এবার রেগে গেল অ্যাঞ্জেলো। ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে ধমকে উঠে বলল, কী বললেন, আমি মিছে কথা বলছি? আপনার মতো একজন ধনী লোক যে মিছে কথা বলে এভাবে গয়নাটা হাতিয়ে নেবেন তা আমার জানা ছিল না। জানলে কাজের আগেই পুরো দামটা আগাম নিয়ে নিতাম।
ধমকে উঠে বলল ছোটো অ্যান্টিফোলাস, মুখ সামলে কথা বলবে অ্যাঞ্জেলো। রাস্তার মাঝে যা-তা বলে অপমান করার ফল কিন্তু হাড়ে হাড়ে টের পাবে।
আপনি থামুন মশাই, পালটা ধমক দিল অ্যাঞ্জেলো, আপনার মতো চোর-জোচ্চোরকে আমি থোড়াই কেয়ার করি। এখনও বলছি হারের দামটা মিটিয়ে দিন, নইলে ঘোল খাইয়ে ছাড়ব আপনাকে।
এদের ঝগড়া-ঝাঁটির মাঝেই এসে পড়ল আদালতের পেয়াদা। তাকে দেখেই ছোটো অ্যান্টিফেলাসকে ইশারায় দেখিয়ে অ্যাঞ্জেলো বলল, এর ফরমায়েস মতো আমি একটা হার তৈরি করে কিছুক্ষণ আগেই এর হাতে দিয়েছি। কিন্তু ও তার দাম দিতে চাইছে না। তুমি ওকে গ্রেপ্তার করে ডিউকের আদালতে নিয়ে যাও। খানিক বাদে আমিও যাচ্ছি। সেখানে।
সে সময় অভিযোগকারীর কাছ থেকে নির্দিষ্ট সরকারি দক্ষিণা নিয়ে যে কোনও লোককে গ্রেপ্তার করতে পারত আদালতের পেয়াদা। অ্যাঞ্জেলোর কাছ থেকে যথােচিত দক্ষিণা নিয়ে সে সাথে সাথে গ্রেপ্তার করল ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে, ছোটো অ্যান্টিফোলাস দেখল পরিস্থিতি মোটেও তার অনুকূল নয়–কাজের মানুষ হিসেবে যদিও সে ডিউকের কাছের লোক, কিন্তু আসামী হিসেবে আদালতে হাজির হলে ডিউকের সাথে তার সে সম্পর্ক থাকবে না। তাছাড়া অ্যাঞ্জেলোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার মান-সম্মান- প্রতিপত্তি এমনকি পদস্থ সেনানির চাকরিটাও হয়তো তাকে খোয়াতে হবে। এতক্ষণ ধরে অবাক হয়ে তার মনিবের সাথে অ্যাঞ্জেলোর কথা কাটাকাটি শুনছিল ছোটো ড্রোমিও। এবার অ্যান্টিফোলাস তাকে বলল সে যেন আড্রিয়ানার কাছ থেকে স্বর্ণকার অ্যাঞ্জেলোর পাওনা টাকাটা নিয়ে আসে। সাথে সাথেই মনিবের বাড়িতে ছুটে গেল ছোটো ড্রোমিও। গিন্নিমা আড্রিয়ানাকে সব কথা বলতেই সে তাড়াতাড়ি সিন্দুক খুলে টাকাটা বের করে দিয়ে দিল ছোটো ড্রোমিওর হাতে। টাকাটা নিয়ে বেরিয়ে গেল ছোটো ড্রোমিও। কিছুদূর যেতেই তার সাথে দেখা হল বড়ো অ্যান্টিফোলাসের। ছোটো ড্রোমিও কিছুতেই বুঝতে পারল না। টাকা ছাড়া কীভাবে তার মনিব খালাস পেলেন। ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে এই ভেবে সে পুরো টাকাটাই মনিবের হাতে তুলে দিয়ে বলল, এ টাকা গিন্নিমা পাঠিয়ে দিয়েছেন। বড়ো অ্যান্টিফোলাসের বুঝতে বাকি রইল না যে অচেনা মহিলা তাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পাশে বসিয়ে খাইয়েছেন, স্বামী বলে আদর-সোহাগ করেছেন- তিনিই পাঠিয়েছেন এ টাকাটা। সে একবার ভাবল টাকাটা মহিলাকে ফিরিয়ে দেবে, কিন্তু পরীক্ষণেই মনে হল টাকাটা ফেরত দিতে গিয়ে যদি আবার কোনও ঝামেলা বেধে যায় — এই ভেবে টাকার থলিটা সে পকেটে পুরে নিল। এরপর ছোটো ড্রোমিওকে বলল, দ্যাখ! হাতে আর বেশি সময় নেই। এই বেলা সেন্টার হোটেলে চলে যা। সেখানে থাকা-খাওয়ার জন্য যে টাকাটা জমা দিয়েছিস তা তুলে নিয়ে আয়। আর মাল-পত্র যা রয়েছে তা নিয়ে জাহাজঘাটায় চলে যাবি। একটু বাদেই জাহাজ ছাড়বে।
আবার সেই হোটেল! সেখান থেকে মালপত্র নিয়ে জাহাজে যেতে হবে? –মনিবের কথাগুলো শুনে ছোটো ড্রোমিওর বুঝতে বাকি রইলনা সত্যিই তার মনিবের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। হোটেলে যাবার নামে সে তখনি ছুটে গেল মনিবগিন্নি আড্রিয়ানার কাছে। সব কথা খুলে বলল তাকে। তার স্বামীর যে সত্যিই মাথা খারাপ হয়েছে, সে কথা ছোটো ড্রোমিওর মতো আড্রিয়ানা ও লুসিয়ানার বুঝতে বাকি রইল না। লুসিয়ানাকে সাথে নিয়ে আড্রিয়ানা তখনই বেরিয়ে পড়লেন স্বামীর খোঁজে।
কিছুদূর যাবার পর আড্রিয়ানার চোখে পড়ল আদালতের পেয়াদা বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে তার স্বামীকে। স্বামীর ওই অবস্থা দেখে চোখে জল এসে গেল। আড্রিয়ানার। সে তখনই ছুটে গোল স্বামীর কাছে। তাকে দেখেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। ছোটো অ্যান্টিফোলাস। যা মুখে আসে তাই বলে গালাগাল দিয়ে বলল, ক্ষুধার জুলায় যখন আমার পেট জ্বলে যাচ্ছিল, সে সময় বারবার ডাকাডাকি করা সত্ত্বেও তুমি বাড়িতে ঢুকতে দাওনি আমায়। এমন কি গ্রেপ্তারের খবর পেয়েও তুমি আমায় ছাড়াতে টাকা পাঠাওনি। এসবের পরেও তুমি কি করে আমার স্ত্রী বলে নিজেকে দাবি করো? মরলেও নরকে ঠাই হবে না তোমার। ডিউককে বলে এবার তোমার শাস্তির ব্যবস্থা করছি।
আড্রিয়ানা বুঝে উঠতে পারল না নিজের পাশে বসিয়ে খাওয়াবার পরও কেন তার স্বামী এই অভিযোগ করছেন। আর জরিমানার টাকা! সে তো নিজেই কিছুক্ষণ আগে আলমারি খুলে বের করে দিয়েছে ছোটো ড্রোমিওর হাতে তাহলে তিনি কি করে এসব কথা বলছেন? স্বামীর মাথা যে ঠিক নেই সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ রইল না আড্রিয়ানা আর লুসিয়ানার মনে।
এবার পেয়াদার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে স্বামীকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া দরকার। আড্রিয়ানা পেয়াদাকে কথা দিল স্বামীকে বাড়ি পৌঁছে দিলেই সে তার জরিমানার টাকা দিয়ে দেবে। পেয়াদার কাছে সে এও শুনল কিছুক্ষণ আগে স্বর্ণকার অ্যাঞ্জেলো তার স্বামীকে একখানা হার দিয়েছে। কিন্তু তার স্বামী সে হারের দাম দিতে চাইছেন না, বলছেন স্বর্ণকার আদীে তাকে কোনও হার দেয়নি।। তারপর তারা উভয়ে একে অন্যকে গালাগাল দিতে শুরু করে। সে সময় সরকারি পেয়াদা সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। অ্যাঞ্জেলো তাকে ডেকে সবকিছু জানিয়ে বলে যে সে যেন তার কাছ থেকে সরকারি দক্ষিণা নিয়ে ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে গ্রেপ্তার করে। সেইমতো অ্যাঞ্জেলোর কাছ থেকে যথাযথ দক্ষিণা নিয়ে সে গ্রেপ্তার করে ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে। ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আড্রিয়ানার কাছে থেকে টাকা নিয়ে চলে গেল পেয়াদা। এবার চেঁচিয়ে রাস্তা থেকে লোকজন ডেকে আনল আড্রিয়ানা। তার কথামতো লোকজন দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখল ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে। তারপর পাগলামির চিকিৎসার জন্য ডেকে নিয়ে এল এক গ্রাম্য ওঝাকে। সে সময় পাগলামির চিকিৎসার জন্য লোকেরা ওঝারই শরণাপন্ন হত।। ওঝার হাতে স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে, বাড়ির দরজা ভালোভাবে বন্ধ করে দিয়ে এবার আড্রিয়ানা রওনা দিল অ্যাঞ্জেলোর বাড়িতে গিয়ে হারের দাম পরিশোধ করতে। কিছুদূর যাবার পর তার সাথে দেখা হয়ে গেল বড়ো অ্যান্টিফোলাসের। তাকে দেখেই আড্রিয়ানা ধরে নিল ওঝার হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে এসেছে তার স্বামী।
