ক্যামিলো আগেই জানতে পেরেছিলেন যে, সিসিলির রাজা লিওন্টেস এখন সত্যিই অনুতপ্ত। তাই তিনি তাঁর পুরনো প্রভু ও মাতৃভূমি দর্শনের ইচ্ছা দমন করতে পারলেন না। তিনি ফ্লোরিজেল ও পারডিটাকে তাঁর সঙ্গে সিসিলির রাজসভায় যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। বললেন, যতদিন না তাঁর মধ্যস্থতায় পলিজেনাস তাদের ক্ষমা করে এই বিবাহে সম্মতি দেন ততদিন সেখানে লিওন্টেস তাঁদের রক্ষা করবেন।
একথায় সবাই সানন্দে রাজি হয়ে গেল। ক্যামিলো পলায়নের তোড়জোড় করলেন। বুড়ো মেষপালককেও তাঁদের সঙ্গে নিলেন।
মেষপালক সঙ্গে নিল পারডিটার অবশিষ্ট ধনরত্ন, তার শিশুবয়সের জামাকাপড় আর তার কাপড়ের সঙ্গে যে কাগজটি বাঁধা ছিল সেটি।
নির্বিঘ্ন যাত্রার শেষে ফ্লোরিজেল, পারডিটা, ক্যামিলো ও বুড়ো মেষপালক নিরাপদে লিওন্টেসের রাজসভায় উপস্থিত হলেন। লিওন্টসে স্ত্রী হারমায়োনি ও তার সন্তানকে হারিয়ে তখনও অনুশোচনায় পুড়ছিলেন। তিনি পরম আনন্দে ক্যামিলোকে গ্রহণ করলেন এবং রাজকুমার ফ্লোরিজেলকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানালেন। ফ্লোরিজেল পারডিটার সঙ্গে লিওন্টেসের পরিচয় ঘটাল তার স্ত্রী রূপে। পারডিটাকে দেখে লিওন্টেস আশ্চর্য হয়ে গেলেন তাঁর মৃত রানি হারমায়োনির সঙ্গে পারডিটার চেহারার আশ্চর্য মিল দেখে। তাঁর বেদনা আরেকবার উথলে উঠল। বললেন, মেয়েকে নিষ্ঠুরভাবে নির্বাসিত না করলে, আজ তাঁর এমনই একটি ফুটফুটে মেয়ে থাকত। ফ্লোরিজেলকে বললেন, “আর তোমার বাবার মতো এক নির্ভীক বন্ধুর সাহচর্য ও ভালবাসাও হারাতে হত না আমায়। আহা! আর একবার আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
রাজা একদিন তাঁর শিশুকন্যাকে হারিয়েছিলেন। আবার পারডিটা রাজার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ব্যাপার দেখে, বুড়ো মেষপালক রাজার মেয়ে হারানো আর তার মেয়ে পাওয়ার সময়টা হিসেব কষে দেখল। তার মনে হল, যে অবস্থায় সে পারডিটাকে পেয়েছিল, তাতে তার রাজকন্যা হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্তত তার ধনরত্ন ও অন্যান্য জিনিসপত্র সেই কথাই বলে। সে নিশ্চিত হল যে, পারডিটাই রাজার হারিয়ে যাওয়া সেই মেয়ে।
ফ্লোরিজেল, পারডিটা, ক্যামিলো ও বিশ্বস্ত পলিনার সামনে বুড়ো মেষপালক তার মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়ার বৃত্তান্ত বর্ণনা করল। অ্যান্টিগোনাসের মৃত্যুর কথাও বলল। সে তাকে ভালুকের হাতে আক্রান্ত হতে দেখেছিল। মেষপালক শিশুর কাপড়টি দেখাল। পলিনার মনে পড়ল যে, এই কাপড়েই হারমায়োনি মেয়েটিকে রাজার কাছে পাঠিয়েছিলেন। মেষপালক যখন গয়নাগুলি দেখালো, পলিনার মনে পড়ল যে, হারমায়োনি এগুলিই মেয়ের গলায় বেঁধে দিয়েছিলেন। মেষপালক কাগজটি দেখাতে পলিনা তার স্বামীর লেখা চিনতে পারল। সকলে নিঃসন্দেহ হল যে পারডিটাই লিওন্টেসের হারিয়ে যাওয়া মেয়ে। পলিনার মনে তখন একই সঙ্গে স্বামীর মৃত্যুসংবাদের দুঃখ এবং ওরাকল পরিপূর্ণ হওয়া অর্থাৎ, রাজার হারানো উত্তরাধিকার ফিরে পাওয়ার আনন্দ তোলপাড় করতে লাগল। পারডিটাই তাঁর মেয়ে – একথা জানার পর হারমায়োনিকে হারাবার দুঃখ আবার একবার পেয়ে বসল লিওন্টেসকে। অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলেন না তিনি। শুধু বলে গেলেন, “আহা, তোর মা, তোর মা!”
এই আনন্দবেদনাঘন মুহুর্তে ছেদ টানলেন পলিনা। তিনি লিওন্টেসকে বললেন, জুলিও রোমানো নামে এক অদ্বিতীয় শিল্পী তাঁর বাড়িতে রানির একটি মূর্তি বানিয়েছেন। সেই মূর্তি দেখলে রাজার মনে হবে, যেন স্বয়ং রানিই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। খুব ভাল লাগবে তাঁর। একথা শুনে সকলেই তখন চললেন মূর্তিটি দেখতে। রাজা তাঁর হারমায়োনির প্রতিরূপ দেখার জন্য উৎসুক ছিলেন। পারডিটা তার মায়ের মূর্তি দেখার জন্য ব্যগ্র ছিল। মাকে সে তো কোনোদিন দেখেইনি।
পর্দা সরালেন পলিনা। মূর্তিটি একেবারে হারমায়োনির অনুরূপ। দেখে রাজার দুঃখ জেগে উঠল আর একবার। তিনি বাক্যহারা স্থবির হয়ে রইলেন অনেক ক্ষণ।
পলিনা বললেন, “আপনার স্তব্ধতা আমাকে আপ্লুত করছে, মহারাজ। একেবারে আপনার রানির মতো দেখাচ্ছে, তাই নয় কী?”
তখন রাজা বললেন, “আহা, যেমনটি ওকে প্রথম দেখেছিলুম, সেই রকমভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পলিনা, হারমায়োনিকে একটু বয়স্ক দেখাচ্ছে, ও তো এতটা বয়স্ক ছিল না।” পলিনা বলল, “শিল্পীর দক্ষতা তো এখানেই। তিনি এমনভাবে এই মূর্তি বানিয়েছেন, যাতে এটি দেখলে হারমায়োনি আজ কেমন দেখতে হতেন, তা বোঝা যায়। কিন্তু মহারাজ, এবার পর্দা ফেলব, নইলে আপনি ভেবে বসবেন, মূর্তিটি এবার নড়াচড়া করবে।”
তখন রাজা বললেন, “পর্দা ফেলো না। আহা, আমার মরণ হয় না কেন! দ্যাখো, ক্যামিলো, তোমার মনে হচ্ছে না যে, মূর্তিটার শ্বাস পড়ছে। মনে হচ্ছে না, ওর চোখের পাতার মধ্যে কেমন একটা প্রাণ রয়েছে।” পলিনা বলল, “মহারাজ, আমাকে পর্দা ফেলতেই হচ্ছে। আপনি অত্যন্ত বিহ্বল হয়ে পড়েছেন। আপনি উন্মাদ হয়ে যাবেন।” লিওন্টেস বললেন, “পলিনা, লক্ষ্মীটি, কুড়ি বছরের কথা আমাকে ভাবতে দাও। আজও মনে হয়, ওর থেকে একটা হাওয়া আসছে। আহা, কোন ছেনিতে ওমন নিঃশ্বাস ফুটে উঠেছে! লোকে যা বলে বলুক, আমি ওকে চুম্বন করব।” পলিনা বলে উঠল, “না মহাশয় না, ওর ঠোঁটের উপর রং এখনো কাঁচা রয়েছে। আপনার ঠোঁট লেগে ওই তেলরং নষ্ট করে দেবে। পর্দা ফেলি?” লিওন্টেস বললেন, “পর্দা ফেলবে? কী করে এই কুড়ি বছরের উপর পর্দা ফেলবে তুমি?”
