আসুন! এবার আমরা ফিরে তোকই অতীতের দিকে। আঠারো বছর আগে ঝড়-বৃষ্টির সময় যে মাঝি-মাল্লারা এমিলিয়া, ছোটো অ্যান্টিফোলাস আর ছোটো ড্রোমিওকে জাহাজে তুলে নিয়েছিল তারা সবাইছিল আদতে জলদসু্য। জাহাজ এফিসাস বন্দরে ভিড়তেই তারা তাড়িয়ে দিল এমিলিয়াকে। তারপর তারা ছোটো অ্যান্টিফোলাস আর ছোটো ড্রোমিওকে চড়া দামে বিক্রি করে দিলে এক ধনী যোদ্ধার কাছে। সেই যোদ্ধা ছিলেন। এফিসাসের ডিউকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। একদিন আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে ডিউকের নজর পড়ল সেই শিশু দুটির দিকে। প্রথম দেখাতেই তার মায়া জন্মে গেল শিশু দুটির উপর। আত্মীয়টি যে দামে শিশু দুটিকে কিনেছিলেন, তার চেয়ে অনেক দাম দিয়ে তিনি তাদের নিয়ে এলেন রাজপ্রাসাদো-সেখানেই তারা মানুষ হতে লাগল। লেখাপড়ার সাথে সাথে তারা মল্লবিদ্যাও শিখতে লাগল। ওরা একটু বড়ো হবার পর ডিউক তাদের যুদ্ধবিদ্যাও শেখালেন। অল্পদিনের মধ্যেই যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা দেখালেন ছোটো অ্যান্টিফোলাস। তখন ডিউক তার সেনাবাহিনীতে সৈনিকের পদে নিয়োগ করলেন তাকে। অল্পদিনের মধ্যেই ছোটো অ্যান্টিফোলাস তার অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়ে ডিউকের রাজসভায় স্থায়ী আসন অর্জন করল। ক্রমে ক্ৰমে সে ডিউকের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠল। এরপর ডিউক ছোটো অ্যান্টিফোলাসের বিয়ে দিলেন শহরের সম্রােন্ত ধনীর মেয়ে আড্রিয়ানার সাথে। আড্রিয়ানা যেমন সুন্দর দেখতে তেমনি গুণবতী। বিয়ের সময় তার শ্বশুর ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে একটি সুন্দর বাড়িও যৌতুক হিসেবে দিলেন। আড্রিয়ানা তার নিজের অবিবাহিতা ছোটো বোন লুসিয়াকে এনে রাখল নিজের কাছে। কাজের দরুন ছোটো অ্যান্টিফোলাস যখন বাইরে থাকে, সে সময়টা বড়ো বোন আড্রিয়ানাকে সঙ্গ দেয় লুসিয়া না সাহায্য করে ঘর-দের গোছাতে। বড়ো বোন আড্রিয়ানার মতো লুসিয়াও অসাধারণ রূপসি।
রূপবতী স্ত্রী আর শ্যালিকাকে নিয়ে সুখে-স্বচ্ছন্দে দিন কটালেও মনে শান্তি নেই ছোটো অ্যান্টিফোলাসের। মার কথা মনে পড়লেই সে যেন কেমন আনমনা হয়ে যায়, সব সময় কেঁদে ওঠে তার মন। কী অদ্ভুত এই নিয়তির খেলা! মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত বন্দি ইজিয়ান জানেন না যে তার ছেলে ছোটো অ্যান্টিফোলাস আর পালিত পুত্র ছোটো ড্রোমিও রাজার হালে দিন কাটাচ্ছে এই শহরে বসে।
কী বিচিত্র এই নিয়তির লীলাখেলা। বৃদ্ধ সওদাগরাইজিয়নকে কারাগারে নিয়ে যাবার কিছুক্ষণ বাদে একটি জাহাজ এসে ভিড়ল এফিসাস বন্দরে। সেই জাহাজে ছিল ইজিয়নের ছেলে বড়ো অ্যান্টিফোলাস আর বড়ো ড্রোমিও। জাহাজ থেকে নামার আগে এক সহৃদয় ব্যক্তি বড়ো অ্যান্টিফোলাসকে জানাল এফিসাসের নতুন আইনের কথা এবং সে এও বলল রক্ষীদের প্রশ্নের জবাবে বড়ো অ্যান্টিফোলাস যেন না বলে যে সে সিরাকিউজ থেকে এসেছে। এফিসাসের নতুন আইন অনুযায়ী কোনও সিরাকিউজবাসী সেখানে এলেই তার প্রাণদণ্ড হবে – এ কথা সে প্রথম জানতে পারল সেই যাত্রীর কাছে থেকে। এবার মাল-পত্ৰ নিয়ে তারা নেমে পড়ল ডাঙায়। রক্ষীদের প্রশ্নের জবাবে উভয়ে জানাল যে এপিড্যামনাম থেকে আসছে তারা। বন্দর থেকে বেরিয়ে এসে তারা শুনতে পেল সেইদিনই শুধু সিরাকিউজের অধিবাসী এই অপরাধে একজন বৃদ্ধ সওদাগরকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। কিন্তু তারা কেউই জানতে পারল না যে সেই বৃদ্ধ সওদাগরই ইজিয়ন।
সম্পর্কে মনিব আর চাকর হলেও মাঝে মাঝে সমবয়স্ক বন্ধুর মতো একে অপরের সাথে কথা-বার্তা বলে। কখনও মানিবের মন খারাপ হলে বড়ো ড্রোমিও চেষ্টা করে হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে তাকে চাঙ্গা করে তুলতে।
কদিন এ শহরে থাকতে হবে তার ঠিক নেই। কাজেই থাকা— খাওয়ার একটা নিশ্চিন্ত ব্যবস্থা করতে ব্যাকুল হয়ে উঠল বড়ো অ্যান্টিফোলাস। জাহাজে থাকাকালীন এক যাত্রীর মুখে সে শুনেছিল এই শহরের সবচেয়ে ভালো হোটেলের নাম সেন্টার হোটেল। সেই হোটেলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য সে বড়ো ড্রোমিওকে ডেকে পাঠিয়ে তার হাতে প্রয়োজনীয় টাকা-কড়ি দিয়ে দিল। হোটেলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য বড়ো ড্রোমিও বেরিয়ে যেতেই মা-ভাইয়ের খোঁজে আশপাশের কয়েকটা রাস্তায় ঘুরে বেড়াল বড়ো অ্যান্টিফোলাস। কিন্তু তাদের কোনো হদিস না। পেয়ে মন খারাপ হয়ে গেল তার। সে ভাবতে লাগিল দেশে ফিরে গিয়ে বাবাকে কী জবাব দেবে। ঠিক সে সময় সে দেখতে পেল ড্রোমিওকে। অবাক হয়ে বড়ো অ্যান্টিফোলাস বলল, কীরে! এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলি? হোটেলের খাতায় আমাদের নাম-ধাম লিখিয়ে টাকা-পয়সা জমা দিয়েছিস তো? আমরা যে এপিডামনাম থেকে এসেছি সে কথা বলেছিস তো?
ড্রোমিও জবাব দিল, এ সব আপনি কী বলছেন? আপনার আসতে দেরি দেখেই তো গিন্নিমা আপনার খোঁজে আমায় পাঠালেন। তাড়াতাড়ি চলুন, নয়তো খাবার-দাবার জুড়িয়ে জল হয়ে যাবে।
ধমকে উঠে বলল বড়ো অ্যান্টিফোলাস, পাগলের মতো কি যা-তা বকছিস? গিঘিমা! সে আবার কে! এই কি তোর ঠাট্টা করার সময়?
বাঃ! বেশ বলেছেন তো! বলল ড্রোমিও, আমাদের গিন্নিমা মানে আপনার স্ত্রী আর সুন্দরী শ্যালিকা আপনার সাথে খাবে বলে সেই কখন থেকে অপেক্ষা করে বসে আছে। তাদেরও তো ক্ষুধা-তৃষ্ণা আছে সে কথা কেন ভুলে যাচ্ছেন?
ধমকে উঠে বলল বড়ো অ্যান্টিফোলাস, এখানে এসে তোর খুব বাড় বেড়েছে, তাই না? আরে আমি বিয়ে করলাম কবে যে আমার বউ আর শ্যালিকা অপেক্ষা করে বসে থাকবে? আর দ্যাখ! দুপুর হতে চলল, এখন এসব রসিকতা আর ভালো লাগছে না। এখন বল, হোটেলে ঘর ভাড়া নিয়েছিস তো? ঘরে আলো-হাওয়া ঢোকে তো? টাকা-পয়সা জমা দিয়েছিস?
