আমার প্রতিবেশিনী ছিলেন এক দরিদ্র মহিলা। তিনি ও আমার স্ত্রী, উভয়ে একই দিনে সন্তান প্রসব করেন। আশ্চর্যের কথা, ওই মহিলাও আমার স্ত্রীর মতো যমজ সন্তানের জন্ম দেন। দুৰ্ভাগ্যবশত যমজ সন্তান প্রসব করেই ওই মহিলা মারা যান। ওই বাপ-মা হারা ছেলে দুটিকে আমি তখন নিজ বাড়িতে নিয়ে আসি। ভেবেছিলাম বড়ো হয়ে ওই শিশু দুটি আমার দুই ছেলের চাকরের কাজ করবে। মহামান্য ডিউক! আপনি বিশ্বাস করবেন। কিনা জানি না, আমার যমজ ছেলেদুটির মতো ওই শিশু দুটিও ছিল হুবহু একই রকম। আমি তাদের নাম দিলাম বড়ো ড্রোমিও আর ছোটো ড্রোমিও।
এপিড্যামনামে কয়েক বছর বাস করার পর আমার স্ত্রী তাগাদ দিতে লাগলেন দেশে ফেরার জন্য। রোজ রোজ তাগাদা শুনে আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে ফেরার। একদিন স্ত্রী এমিলিয়া, বড়ো অ্যান্টিফোলাস, ছোটো অ্যান্টিফোলাস, বড়ো ড্রোমিও আর ছোটো ড্রোমিওকে নিয়ে জাহাজে চেপে রওনা দিলাম দেশের উদ্দেশে। দুদিন দু রাত নির্বিয়ে কেটে গেল জাহাজে। তৃতীয় দিন দুপুর থেকেই জটিল হতে লাগল পরিস্থিতি। একফালি ঘন কালো মেঘ দেখা দিল আকাশের এক কোণে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই একটুকরো মেঘ ছেয়ে ফেলল। সারা আকাশকে, সাথে সাথে শুরু হল ঝড়-বৃষ্টির দাপট। প্রতিমুহূর্তেই আমাদের মনে হচ্ছিল জাহাজটা যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। প্রকৃতির তাণ্ডবের হাত থেকে রক্ষা পেতে জাহাজের ক্যাপ্টেন আর মাঝি-মাল্লারা ছোটো ছোটো, নৌক জলে নামিয়ে যে যেদিকে পারে পালিয়ে গেল। এক মুহুর্তের জন্যও কেউ ভাবল না। আমাদের কথা। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না, এমন সময় চোখে পড়ল পাটাতনের এক কোণে রাখা জাহাজের একটি বাড়তি মাস্তুলের উপর। আমনি মাথায় এক বুদ্ধি এসে গেল। ওই মাস্তুলের একদিকে শক্ত করে বাঁধলাম স্ত্রী এমিলিয়া, ছোটো অ্যান্টিফোলাস আর ছোটো ড্রোমিওকে, আর অন্যদিকে বাঁধলাম বড়ো অ্যান্টিফোলাস, বড়ো ড্রোমিও আর নিজেকে। এরপর যা হয় হোক ভেবে নিয়ে বাঁপিয়ে পড়লাম সমুদ্রের জলে। জলে ভেসে থাকতে কোনও অসুবিধা হল না। উদ্দেশ্যহীনভাবে আমরা ভেসে চললাম। উত্তাল সমুদ্রের বুকে। ঝড়টা যখন সবে স্তিমিত হয়ে আসছে, সে সময় ঘটে গেল এক অদ্ভূত ঘটনা। ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে মাস্তুলটা ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেল। মুহুর্তের মধ্যে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম স্ত্রী এমিলিয়া, ছোটো অ্যান্টিফোলাস ও ছোটো ড্রোমিওর কাছ থেকে। অসহায়ভাবে চেয়ে দেখলাম ভাঙা মাস্তুলটা তাদের নিয়ে চলেছে। আমাদের উল্টোদিকে। কিছুক্ষণ বাদে দূর থেকে দেখলাম একটা ছোটো নৌকা এসে তাদের তুলে নিল সেই জাহাজে। কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। এই দেখে যে তারা জাহাজে আশ্রয় পেয়েছে। দূর থেকে দেখে মনে হল সেটা করিস্থেরই কোনও জাহাজ। এরপর পাল তুলে যাত্রা করল সেই জাহাজটি, ধীরে ধীরে তা মিলিয়ে গেল দিগন্তের ওপারে।
পরম করুণাময় ঈশ্বরের অসীম কৃপায় আমাদেরও আর বেশিক্ষণ জলে ভেসে থাকতে হল না। ভাসতে ভাসতে কিছুক্ষণ পর আমরা এক জাহাজের সামনে এসে পৌঁছালাম। আমাদের দেখতে পেয়ে জাহাজের মাঝি-মাল্লারা নৌকা নামিয়ে আমাদের তুলে নিল। ঝড়-বৃষ্টি থেমে যাবার পর তারা আমাদের পৌঁছে দিল সিরাকিউজ বন্দরে। হে মহামান্য ডিউক! সেই থেকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি স্ত্রী এমিলিয়া ও সেই শিশু দুটিকে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের দেখা পাইনি। এভাবে দিন কেটে যেতে লাগল। আজ বড়ো অ্যান্টিফোলাস আর বড়ো ড্রোমিও- উভয়েই পা দিয়েছে আঠারোয়। এখন তারা বলছে যে তারা বড়ো হয়েছে, এবার খুঁজতে বেরুবে মা-ভাইদের 1 তারা যেখানেই থাক না কেন, আমার বিশ্বাস এমিলিয়া, ছোটো অ্যান্টিফোলাস আর ছোটো ড্রোমিও সবাই জীবিত আছে। বয়সের ভারে আমার দেহ-মন খুবই ক্লান্ত, তাই ইচ্ছে সত্ত্বেও তাদের সঙ্গী হতে পারছি না। আমি। এমনিতেই প্ৰিয়জনদের হারিয়ে আমার মন ভেঙে গেছে। তার উপর যে দুজন আছে, তারাও যদি হারিয়ে যায় সেই ভয়ে আমি শুরুতে রাজি ছিলাম না তাদের প্রস্তাবে। কিন্তু অভিযানের নেশায় তাদের রক্ত গরম, তাই আমরা বারণ সত্ত্বেও পেছু হঠল না তারা। শেষমেশ অনেক বুঝিয়ে তারা আমাকে রাজি করাল। এক শুভদিনে বেরিয়ে পড়ল তারা।
ওরা চলে যাবার পর প্রিয়জনকে ফিরে পাবার আশায় দিন কাটতে লাগল আমার। দেখতে দেখতে পুরো এক বছর কেটে গেল তবুও ওরা ফিরে এল না। এভাবে একবছর কেটে যাওয়ার পর আমার আর ধৈর্যােসইল না। মনে হল, ওদের অনুমতি দিয়ে ঠিক কাজ করিনি। আমি। বেপরোয়া হয়ে আমি তাদের খুঁজতে বেরলাম জাহাজে চেপে। পাগলের মতো আমি ওদের খুঁজে বেড়ালাম এশিয়া-ইউরোপের দেশে-দেশে, বন্দরে-বন্দরে, কিন্তু কোথাও তাদের হদিস পেলাম না। হতাশ হয়ে একসময় দেশে ফেরার জন্য চেপে বসলাম জাহাজে। মাঝপথে কেন যে হঠাৎ এফিসাস বন্দরে নেমেছি তা আমি ভেবে উঠতে পারছি না। এদেশে যে এমন অদ্ভূত আইন চালু হয়েছে তা আমার জানা ছিল না। শহরে ঢুকতেই রক্ষীদের চোখে পড়ে গেলাম আমি। তারা আমায় বন্দি করে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে এল আপনার দরবারে। তারপর যা ঘটেছে তা তো অজানা নেই আপনার, মহামান্য ডিউক।
ইজিয়নের বেদনাভরা জীবন-কাহিনি শুনে খুবই ব্যথা পেলেন ডিউক। তিনি বললেন, দেখ, সওদাগর ইজিয়ন! তোমার জন্য আমি সত্যিই খুব দুঃখিত। কিন্তু দেশের প্রচলিত আইন ভেঙে তোমাকে মুক্তি দেওয়া আমার ক্ষমতার বাইরে। তবে তোমার মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে পুরো একদিন সময় দিলাম। হয়তো এই এফিসাস নগরে তোমার এমন কোনও আত্মীয়-বন্ধু আছে যে জরিমানার টাকা জমা দিয়ে তোমায় খালাস করে দিতে পারে–এই বলে কারাধ্যক্ষকে ডেকে ডিউক আদেশ দিলেন, একে কারাগারে নিয়ে যাও আর শহরের নাগরিকদের জানিয়ে দাও এর প্রাণদণ্ডের কথা। যদি কোনও সহৃদয় নাগরিক এর জরিমানার টাকা দিতে রাজি হয়, তাহলে একে ছেড়ে দিতে আমার কোনও আপত্তি নেই। ডিউককে অভিবাদন জানিয়ে কারাধ্যক্ষ ইজিয়নকে নিয়ে গেলেন। কারাগারে।
