তাদের ভালোবাসা এতোটাই দৃশ্যত ছিল যে তা তাদের চারপাশে একটা প্রভাব ছড়িয়ে দিল। এবং যখনই তারা একত্রিত হতো তারা মুচকি হাসত ও অনেক আনন্দ করত। যখন নেফারের রথ থেবসের রাস্তা দিয়ে চলত সে মিনটাকাকে পাদানিতে তার বর্শা বাহক হিসেবে নিত, তার কালো চুল বাতাসে ব্যানারের ন্যায় উড়ত। সতী স্ত্রীরা তাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতো এবং পুরুষেরা তাদের দিকে চেয়ে হাসত ও শুভ কামনা জানাতো। এমন কি নাজাও তাদের দেখে সদয়ভাবে হাসত, কিন্তু কেউ জানতো না এর আড়ালে সে কি ভয়ংকর নীল নক্সা আঁটছে।
শিকারী দলে, বনের পিকনিকে ও প্রাসাদের ভোজে একমাত্র টর্ক ছিল গম্ভীর লোক।
একত্রে তাদের সময় দ্রুত কাটতে লাগল।
সব সময়ই আমাদের পাশে শুধু মানুষ জনের ভীড়, নেফার বাও খেলার সময় তার কানের কাছে ফিস্ ফিস্ করে বলল। এক মুহূর্তের জন্য হলেও আমি তোমার সাথে একা সময় কাটাতে চাই। তোমার চলে যাবার আর মাত্র তিন দিন বাকি। তারপরই তুমি তোমার পিতার সাথে অ্যাভারিস ফিরে যাবে। তারপর মাস, এমন কি বছরও গড়াতে পারে তোমার সাথে আবার আমার সাক্ষাৎ হতে। অথচ তোমাকে বলার আমার এতোকিছু রয়েছে যা এতোগুলো চোখ ও কানের সামনে বলা সম্ভব নয় যেগুলো আমাদের উপর তাক করা তীরের ন্যায় লক্ষ্য স্থির করে আছে।
সে কেবল মাথা নাড়ল। তারপর মিনটাকা তার আরো কাছে এসে ফিসফিস্ করে মজাচ্ছলে বলল, মহামান্য, যদি আমি আপনার সাথে একা যাই তবে আপনি যে আমার সম্মান হানির কারণ হবেন না তার প্রমাণ কী?
আমি মহান হুরাসের কসম খেয়ে বলছি, অন্তত আমি বেঁচে থাকতে তোমার সম্মানে আঘাত হানে এমনটা কখনও হবে না, সে আন্তরিকভাবে বলে উঠল।
সে তার উদ্দেশ্যে তখন হেসে বলল, আমার ভাইয়েরা তা শুনে খুব বেশি খুশি হবে না। তোমার গলা কাটার জন্যে তাদের যে কোন কারণই যথেষ্ট। সে তার দিকে চেয়ে তার চমৎকার কালো চোখ টিপল। অথবা, গলা না পেলে তোমার দেহের অন্য যে কোন অংশও তাদের সন্তুষ্ট করবে।
পরদিনই তাদের সুযোগটা এল। একজন রাজ বাজ শিকারী ডাব্বা গ্রামের পাহাড় থেকে এসে রিপোর্ট করল যে একটা সিংহ পুবের বন থেকে বেড়িয়ে এসেছে এবং রাতের বেলা গবাদি পশু হত্যা করেছে। এটা বেড়ার ভেতরে লাফিয়ে পড়ে ও ভীত জম্ভগুলোর আটটাকে হত্যা করেছে। ভোর বেলা গ্রামবাসীরা মশাল জ্বালিয়ে, বাঁশি বাজিয়ে, ঢোল পিটিয়ে এবং বন্যভাবে চিৎকার করে ওটাকে তাড়ায়।
এটা কখন ঘেটেছে? নাজা প্রশ্ন করল। তিন রাত আগে, মহানুভব। লোকটি সিংহাসনের কাছে গভীর শ্রদ্ধার মাথা নত করে মাটিতে বসল। উজান থেকে আমি যতো তাড়াতাড়ি পেরেছি এসেছি কিন্তু স্রোত খুব শক্তিশালী এবং বাতাসও অনুকূল ছিল। পশুটার কি হয়েছে? রাজা অ্যাপেপি ব্যাকুলভাবে বাধা দিল।
এটা পাহাড়ে ফিরে গেছে কিন্তু আমি আমার সবচাইতে দক্ষ দুজন নুবিয়ান চিহ্ন বিদকে ওটাকে অনুসরণ করতে পাঠিয়েছি।
কেউ কি জন্তুটাকে দেখেছে? কতো বড় এটা? সিংহ নাকি সিংহী?
গ্রামবাসীরা বলে যে এটা একটা বড় পুরুষ সিংহ, পূর্ণ কেশ সহ, মোটা ও কালো।
গত ৬০ বছর ধরে নদী বরাবর ভূমিতে সিংহের কথা শোনা যায় নি। একদা সিংহ শিকার ছিল রাজকীয় খেলা এবং তারা পূর্ববর্তী ফারাওদের নির্মম শিকার হয়েছে কারণ হিসেবে তারা যে শুধু কৃষকের মজুদ খাদ্যই নষ্ট করত তা নয়, রাজশিকারে তারা সবচাইতে অপ্রতুল পুরস্কার ছিল।
হিকস্ম যুদ্ধের দীর্ঘ, তিক্ত সময়ে দুই রাজ্যের ফারাওরা ব্যস্ত ছিল এবং তখন কদাচিৎ সিংহ শিকার করা হয়েছে। সেই সাথে যুদ্ধের ময়দানে মানুষের মৃত দেহ তখন সিংহদের খাদ্য যুগিয়েছে। গত কয়েক দশকে তারা বিস্তৃত হয়েছে এবং তাদের সংখ্যাও নিশ্চিত অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই সাথে তাদের শক্তিও।
আমি এখনই নৌকায় রথ তুলতে বলবো। অ্যাপেপি সিদ্ধান্ত নিল। নদীর সহযোগে কাল ভোরে আমরা ডাব্বা পৌঁছে যাব। সে তার তলোয়ার বের করে পুনরায় সজোরে খাপে ভরল। সেথের নামে আমি এই বৃদ্ধ কালো কেশরের সাথে একটা সুযোগ নিতে চাই। যখন থেকে আমি মিশরীয়দের হত্যা করা ছেড়ে দিয়েছি তখন থেকেই আমি প্রকৃত খেলার জন্যে ক্ষুধার্ত হয়ে আছি।
নাজা তার দিকে কুটি করে তাকাল, মহামান্য, আগামী পরশু আপনার অ্যাভারিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কথা।
আপনি ঠিক বলেছেন, রাজ-প্রতিভূ। যাই হোক। বেশির ভাগ মালপত্র ইতোমধ্যে তোলা হয়ে গেছে এবং নৌযান ছাড়ার জন্যে প্রস্তুত, অধিকন্তু ডাব্বা আমার যাত্রা পথেই পরবে। আমি একদিন বা দুদিন শিকারের চেষ্টা করব।
নাজা ইতস্তত করল। শিকারের প্রতি তার খুব একটা আসক্তি ছিল না। রাজ্যের অসংখ্য কাজ যা তার জন্যে জমে আছে, তা রেখে যেতে তার ইচ্ছে নেই। সে সামনে অ্যাপেপির গমনের দিকে তাকাল; থেবসে তার অমার্জিত, অশোভন উপস্থিতি বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। তার আরো একটি পরিকল্পনা এগিয়ে আছে যা অ্যাপেপি একবার থেবস্ ত্যাগ করলেই কেবল এগুনো যাবে। এখনো সে হিক ফারাওকে উচ্চ রাজ্যে একা শিকার করতে দিতে পারে না। দক্ষিণের রাজ্যে অ্যাপেপিকে এমনভাবে ব্যবহার করতে দেয়াটা শুধু অভদ্রতাই হবে না অরাজনৈতিকও হবে। সবাই বুঝবে যে এখানেও তার একই ক্ষমতা আছে।
মহামান্য, নাজা পুরোপুরি খারিজ করার পূর্বেই নেফার কথা বলল, আমরা অনেক আনন্দ নিয়েই শিকারে যোগ দেবো। সে একটা চমৎকার খেলার সুযোগ দেখল কারণ সে কখনো তার রথ দ্বারা কোন সিংহকে তাড়া করার সুযোগ পায় নি এবং নিজের সাহসও যাচাই করতে পারেনি। তবে তার চাইতে একশগুণ গুরুত্বপূর্ণ হল শিকার হয়তোবা মিনটাকার দুঃখের বিদায় দেরি করিয়ে দেবে। এ আনন্দের উপলক্ষ্য হয়তো তাদের একটা সুযোগ দিবে যা এতোদিন তারা পায় নি অন্তত একাকী কিছু মুহূর্ত কটাতে পারলেও পারতে পারে তারা। নাজা তাকে প্রতিরোধ করার পূর্বেই নেফার শিকারীর দিকে ঘুরল যে এখনো কাল টাইলসের মেঝেতে চেপে পড়ে আছে। খুব ভালো, আমার প্রিয় অনুসারীরা, রাজ-সরকার তোমাকে তোমার কষ্টের জন্যে একটা স্বর্ণের আংটি দেবে। আমাদের যানের সবচাইতে দ্রুতটায় করে এক্ষণি ডাব্বায় ফিরে যাও। আমাদের আগমনের প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আমরা পূর্ণ শৃংখলভাবে এ পশুর পিছনে ছুটব।
