পারডিটা হাঁটু গেড়ে বসে চুপচাপ মুগ্ধভাবে তার অপূর্ব সুন্দরী মায়ের মূর্তিটি দেখছিল। এবার সে বলল, “এখানে বসে মায়ের মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে থাকব।”
পলিনা বললেন, “বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠুন, আমাকে পর্দা ফেলতে দিন। আর তা না হলে, আরও আশ্চর্য কিছু দেখার জন্য প্রস্তুত থাকুন। আমি এই মূর্তিটাকে জীয়ন্ত করে তুলতে পারে। ওকে আপনাআপনি বেদি থেকে নামিয়ে আনতে পারি। ওকে দিয়ে আপনার হাত ধরাতে পারি। না, আপনি যদি ভাবেন যে, আমি কোনো অশুভ শক্তির সাহায্যে এমনটা করতে চাইছি, তাহলে আপনি ভুল ভাববেন।”
হতবাক রাজা বললেন, “তুমি ওকে দিয়ে যা করাবে, আমি তা-ই প্রাণভরে দেখব। যা বলাবে, তাই হৃদয় ভরে শুনব। শুধু ওকে জীয়ন্ত করে কথা বলাও।”
পলিনা সবকিছু প্রস্তুত করেই রেখেছিলেন। তিনি মৃদুস্বরে গান ধরলেন। এই গান তিনি এই উদ্দেশ্যেই বেঁধে রেখেছিলেন। তাঁর স্পর্শে দর্শকদের বেবাক করে মূর্তিটা নেমে এল বেদি থেকে। জড়িয়ে ধরল লিওন্টেসের গলা। কথা বলল। স্বামী আর নবলব্ধ সন্তান পারডিটার জন্য প্রার্থনা করতে লাগল।
মূর্তিটা যে লিওন্টেসের গলা জরিয়ে ধরে তার স্বামী ও সন্তানের জন্য প্রার্থনা করল, তাতে সন্দেহ রইল না। সন্দেহ রইল না যে, মূর্তিটাই স্বয়ং হারমায়োনি, অকৃত্রিম, জীবন্ত রানি।
পলিনা মিথ্যে বলেছিলেন। হারমায়োনি মারা যাননি। পলিনা রাজাকে রানির মৃত্যুসংবাদ দিয়ে রানির প্রাণরক্ষা করতে চেয়েছিলেন। তারপর থেকে হারমায়োনি দয়ালু পলিনার কাছেই থেকে যান। লিওন্টেস সেকথা ঘূণাক্ষরেও জানতে পারেননি। তাঁর প্রতি কৃত অবিচার রানি অনেক কাল আগেই ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমা করতে পারেননি তাঁর শিশুকন্যার উপর প্রদর্শিত নিষ্ঠুরতা। তাই পারডিটাকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করে থাকেন।
মৃত রানি ফিরে পেলেন প্রাণ। ফিরে এল হারানো মেয়ে। লিওন্টেসের বহুকালের দুঃখ ঘুচে তখন শুধুই আনন্দ আর আনন্দ।
চারিদিকে সবাই তাঁদের অভিনন্দন জানায়। নানা স্নেহবাক্য বলে। আনন্দিত পিতামাতা রাজকুমার ফ্লোরিজেলকে ধন্যবাদ জানায়, তাদের মেয়েকে ইতর শ্রেণির লোকেদের মধ্যে পেয়েও তাকে ভালবাসার জন্য। ক্যামিলো ও পলিনাও খুব খুশি হয়। খুশি হয় তাদের সেবার এমন মধুর ফল দেখে।
এই আশ্চর্য অভাবনীয় আনন্দময় পরিবেশে প্রাসাদে প্রবেশ করেন রাজা পলিজেনাস।
পলিজেনাস তাঁর ছেলে আর ক্যামিলোকে দেখতে না পেয়ে ধরে নেন যে, পলাতকেরা এখানে এসেছে। কারণ ক্যামিলো অনেক দিন ধরেই সিসিলিতে ফিরতে চাইছিলেন। পলিজেনাস দ্রুত তাঁদের পিছু নেন। শেষে এখানে যখন আসেন, সেই মুহুর্তটি লিওন্টেসের জীবনের সবচেয়ে আনন্দঘন ক্ষণ।
পলিজেনাসও আনন্দ উৎসবে যোগ দিলেন। ক্ষমা করে দিলেন বন্ধুর অন্যায় ঈর্ষা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা। ছেলেবেলার বন্ধুত্ব আর একবার ফিরে পেলেন দু’জনে। পারডিটার সঙ্গে ছেলের বিয়েতে তাঁর অমত হওয়ার ভয়ও দূর হল। কারণ পারডিটা তখন আর ‘ভেড়ার খুঁটি’ নয়, বরং সিসিলির রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারিণী।
এভাবে আমরা দেখলাম, বহুকালের দুঃখিনী হারমায়োনির তিতিক্ষার জয়। তিনি হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রানি ও সবচেয়ে সুখী মা। এই মহীয়সী নারী বহুকাল লিওন্টেস ও পারডিটার সঙ্গে সুখে কালাতিপাত করেছিলেন।
দ্য কমেডি অব এররস
বহুকাল ধরেই ঝগড়া-ঝাটি লেগে আছে দুটি পাশাপাশি রাজ্য সিরাকিউজ আর এফিসাসের মধ্যে। তদুপরি তাদের মনোমালিন্য আরও চরমে পৌঁছেছে সাম্প্রতিক চালু করা একটা আইন নিয়ে। একটা নতুন আইন চালু করেছেন এফিসাসের ডিউক, যা হল সিরাকিউজের কোনও নাগরিক এফিসাসে ঢুকে পড়লে তার সব টাকা-কড়ি কেড়ে নিয়ে প্রাণদণ্ড দেওয়া হবে তাকে। তবে সেই প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তির পক্ষে এফিসাসের কোনও নাগরিক যদি এক হাজার মার্ক জরিমানা দেয়, তাহলে মকুব করে দেওয়া হবে সেই ব্যক্তির প্রাণদণ্ড।
ঘটনাচক্রে সিরাকিউজের এক বৃদ্ধ সওদাগর, ইজিয়ান এসে পৌঁছালেন এফিসাসে। নতুন আইন সম্পর্কে জানা ছিল না তার। স্বাভাবিকভাবেই নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি নিজেকে সিরাকিউজের অধিবাসী বলে উল্লেখ করলেন। সাথে সাথেই প্রহরীরা তার টাকা-কড়ি ও অন্যান্য জিনিস-পত্ৰ কেড়ে নিয়ে গ্রেফতার করল তাকে। তার হাত-পা বেঁধে প্রহরীরা তাকে হাজির করল এফিসাসের ডিউক সোলিনাসের সামনে। প্রহরীদের কাছে সব কথা শুনে ইজিয়নকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করলেন ডিউক। তিনি আরও বললেন সূর্যাস্তের আগে যদি কোনও নাগরিকতার জরিমানা স্বরূপ এক হাজার মার্ক মিটিয়ে দেয়, তবেই মকুব হবে ইজিয়নের প্রাণদণ্ড। বৃদ্ধ ইজিয়ন ভেবে পেলেন না। এমন কোনো সহৃদয় নাগরিক আছে যে তার জরিমানার টাকা মিটিয়ে দেবে। এবার ডিউক জানতে চাইলেন কেন এফিসাসে এসেছে ইজিয়ন। ডিউকের প্রশ্নের জবাবেইজিয়ন, তার জীবনের করুণ কাহিনি শোনাতে লাগলেন ডিউককে।
ইজিয়ান বলতে লাগলেন, আমি সিরাকিউজে জন্মেছি। বড়ো হয়ে আমার পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি ব্যবসা-বাণিজ্যকে। বিবাহিত জীবন সুখেই কেটেছে। এপিড্যামনামে আমার ব্যবসার দেখ-ভাল করত এক বিশ্বস্ত কর্মচারী। সে মারা যাবার পর অন্য কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে আমি নিজেই চলে এলাম এপিডামনামে। সেখানে এসে ব্যবসার নানা কাজে জড়িয়ে পড়লাম। আমি। সে সব কাজ মিটিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা গেল না –। এমনকি ছমাসেও শেষ হল না সে সব কাজকর্ম। আমি বাড়ি না ফেরায় স্বভাবতই অস্থির হয়ে উঠল। স্ত্রী এমিলিয়া। আমি চলে যাবার সময় স্ত্রী এমিলিয়া ছিল গর্ভবতী-আমার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে উঠল। শেষে থাকতে না পেরে অন্য এক জাহাজে চেপে হাজির হল আমার কাছে এপিড্যামনামে। সেখানে আসার অল্পদিন বাদেই আমার স্ত্রী যমজ ছেলের জন্ম দিলেন। ছেলে দুটি দেখতে হুবহু এক রকম। — কোনও তফাত নেই তাদের। আমরা উভয়ের নামকরণ করলাম অ্যান্টিফোলাস — একজন বড়ো অ্যান্টিফোলাস আর অন্যজন ছোটো অ্যান্টিফোলাস। এক এক সময় আমরাই বুঝে উঠতে পারতাম না ওদের মধ্যে কে বড়ো, কে ছোটো।
