উভয়ের চড়া গলার কথা-বার্তা শুনে কিছু কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে উঠল তাদের চারপাশে। তাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে আপন মনে বলে উঠল। ড্রোমিও, এ আবার কী ফ্যাসাদে পড়া গেল! মনিবের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? সে মনিবের দু-হাত ধরে বলল, বিশ্বাস করুন, আমি আপনার সাথে ঠাট্টা-তামাশা করছি না। মনে হচ্ছে আপনিই বরং আমার সাথে ঠাট্টা-তামাশা করছেন। সে যাই হোক, আপনি খাওয়া-দাওয়ার পাটটা আগে মিটিয়ে ফেলুন, নইলে বাড়ির কারও খাওয়া হবে না। এ কথাটা কেন আপনি বুঝতে পারছেন না? দোহাই আপনার! এবার বাড়ি চলুন। গিন্নিমা আপনার জন্য….।
আবার বলছিস গিন্নিমা! হতভাগা, আমার সাথেইয়ার্কি হচ্ছে? বলেই সবার সামনে ড্রোমিওকে বেশ কয়েক ঘা লাগিয়ে দিল বড়ো অ্যান্টিফোলাস। মার খেয়ে একটি কথাও না বলে চোেখ মুছতে মুছতে ড্রোমিও ফিরে গেল গিন্নিমার কাছে।
কেঁদে কেঁদে গিন্নিমাকে শোনাল ড্রোমিও কীভাবে সবার সামনে রাস্তার মাঝে সে মার খেয়েছে মনিবের হাতে। সব শুনে বেজায় রেগে গেল আড্রিয়ানা। সে ধরে নিল তার স্বামী অন্য কোনও মেয়ের প্রেমে পড়েছে।
চাকরকে সাস্তুনা দিয়ে বলল, আড্রিয়ানা, মিনিবের হাতে মার খাবার জন্য তুই দুঃখ করিস না ড্রোমিও। আমি কথা দিচ্ছি। উনি ফিরে এলেই এর একটা হেস্তনেস্ত করে তবে ছাড়ব।
পাশ থেকে আড্রিয়ানার ছোটো বোন লুসিয়ানা বলে উঠল, দেখতে পাচ্ছি শুধু তোর বর নয়, তোরও মাথা খারাপ হয়েছে। আচ্ছা, তোর বর যদি সত্যিই অন্য কারও প্রেমে পড়ে থাকেন, তাহলে কি তিনি সে কথা স্বীকার করবেন? দ্যাখ, ওভাবে কাজ হবে না। এবার আমি যা বলি তা মন দিয়ে শোন। চল, ওদের হাতে-নাতে ধরতে আমরা এখনই বেরিয়ে পড়ি — ঘাড় ধরে নিয়ে আসি তোর বরকে। যদি দেখি সে কোনও সর্বনাশীর সাথে ফষ্টি-নষ্টি করছে, তাহলে সবার সামনে তার চুলের মুঠি ধরে বেশ কয়েক ঘা লাগিয়ে দিবি যাতে অন্যের সাথে প্রেম করার শখ চিরদিনের মতো মিটে যায়।
আড্রিয়ানার মনে ধরল। ছোটো বোনের কথা। সে তখনই তার সাথে বেরিয়ে গেল স্বামীর খোঁজে।
সবার সামনে ড্রোমিওকে মার-ধর করার জন্য মনটা বেশ খারাপ লাগছে অ্যান্টিফোলাসের। সে সোজা চলে এল সেন্টর হোটেলে। দেখল তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে ড্রোমিও। সে বলল মনিবের কথামতো ঘর ভাড়ার টাকা সে আগাম জমা দিয়েছে।
এই তো আমার কথা মতো কাজ করেছিস, বলল অ্যান্টিফোলাস, তাহলে কিছুক্ষণ আগে কেন বলছিলি। গিন্নিমা অপেক্ষা করছে, তাড়াতাড়ি বাড়ি না গেলে খাবার ঠান্ড হয়ে যাবে। — এইসব আজে-বাজে কথা? ড্রোমিও আশ্চর্য হয়ে গেল এসব কথা শুনে। এ ধরনের আজে-বাজে কথা সে মোটেও বলেনি। টাকা জমা দেবার পর হোটেল থেকে সে একদম বাইরে বের হয়নি। ঠিক সে সময় লুসিয়ানাকে সাথে নিয়ে আড্রিয়ানাও এসে হাজির সেখানে। রাস্তার লোকজনকে জিজ্ঞেস করে সে জেনেছে চাকরকে মারধর করার খানিক বাদেই তার স্বামী সোজা এই হোটেলে এসে ঢুকেছে।
সবাইকে শুনিয়ে আড্রিয়ানা জোর গলায় বলল তার স্বামীকে, কী করেছ তুমি? কেন রাস্তার মাঝে সবার সামনে ড্রোমিওকে মারধর করেছ? তাকে নাকি বলেছ তোমার বিয়েই হয়নি। আর হোটেলে থাকবে বলে টাকা জমা দিয়েছ? আমায় ছুয়ে বল তো এসব সত্যি কিনা! আমি এমন কী দোষ করেছি। যার জন্য তুমি আমায় ত্যাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইছ? বলতে বলতে আড্রিয়ানার দু-চোখ জলে ভরে ওঠে।
আড্রিয়ানার অভিযোগ শুনে বেশ ঘাবড়ে গেল অ্যান্টিফোলাস। সে ভেবে পেল না। কীভাবে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাবে। সে ঠান্ডা মাথায় আড্রিয়ানাকে বোঝাতে চাইল যে সে তার স্বামী নয়, একজন পর্যটক মাত্র। একটা বিশেষ প্রয়োজনে সে এসেছে এফিসাসে। তার এখনও বিয়েই হয়নি।
নিজের কপাল চাপড়ে আক্ষেপের সুরে বলল আড্রিয়ানা, এই সেদিনও বিয়ের পর তুমি আমায় কত ভালোবাসতে, আদর-সোহাগ করতে – এগুলো তো সামান্য কদিন আগের ঘটনা। আর এখন তুমি বলছি কিনা তোমার বিয়েই হয়নি! নিশ্চয়ই কোনও মেয়েছেলের নজর পড়েছে তোমার উপর, তাই আজি না চেনার ভান করছি। পুরুষগুলোর স্বভাবই এমন, কখন কাকে মনে ধরে তার ঠিক নেই। এরপর ছোটো বোনের দিকে তাকিয়ে আড্রিয়ানা বলল, আমার অবস্থাটা একবার ভেবে দ্যাখ লুসি, যে মেয়েমানুষ স্বামীর ভালোবাসা পায় না, তার মতো অভাগী আর কেউ নেই–বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল আড্রিয়ানা। এবার সত্যিই মুশকিলে পড়ে গেল অ্যান্টিফোলাস। সে আড্রিয়ানাকে যতই বলে যে সে ভুল করেছে, ততই কান্না বেড়ে যায় আড্রিয়ানার।
এবার চাপা স্বরে অ্যান্টিফোলাসকে ধমকে বলে উঠল লুসিয়ানা, আচ্ছা! আপনি কী ধরনের লোক বলুন তো! সেই তখন থেকে কীসব ছেলেমানুযি শুরু করেছেন? না হয় মানছি আপনার বিয়ে হয়নি, আর বিয়েও আপনাকে করতে হবে না। দয়া করে এবার বাড়ি চলুন। সেই কখন থেকে আপনার খাবার সাজিয়ে বসে আছে দিদি। আমাদেরও তো ক্ষুধা-তৃষ্ণা পায় না কি, আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ নই?
লুসিয়ানার দিকে তাকিয়ে অ্যান্টিফোলাস বলল, তোমার দিদি? তাহলে তুমি কে?
ভগ্নিপতির কথায় এই প্রথম ধাক্কা খেল। লুসিয়ানা। সে অবাক হয়ে বলল, কী বলছেন আপনি? তার মনে প্রশ্ন জাগল, সত্যিই কি আড্রিয়ানার মতো তাকেও চিনতে পারেননি। অ্যান্টিফোলাস?
