না, এই মুহূর্তে তাকে উসকানি দেয়ার মতো কিছু নেই তোমার হাতে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে
‘বেশি ভালো হয় সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে।’ দৃঢ় স্বরে ঘোষণা করল জেন। মাথা থেকে চুল খুলে কানের চারপাশ দিয়ে উঁকি দিচ্ছে।
–সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তোমার পুলের কাছের মারুলা গাছগুলোতে ফল এলে আমার হাতিরা তোমাকে দেখতে আসবে। একমাত্র মারুলা জামের লোভ তারা সামলাতে পারে না। আমার বেড়া ভেঙ্গে চলে আসবে তারা। এটাকে মেরামত করার আগেই তোমার পাশে দেখবে মেলা বসে গেছে। তুমি যে কোন বাজি ধরতে পারো যে ঠিক সেই মুহূর্তে বন্দুকে তেল ঘষে প্রস্তুত হয়ে নেবে আমাদের বন্ধু আক্কারস। বেড়া ভাঙার ঘণ্টখানেকের মাঝে খবর পেয়ে যাবে সে।’
‘এই বার হয়তো সে একটা সারপ্রাইজও পাবে।’
‘তাই আশা করা যাক।
‘আমার মনে হয় নরম স্বরে জানাল ডেভিড’–আমরা হয়তো আগামীকাল ব্যান্ডোলিয়ার পাহাড়ে নেমে এই ভদ্রলোককে দেখে আসতে পারি।
‘একটা ব্যাপার নিশ্চিত’ অসংলগ্ন ভাবে বলে উঠল জেন, সে মোটেও ভদ্রলোক নয়।
.
ব্যান্ডোলিয়ার পাহাড়ে যাবার রাস্তাটা ভর্তি সাদা ধুলায়। স্যান্ড রোভারের পেছনে সারাক্ষণ দেখা গেল ধুলার ব্যানার ঝুলে আছে। পাহাড়টার আকৃতি গোলকার। ঘন গাছ ভর্তি আর ঠিক মহাসড়কের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
রাস্তা থেকে চার থেকে পাঁচশ গজ দূরে ট্রেডিং পোস্ট। আম বাগানের পেছনে এর গাঢ় সবুজ আর চকচকে অবয়ব দেখা যাচ্ছে। আফ্রিকার প্রায় সব জায়গায় এমন দেখা যাবে মাটির ইট দিয়ে বানানো দালানে লোহার ছাদ দেখা যায় নগ্ন ভাবে। দেয়ালে একের পর এক সাটা হয়েছে চা থেকে শুরু করে ফ্ল্যাশ লাইট ব্যাটারী সবকিছুর বিজ্ঞাপন।
সিঁড়ির সামনে, ধূলি-মলিন আঙ্গিনাতে ল্যান্ড রোভার পাক করল ডেভিড। সামনের সিঁড়ির গোড়ায় দেখা যাচ্ছে সাইন বোর্ড: ব্যান্ডোলিয়ার হিল জেনারেল ডিলার।
দালানের এক পাশে একটা পুরাতন সবুজ রঙের এক টন ওজনের ফোর্ড ট্রাক পার্ক করে রাখা। লাইসেন্স প্লেট ও স্থানীয় সিঁড়ির সামনের শেডের নিচে ডজন খানেকের বেশি সম্ভাব্য ক্রেতা ভিড় করে আছে। গোত্র অঞ্চলগুলো থেকে এসেছে আফ্রিকান নারীরা, পরনে লম্বা সুতির নকশা করা কাপড়, ধৈর্যের বাঁধ মনে হচ্ছে তর সইছে না, ল্যান্ড রোভারের দিকে তেমন মনোযোগই দিল না তারা। একজন তো আবার দাঁড়িয়েই বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে। মুখ থেকে নিপেল না সরিয়েই বাচ্চাটা তাকিয়ে রইল আগন্তুকের দিকে।
আঙ্গিনার মাঝখানে মোটা সোজা হয়ে উঠে গেছে একটা পোল। ১৫ লম্বা। এর মাথার কাঠের একটা বাক্স মতন। মনে হচ্ছে কুকুরের ঘর। অস্ফুট শব্দ বের হলো ডেভিডের গলা দিয়ে। কেননা বাক্সের মাঝে থেকে দেখা দিল বড়সড় বাদামী আর লোমশ একটা প্রাণী। এক লাফে নেমে এলো মাথা থেকে, একেবারে পাখির মতো হালকা চালে লাফ দিল পশুটা। পোলের এক মাথা থেকে পশুর গায়ের শিকলটা লাগানো হয়েছে আরেক মাথায়। কোমরে স্ট্রাপ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে।
এর মতো এত বড় বৃদ্ধ পুরুষ বেবুন আমি আর দেখিনি।
তাড়াতাড়ি ডেবরাকে এর বর্ণনা দিল ডেভিড। শিকল যতটুকু তার মাঝেই ঘুরে বেড়াচ্ছে বেবুন। পোলের চারপাশে ঘুরে ঘুরে মাটি কামড়াচ্ছে। শিকলের ঝনঝন শব্দ হচ্ছে তার পিছুপিছু। বোঝা গেল কতটা উদ্ধত তার স্বভাব। ঘাড়ের উপর উড়ছে ঘন কেশর। পোলের চারপাশে ঘোরা শেষ করে ল্যান্ড রোভারের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। মনে হলো মানুষের মত সব বুঝতে পারছে সে। ছোট বাদামী চোখ দুটো দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঝুলে গেল নিচের চোয়াল।
কদাকার পশু। ডেবরাকে জানাল ডেভিড। ওজন না হলেও নব্বই পাউন্ড। কুকুরের মতো লম্বা মুখ, মুখের চোয়াল ভর্তি হলুদ বিষদাঁত। হায়েনার পরে এটিই সবচেয়ে ঘৃণিত প্রাণী এ অঞ্চলে। চতুর, নিষ্ঠুর আর লোভী। মানুষের সব বদগুণ আছে এটার মাঝে, একটাও সদগুণ নেই। চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে রইল পশুটা আর প্রতি সেকেন্ডে অগ্নিমূর্তির মতো মাথা ঝাঁকাতে লাগল জটা।
ডেভিড যখন পুরো মনোযোগ দিয়ে বেবুনকে দেখছে এমন সময় দোকান থেকে বের হয়ে বারান্দার পিলারে দাঁড়াল একজন লোক।
‘আপনার জন্য আমি কী করতে পারি, মি, মরগ্যান? ঘন একরকম উচ্চারণে জিজ্ঞেস করল লোকটা। লম্বা গড়ন, পুরোপুরি পরিষ্কার নয় এমন দলা মোচড়া খাকি স্ন্যাকস পরে আছে লোকটা। শার্টের গলা খোলা, পায়ে ভারী জুতা, প্যান্টের সাথে লাগানো ব্রেস আড়াআড়ি ভাবে কাঁধে উঠে গেছে।
‘আমার নাম জানেন আপনি? চোখ তুলে লোকটার দিকে তাকাল ডেভিড। মধ্যবয়স্ক লোকটার গম্বুজাকতির মাথায় অল্প কিছু ধূসর চুল। উজ্জ্বল গোলাপি প্লাস্টিক গাম দিয়ে লাগানো দাঁত, গালের কাছে চামড়া উঠে গেছে। গভীরে বসানো চোখ দুটো দেখে মড়ার খুলির মতো দেখাচ্ছে তাকে। হাসি মুখে ডেভিডের দিকে তাকাল লোকটা।
‘একমাত্র আপনিই হতে পারেন ক্ষতচিহ্ন ভর্তি মুখ আর অন্ধ স্ত্রী, জাবুলানির নতুন মালিক। শুনেছি নতুন ঘর বানিয়ে পুরোপুরি বসবাস শুরু করেছেন।
মানুষটার হাতগুলো বিশাল। পুরো শরীরের তুলনায় বোঝা গেল ও দুটোই বেশি শক্তিশালী। আর কব্জির চিকন রগগুলো দেখে বোঝা গেল ওগুলো দড়ির চেয়েও বেশি শক্ত।
পিলারের গায়ে হেলান দিয়ে পকেট থেকে ছুরি বের করল সাথে কালো শুকনো মাংস উত্তর আমেরিকার জার্কি, ক্যারিবিয়ার বোকন অথবা আফ্রিকার বিলটং যেকোন কিছুই হতে পারে। এমন ভাবে এক টুকরো কেটে নিল যেন তামাকের টুকরা, পুরে দিল মুখে।
