সত্যি সত্যিই বড়ো অ্যান্টিফোলাসকে তখন দেখে মনে হচ্ছিল সে পাগল হয়ে গেছে। তার মাথার চুল উশকোখুশকো, হাতে খোলা তলোয়ার আর দু-চোখে পাগলের মতো হিংস্ৰ চাহনি আর তাকে তাড়া করে চলেছে শত শত লোক। আসলে তখন চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে অ্যান্টিফোলাস পাগল হয়ে গেছে। তাই তাকে ধরার জন্য পেছনে লোক ছুটেছে। আড্রিয়ানা দেখতে পেল। বড়ো ড্রোমিওর হাতেও তলোয়ার-তলোয়ার উচিয়ে সে তার মনিবকে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে যাতে কেউ তার মনিবের কাছে ভিড়তে না পারে। এ দৃশ্য দেখে আড্রিয়ানা জনতার কাছে করুণ মিনতি জানাতে লাগল তারা যেন তার স্বামীকে বেঁধে ফেলে। এদিকে অ্যান্টিফোলাসও বেশ বুঝতে পারল এভাবে তলোয়ারের ভয় দেখিয়ে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যাবে না জনতাকে। কিছুক্ষণ বাদেই লোকেরা তার চারপাশ ঘিরে ধরে আড্রিয়ানার কথামতো দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলবে তাকে। এমন সময় সামনে একটা বাড়ি দেখতে পেল অ্যান্টিফোলাস। কোনও উপায় দেখতে না পেয়ে সে আর বড়ো ড্রোমিও দ্রুত সেই বাড়িতে ঢুকে পড়ল আশ্রয়ের আশায়।
সে বাড়িটা আসলে একটা মঠ, এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসিনী সেই মঠের কর্ত্রী। লোকজনের চিৎকারচেচামেচি শুনে তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন। সব শোনার পর তিনি আড্রিয়ানাকে বললেন, দ্যাখ, এই মঠে কেউ আশ্রয় নিলে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাবার অধিকার কারও নেই। এই মুহূর্তে তোমরা চলে যাও এখান থেকে।
সন্ন্যাসিনীর কথা শুনে আড্রিয়ানা রেগেমেগে বলল, কিন্তু যাদের মাথা খারাপ হয়েছে তাদের বেলা এ নিয়ম খাটে না। আমার স্বামীর মাথা খারাপ হয়েছে। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমি তার চিকিৎসা করবে। সেখানে ওঝা অপেক্ষা করে আছে।
মঠের কর্ত্রী কিন্তু মানতে চাইলেন না আড্রিয়ানার কথা। তার স্থির বিশ্বাস, আশ্রয়ের জন্য যারা মাঠে ঢুকেছে। তাদের কেউ পাগল নয়। মেয়েটি বলছে বটে তার স্বামীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে, কিন্তু কোথায় যেন একটা ভুল হচ্ছে বলে মনে করছেন সন্ন্যাসিনী। তাই তিনি কিছুতেই রাজি হলেন না। আড্রিয়ানার হাতে বড়ো অ্যান্টিফোলাসকে তুলে দিতে।
এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে। বৃদ্ধ সওদাগরাইজিয়নকে তার জরিমানার টাকা জমা দেওয়ার যে সময় দিয়েছিলেন ডিউক, তার মেয়াদও ফুরিয়ে আসছে। সূর্য ডোবার আগে টাকা দিতে না পারলে প্ৰাণদণ্ড হবে ইজিয়নের। প্ৰাণদণ্ড দেবার জন্য রক্ষীরা ইজিয়নকে কারাগার থেকে বের করে। মঠের দিকে নিয়ে আসছে। যে জায়গাটায় তার প্রাণদণ্ড হবে তা মঠের ঠিক পাশেই।
প্ৰাণদণ্ড দেবার জন্য ইজিয়নকে নিয়ে চলেছে জল্লাদ। আর তার পেছনে পেছনে ডিউক চলেছেন একদল প্রহরী আর কর্মচারী নিয়ে। সে সময় মঠ থেকে বেরিয়ে এল আড্রিয়ানা। মঠের কািন্ত্ৰী তার পাগল স্বামীকে আটকে রেখেছেন বলে সে অভিযোগ জানাল ডিউকের কাছে।
ডিউক খুব দুঃখ পেলেন আড্রিয়ানার কথা শুনে। কারণ তার স্বামী অ্যান্টিফোলাস সেনাদলের এক পদস্থ সেনানি, রাজসভার নিয়মিত সভাসদ। একদিন তিনি নিজেই অ্যান্টিফোলাসের সাথে আড্রিয়ানার বিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি মঠের কর্ত্রীকে ডেকে বললেন, অ্যান্টিফোলাস নামে যে ব্যক্তিটি আপনার মঠে আশ্রয় নিয়েছে তাকে ডেকে আনুন। ডিউকের হুকুম শুনে মঠের কর্ত্রী ভেতরে গেলেন তার আশ্রিতদের আনতে। ঠিক সে সময় ছোটো ড্রোমিওকে সাথে নিয়ে ছোটো অ্যান্টিফোলাসও হাজির হলেন সেখানে। ওঝার হাত থেকে কোনও মতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আড্রিয়ানার সাথে একটা ফয়সালা করতে এসেছেন তিনি। তারা আসার সাথে সাথেই বড়ো অ্যান্টিফোলাস আর বড়ো ড্রোমিওকে নিয়ে বাইরে এলেন মঠের কর্ত্রী।
এবার সবাই নিশাচুপ। অবাক হয়ে আড্রিয়ানা দেখল তার সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুজন স্বামী। বড়ো ও ছোটো ড্রোমিও আশ্চর্য হয়ে দেখল তাদের দুজন মনিবই হুবহু একরকম দেখতে। বড়ো ও ছোটো অ্যান্টিফোলাসও দেখলেন তাদের দুজন চাকরের মাঝে এক আশ্চর্য মিল। আর ইজিয়ান যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারল না যে সত্যিই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুই হারানো ছেলে আর দুই পালিত পুত্র। সে ডেকে উঠল তার দুই ছেলেকে। ডাক শুনে ঘাড় ঘোরালো বড়ো ও ছোটো অ্যান্টিফোলাস। বন্দি অবস্থায় বাবাকে দেখে অবাক হয়ে গেল তারা। ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে ডেকে নিজের পরিচয় দিলাইজিয়ান। এতদিন পর হারানো বাবাকে পেয়ে বেজায় খুশি হল ছোটো অ্যান্টিফোলাস। এবার চমকে উঠলেন। মঠের কর্ত্রী — তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি এতদিন বাদে আবার ফিরে পাবেন স্বামী ইজিয়নকে। আর শুধু স্বামী নয়, দুই হারানো ছেলে আর দুই পালিত পুত্রকেও ফিরে পেলেন ইজিয়নের স্ত্রী এমিলিয়া।
এমন আনন্দের দিনে ডিউক খুশি হয়ে প্রাণদণ্ড মকুব করে মুক্তি দিলেন ইজিয়নকে। স্বামীর সাথে ভুল বোঝাবুঝি মিটে গেল আড্রিয়ানার। ডিউকের সামনে আড্রিয়ানা প্রতিশ্রুতি দিলেন তিনি তার বোন লুসিয়ানার বিয়ে দেবেন ভাসুর বড়ো অ্যান্টিফোলাসের সাথে।
দ্য টু জেন্টেলমেন অব ভেরোনা
ভেরোনা ছিল ইতালির এক প্রাচীন ঐতিহাসিক শহর। দুই যুবক, প্রোটিয়াস আর ভ্যালেন্টাইন এই শহরেরই অধিবাসী। ছোটোবেলা থেকেই এই ভদ্র, শিক্ষিত, সম্পন্ন পরিবারের ছেলে দুটি একই সাথে লেখাপড়া শিখে বড়ো হয়েছে। স্বভাবতই তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে অন্তরঙ্গ এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
