ছোটো ড্রোমিওকে বেশ করে ধমকিয়ে বাড়ি ফিরে গেল ছোটো অ্যান্টিফোলাস। গিয়ে দেখল ভেতর থেকে বন্ধ রয়েছে বাড়ির সদর দরজা। সে বারবার দরজায় ধাক্কা দিল, চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল স্ত্রী আর শ্যালিকাকে, এরপর জোরে কড়া নাড়ল। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ দরজা খুলে দিল না। শেষমেশ ছোটো ড্রোমিও তার প্রেমিক, আড্রিয়ানার সহচরী নেল-এর নাম ধরে ডাকাডাকি করল। কিন্তু তাতেও কেউ দরজা খুলে দিল না।
এসব কাণ্ড-কারখানা দেখে বড়ো অ্যান্টিফোলাস আর বড়ো ড্রোমিওর মনে এতুটুকুও সন্দেহ রইল না যে তার এক আজব দেশে এসে পৌঁছেছে। তারা উভয়েই হাঁফিয়ে উঠেছে। এ বাড়ির পরিবেশ ও তার অধিবাসীদের হাব-ভাব দেখে। সুযোগ পেতেই তারা আড্রিয়ানা আর লুসিয়ানার চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে গেল বাড়ি থেকে। ওদিকে আবার চেচামেচি করেও বাড়ির দরজা খোলাতে না পেরে রেগে বোম হয়ে আছে ছোটো অ্যান্টিফোলাস। খাওয়া-দাওয়া সারাতে সে তখনই চলে গেল তার এক বন্ধুর বাড়িতে। পথে তার সাথে দেখা হল স্যাকরান অ্যাঞ্জেলোর সাথে। এর আগে আড্রিয়ানার জন্য বহু গয়না তৈরি করেছে অ্যাঞ্জেলো। এই কদিন আগেও আড্রিয়ানার জন্য হিরে-জহরত বসানো একটা সোনার তৈরির গয়না দিয়েছে অ্যান্টিফোলাস। দেখা হতেই অ্যাঞ্জেলো জানাল যে হারখানা তৈরি হয়ে গেছে। এমনিতেই আড্রিয়ানার উপর বেজায় রেগে ছিলেন অ্যান্টিফোলাস। তিনি স্থির করলেন হারখানা আড্রিয়ানাকে না দিয়ে বরং তার বন্ধুকে উপহার দেবেন। তিনি স্যাকরাকে বললেন সে যেন হারখানা বন্ধুর বাড়িতে দিয়ে আসে। তার কথা শুনে স্যাকরা তখনই ছুটিল নিজের বাড়ির দিকে।
বাড়ি থেকে হার নিয়ে এসে কিছুদূর যাবার পর অ্যাঞ্জেলোর সাথে দেখা হয়ে গেল বড়ো অ্যান্টিফোলাসের। সে একরকম জোর করেই হারটা বড়ো অ্যান্টিফোলাসের হাতে গুজে দিয়ে বলল, এই রইল আপনার হার। আপনি যেমন বলেছেন তেমনিই করেছি। আশা করি এটা আপনার পছন্দ হবে।
অ্যাঞ্জেলোর দিকে তাকিয়ে বললেন বড়ো অ্যান্টিফোলাস, এ কি, হারটা আমায় দিচ্ছেন কেন? মনে হয় আপনি ভুল করছেন। আমি তো আপনাকে চিনিই না।
এ সব কী বলছেন আপনি, বলল অ্যাঞ্জেলো, আরে মশায়! আপনার সাথে কি আজকের সম্পর্ক নাকি আপনি ভাবছেন দামের কথা। সে আপনি পরে দিয়ে দেবেন- আমি আপনার বাড়ি গিয়ে নিয়ে আসবা–বলে অন্যদিকে চলে গেল অ্যাঞ্জেলো। এত তাড়াতাড়ি ঘটনোটা ঘটে গেল যে অ্যাঞ্জেলোকে কিছু বলা বা বাধা দেবার সময় পেলেন না বড়ো অ্যান্টিফোলাস। হারটা হাতের মুঠোয় নিয়ে সে মনে মনে বলল, এ যে সত্যিই একটা আজব দেশ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এখানকার বড়ো ঘরের বউ-ঝিরা অচেনা পুরুষকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে পাশে বসিয়ে খাওয়ায়, স্বামী স্বামী বলে আদর-সোহাগ করে। আর এখানকার স্বর্ণকাররাও তেমনি! অচেনা বিদেশির হাতে দামি জড়োয়ার হার গুজে দিয়ে দাম না নিয়ে চলে যায়। আজব দেশের সব আজব ঘটনা।
বড়ো ড্রোমিও নিজেও ভাবছিল সেই একই কথা। কিছুক্ষণ আগে যে বাড়ির বউ তার মনিবকে খাওয়াতে নিয়ে গেল, সে বাড়ির কাজের মেয়ে নেল। তার সাথে এমন ব্যবহার করল যে মনে হল পরস্পর পরস্পরকে কত ভালোবাসে। সে নিজ মুখেই ড্রোমিওকে বলল যে সে তাকে বিয়ে করতে রাজি আছে।
বড়ো অ্যান্টিফোলাস বলল, আর নয় ড্রোমিও, ঢ়ের হয়েছে। নতুন কিছু ঘটার আগেই চল এখান থেকে পালিয়ে যাই। তুই এখনই জাহাজঘাটায় চলে যা। সবচেয়ে আগে যে জাহাজটা ছাড়বে, তা যে দিকেই যাক না কেন, সেটাতে আমাদের যাবার ব্যবস্থা করে আয়। তুই ফিরে এলে হোটেল থেকে আমাদের মাল-পত্ৰ, টাকা-কড়ি সব তুলে নিয়ে জাহাজে চাপতে হবে। বেশিদিন এদেশে থাকলে হয়তো আমাদের জেলেই যেতে হবে। তার চেয়ে চল, প্ৰাণ নিয়ে পালাই।
বাড়ি ফিরে অ্যাঞ্জেলো দেখল তার কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ের আশায় অপেক্ষা করে আছে এক পাওনাদার। কিছুক্ষণ আগে অ্যান্টিফোলাসকে যে হারখানা সে দিয়েছে তার দাম নেওয়া হয়নি। সে স্থির করল ওই টাকাটা আদায় করে পাওনা মিটিয়ে দেবে। পাওনাদারকে অপেক্ষা করতে বলে সে চলে গেল অ্যান্টিফোলাসের বাড়ির দিকে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যাবার পর রাস্তাতেই অ্যাঞ্জেলোর সাথে দেখা হয়ে গেল ছোটো অ্যান্টিফোলাসের। সে তখন বন্ধুর বাড়ি থেকে খাওয়া-দাওয়া করে ফিরছিল। ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে দেখেই অ্যাঞ্জেলো বলল, এই যে মশাই! আপনার কাছে যাচ্ছিলাম।
আমার কাছে? কেন? ব্যাপারটা আঁচ করতে না পেরে বলল অ্যান্টিফোলাস।
অ্যাঞ্জেলো বলল, বাড়ি ফিরে দেখি এক পাওনাদার বসে আছে। সে আবার পাওনা টাকা না নিয়ে এক পাও নড়বে না। বলছি কী, যে হারটা আপনি আমায় বানাতে দিয়েছিলেন, অনুগ্রহ করে যদি তার দামটা দিয়ে দেন তাহলে পাওনাটা মিটিয়ে দিতে পারি।
নিশ্চয়ই পাবে, বলল অ্যান্টিফোলাস, আগে তো হারটা আমায় দেবে। তবে তো দাম দেব। জিনিসটা না দিয়েই তুমি তার দাম চাইছ? কী করে ভাবলে জিনিসটা না পেয়ে আমি তার দাম দেব?
সে কী কথা! অবাক হয়ে দু-চোখ কপালে তুলে বলল অ্যাঞ্জেলো, এই তো কিছুক্ষণ আগে রাস্তার মাঝে হারটা তুলে দিলাম। আপনার হাতে।
রেগে গিয়ে দু-চোখ কপালে তুলে বলল ছোটো অ্যান্টিফোলাস, কী বললে, হারটা আমার হাতে দিয়েছ আর তাও আবার রাস্তার মাঝখানে! আমি তোমায় বলেছি হারটা নিয়ে বন্ধুর বাড়িতে যেতে। কিন্তু তুমি সেখানে যাওনি। তারপর তোমার সাথে এই দেখা। তুমি মিথ্যে কথা বলছি অ্যাঞ্জেলো। হারটা তুমি মোটেও দাওনি–না দিয়েই দাম চাইছ।
