গুড ইভনিং, মি. স্টিভেন। আপনার ড্রাইভার আপনাকে নিতে এসেছে, রিসেপশন ডেস্ক থেকে একটা মেয়ে কথা বলছে।
ধন্যবাদ। ওকে বল আমি আসছি।
শুরু হলো ব্যাপারটা। এর শেষ কোথায় পিটারের জানা নেই। মস্ত ঝুঁকি নিয়েছে সে। জানে, এছাড়া কোনো উপায় ছিল না। কাপড় পরে আগেই তৈরি হয়ে ছিল, কাবার্ডে ব্রিফকেসটা ভরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
এখনো সঠিক বলা যাচ্ছে না কোথায় যাচ্ছে ও। হয়তো খলিফার কাছে নয়, ব্যারনেসের লিয়ারের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে ওকে। হয়তো ব্যারনেস রিপোর্ট করার পর তাকে বন্দী করেছে মোসাড, পিটারকে নিয়ে যাবার জন্যে ড্রাইভার পাঠিয়েছে।
ডেস্কের সুন্দরী মেয়েটা ওকে বলল, আপনার গাড়ি বাইরে অপেক্ষা করছে, স্যার। হ্যাভ এ নাইস ইভনিং।
আই হোপ সো, বলল পিটার। ধন্যবাদ।
ছোট একটা জাপানী গাড়ি, ড্রাইভার একটা মেয়ে। পিটারকে হেঁটে আসতে দেখে সবিনয়ে হাসল সে, চেহারায় বন্ধু বন্ধু ভাব। পিছনের সীটে উঠল পিটার, অপেক্ষা করে আছে কখন শুনতে হবে, ব্যারনেস পাঠিয়েছে আমাকে।
তার বদলে মেয়েটা সালোম, সালোম, বলল ওকে, হেডলাইট জ্বেলে ছেড়ে দিল গাড়ি।
.
পুরানো শহর ঘিরে থাকা পাচিলের বাইরের দিক ঘেঁষে ছুটে চলেছে গাড়ি। দিনের আলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। রাস্তায় লোক চলাচল কম, যানবাহন আরো কম। এদিকের রাস্তা ঢালু হয়ে নেমে গেছে কিরন উপত্যকায়। ঘাড় ফিরিয়ে পিছন দিকে একবার তাকাল পিটার। পাঁচিলের ভেতর পুরানো শহরের আকাশছোঁয়া অ্যাপার্টমেন্ট ভবনগুলো দেখা গেল। পবিত্র নগরীতে একটুর জন্যে খুন হয়ে যাচ্ছিল
হাসল মেয়েটা, কিন্তু উত্তর দিল হিব্রুতে। ফ্রেঞ্চ ভাষায় একই প্রশ্ন করল পিটার, ফলাফল শূন্য। তার মানে, ভাবল পিটার, কথা বলতে নিষেধ করা আছে।
অলিভস পাহাড়ের নিচে পৌঁছুতে রাত হয়ে গেল, একটু পর আরব বসতির শেষ চিহ্নটা পেছনে ফেলে এল ওরা। রাস্তা ফাঁকা হলেও চল্লিশের ওপর স্পীড তুলল না মেয়েটা। অন্ধকার, অল্প নিচু একটা উপত্যকায় নেমে এল গাড়ি, চওড়া কংক্রিটের রাস্তার দুপাশে পাহাড়, পাহাড়ের দুপাশে ধূ-ধূ মরুভূমির আভাস।
খোলা আকাশে মেঘ নেই, মেলা বসেছে তারাদের।
শহর ছাড়ার পর রাস্তার পাশে খানিক পর পর সাইনপোস্ট দেখা গেল। পূর্বে জর্দান, ডেড সী, আর জেরিকোসেদিকেই যাচ্ছে ওরা। পঁচিশ মিনিট পর হেডলাইটের আলোর আরেকটা সাইনপোস্ট দেখল পিটার হাতের ডান দিকে ইংরেজি, আরবি, আর হিব্রুতে লেখা। সী লেভেলের নিচে নামছে এখন ওরা, ডেড সীর উপত্যকায়।
মেয়েটাকে আরেকবার কথা বলাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো পিটার। নিজেকে সান্ত্বনা দিল এই বলে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানার কথা নয় তার। গাড়িটা কোনো রেন্ট এ-কার কোম্পানি থেকে ভাড়া করা, ড্যাশবোর্ডে নাম লেখা রয়েছে। তবে গন্তব্য সম্পর্কে জানে মেয়েটা। একটু পর ও নিজেও জানতে পারবে।
সামনে একটা সতর্কীকরণ সঙ্কেত দেখা গেল, সামনে ক্রসরোড। স্পীড কমিয়ে বাঁ দিকে বাঁক নেয়ার সিগনাল দিল ড্রাইভার। হেডলাইটের আলো পড়ল সাইনপোস্টে, জেরিকা রোড ধরছে ওরা, ডেড সী পিছনে থেকে যাচ্ছে। উত্তর দিকে যাচ্ছে ওরা, জর্দান উপত্যকা গ্যালিলির দিকে।
পাহাড়ের মাথার ওপর ষাঁড়ের শিং আকৃতি নিয়ে চাঁদ উঠল। আবার গাড়ির স্পীড কমাল ড্রাইভার, জেরিকো শহরের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে ওরা। দুনিয়ার সবচেয়ে পুরানো মানববসতি। এখানে ছয় হাজার বছর ধরে বাস করছে মানুষ, তাদের পরিত্যক্ত আবর্জনা মরু সমতলকে কয়েকশ ফিট উঁচু করে তুলেছে। বিধ্বস্ত পাঁচিলগুলো আবিষ্কার করেছে আর্কিওলজিস্টরা।
মেইন রোড ছেড়ে বাক নিল ড্রাইভার। রাস্তার দুপাশে বেশিরভাগ অ্যান্টিকসের দোকান, কিছু ক্যাফেও আছে, সব আরবদের। লোকালয় ছাড়িয়ে পাহাড়ি পথ ধরল ওরা, তারপর মেঠো পথে নেমে এল। পাউডারের মতো ধুলো ঢুকল ভেতরে, হাঁচি পেল পিটারের।
আধমাইল সামনে পথটা দুভাগ হয়ে গেছে, ডান দিকেরটায় একটা সাইনবোর্ড নিষিদ্ধ এলাকা, মিলিটারি জোন। কিন্তু কোনো গার্ড নেই, সাইনবোর্ডটাকে আগ্রহ করে ডান দিকের পথেই গাড়ি চালাল সে।
হঠাৎ করেই আকাশ ঢাকা বিশাল উঁচু একটা পাঁচিল দেখতে পেল পিটার–কালো, চওড়া। অর্ধেক আকাশ ঢেকে সামনে ওটা খাড়া একটা পাহাড়।
আরো পাঁচশ গজ এগিয়ে গাড়ি থামাল ড্রাইভার, ক্যাবের আলো জ্বালল। ঘাড় ফিরিয়ে পিটারকে এক মুহূর্ত দেখল মেয়েটা। একটু কি করুণা ফুটল দৃষ্টিতে?
এখানেই, অস্ফুটে বলল সে।
ব্লেজারের ভেতরের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল পিটার।
না, আবার ইংরেজিতে বলল মেয়েটা। আপনার কোনো ঋণ নেই।
টোডা রাবা, ভাঙ্গা হিব্রুতে তাকে ধন্যবাদ দিল পিটার, দরজা খুলে নেমে পড়ল নিচে।
মরুর বাতাস স্থির কিন্তু হিম-শীতল, কাঁটাঝোঁপ থেকে বুনো ফুলের বিশ্রী গন্ধ আসছে।
সালোম, খোলা জানালা দিয়ে পিটারের দিকে তাকিয়ে বিদায় জানাল মেয়েটা, দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরতি পথে চলে গেল। গাড়ির নাক ঘোরার সময় হেডলাইটের আলোয় সামনে পাম গাছের ঝাড় দেখতে পেল পিটার।
গাড়ির টেইল লাইট অদৃশ্য হয়ে গেল। সেদিকে পিছন ফিরল পিটার। নির্জন মরুতে একা ওকে ফেলে রেখে গেল নাকি? চাঁদ আর তারার আলোয় বেশিদূর দেখা গেল না। দৃষ্টিপথে বাধা হয়ে আছে পাম ঝাড়। কোথায় থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে ধীরপায়ে এগোল পিটার, পাম ঝাড়ের ভেতর ঢুকে পোড়া পোড়া একটা গন্ধ পেল, খানিক দূরে গাছের মাথায় ক্ষীণ নীলচে ধোয়ার আভাস। ঝড়ের বাইরে, ওদিকে কোথাও থেকে একটা ছাগল ব্যা করে উঠল। তারপর ঝাঁকিয়ে কেঁদে উঠল একটা শিশু।
