেকে মুখবন্ধ খামটা বের করে জুলিয়ার হাতে দিয়ে বলল লুসেট্টা, মন দিয়ে ভেতরের লেখাটা পড়ুন তাহলে বুঝতে পারবেন আমার কথাটা কতদূর সত্যি।
খামের উপর চোখ বুলিয়ে জুলিয়া বলল, এ তো দেখছি চিঠি, খামের উপর আমার নাম লেখা। লুসেট্টা! এ চিঠি কে দিয়েছে?
চেগা-শোনা:; কিছুক্ষণ আগে সেই এ চিঠিটা দিয়েছে আমায়। মনে হচ্ছে আপনাকে দেবার জন্য চিঠিটা প্রোটিয়াসই দিয়েছেন স্পিডকে।
জুলিয়ার স্বভাবটাই আসলে অদ্ভুত। বহু আগেই প্রোটিয়াসের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কিন্তু সে তা গোপন রাখতে চায় সবার কাছ থেকে। এর কারণ ভয় বা চাপ নয়। পরিচিতদের কাছে সে দেখাতে চায় প্রোটিয়াসের সম্পর্কে তার কোনও আগ্রহ নেই। সে জন্য লুসেট্টার হাত থেকে প্রোটিয়াসের লেখা চিঠিখান কেড়ে নিয়েই তাকে ধমকে উঠল জুলিয়া, প্রোটিয়াসের লেখা চিঠিটা কেন এনেছিস তুই! যা, এই মুহুর্তে এটা নিয়ে আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যা। বলেই মুখবন্ধ খামটি ফিরিয়ে দিল তাকে। খামোটা নিয়ে লুসেট্টা ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ বাদেই জুলিয়ার ইচ্ছে হল প্রোটিয়াস তাকে কী লিখেছে তা জানতে। সাথে সাথেই সে চেঁচিয়ে ডাকল লুসেট্টাকে।
জুলিয়ার স্বভাব-চরিত্র ভালোভাবেই জানত লুসেট্টা। ঠিক এই ডাকেরই অপেক্ষায় ছিল সে। সাথে সাথেই সে পড়িমড়ি করে হাজির হল। যেন কিছুই হয়নি এরূপ ভাবে বলল জুলিয়া, দেখে আয়তো ঘড়িতে কটা বাজে আর জেনে আয় ডিনারের সময় হয়েছে কিনা।
দিদিমণি! ডিনারের সময় হয়ে গেছে, বলেই প্রোটিয়াসের চিঠিটা আবার বের করে জুলিয়ার হাতে দিয়ে লুসেট্টা বলল, আসলে এটার জন্যই তুমি আমায় ডেকেছি। নাও, এবার ভালো করে পড়ে ফেল।
জুলিয়া ভীষণ রেগে গেল লুসেট্টার কথা শুনে। কোনও চিন্তা-ভাবনা না করেই সে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে প্রোটিয়াসের চিঠিটা ফেলে দিল মেঝের উপর। মনে মনে লুসেট্টা খুব ব্যথা পেল জুলিয়ার কাণ্ড দেখে। চিঠির টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিতে যখন সে উবু হয়ে মেঝেতে বসতে যাবে, ঠিক তখনই চেঁচিয়ে উঠল জুলিয়া, খবরদার বলছি, ভালো চাস তো ওগুলো মোটেও ছবি না। চলে যা এখান থেকে। এখন আমার কোনও দরকার নেই তোকে।
ঘর থেকে লুসেট্টা চলে যাবার পর মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা চিঠির টুকরোগুলির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জুলিয়া। কেন যে সে এমন হঠকারিতা করল তা ভেবে নিজেরই ওপর ক্ষুব্ধ হল সে। মাথা গরম করে এভাবে চিঠিটা ছিড়ে ফেলার জন্য সে আক্ষেপ করতে লাগল।
অনেকক্ষণ হল ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে লুসেট্টী। ধারে কাছে কেউ নেই দেখে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসলজুলিয়া। চিঠিতে প্রোটিয়াস তাকে কী লিখেছিল তা জানার জন্য সে চিঠির টুকরোগুলিকে কুড়িয়ে নিয়ে পরপর সাজিয়ে রাখার চেষ্টা করতে লাগল। হঠাৎ জুলিয়ার নজরে পড়ল একটুকরো কাগজে লেখা রয়েছে প্রেমের তিরবিদ্ধ প্রোটিয়াস। অন্যান্য কতকগুলি ছেড়া টুকরো লেখা রয়েছে মিষ্টি মিষ্টি অনেক প্রেমের বাণী। না জানি গোটা চিঠিটাতে আরও কত মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের কথা লেখা ছিল। অযথা মাথা গরম করে চিঠিটা ছিড়ে ফেলার দরুন সেসব কিছুই সে পড়তে পেল না। নিজের আচরণে খুবই অনুতপ্ত হল জুলিয়া। সে ঠিক করল নিজের কাছে রেখে দেবে চিঠির সেই ছেড়াটুকরোগুলিকে। নিয়ম করে দু-বেলা চুমু খাবে সেগুলির গায়। আমার অন্যায়ের প্ৰায়শ্চিত্ত কি তাতেও হবে না? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে জুলিয়া।
