টাইটা পাহাড়ের চূড়াগুলো এড়িয়ে গেল যেন দূর থেকে আকাশ সীমায় তাদের ছায়ামূর্তির কারো চোখে ধরা না পড়ে এবং উপত্যকা ও গিরিখাদের মধ্য দিকে একটা পথ ধরে এগিয়ে চলল। সে সব সময় পূর্বদিক বরাবর এগুতে থাকল, মিশর ও নীল নদ থেকে দূরে সাগরের দিকে।
তাদের লাগাম টানার আগেই সূর্য অস্ত গেল এবং সে বলল, প্রধান বহরটা ঠিক পরবর্তী পাহাড়ের সারির পরেই রয়েছে। আমাদের অবশ্যই এটা পার হতে হবে, কিন্তু শত্রুরা হয়তো সেখানে আমাদের খুঁজছে।
একটা লুকানো ওয়াদির মধ্যে তারা ঘোড়াগুলোকে বাঁধল এবং যথেষ্ট পরিমাণ ঘাস তাদের জন্যে রেখে গেল। তারপর তারা সাবধানে পাহাড়ের চূড়ায় উঠল এবং একটা আড়াল খুঁজে পেল যা ছিল রক্তাক্ত বর্ণের এক সারি কোমল শিলার পিছন দিক এবং সেখান থেকে নিচের রাস্তার গাড়ির বহর তারা দেখতে পারবে।
অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানে থাকব, টাইটা ব্যাখ্যা করল। তারপর পার হব।
আমি বুঝতে পারছি না তুমি কি করছ, টাটা। আমরা কেন পূর্ব দিকে যাচ্ছি? আমরা কেন থেবসে ফিরছি না, এবং আমার পিতার ফারাও-এর নিরাপত্তায়?
টাইটা একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং চোখ বন্ধ করল। আমি কিভাবে তাকে বলি? আমি আর বেশিক্ষণ এটা লুকিয়ে রাখতে পারব না। এখনও সে একটা বাচ্চা এবং আমাকে তাকে রক্ষা করতে হবে।
নেফার যেন তার ভাবনা পাঠ করতে পারল। সে তার হাত টাইটার বাহুতে রাখল এবং শান্তস্বরে বলল, আজ পর্বতের উপর আমি প্রমাণ দিয়েছি যে আমি একজন যুবক পুরুষ। আমাকে প্রাপ্ত বয়স্ক মনে কর।
টাইটা মাথা নাড়ল। প্রকৃতই, তুমি তা করেছ। পুনরায় কিছু বলার পূর্বে সে একবার নিচের রাস্তার দিকে আরেকবার তাকাল এবং তৎক্ষণাৎ তার মাথা নামাল, কিছু আসছে! সে সতর্ক করল।
শিলার পিছনে নেফার নিজেকে দেয়ালের সাথে সেঁটে দিল এবং দেখল ধুলার সারি দ্রুত পশ্চিম দিক থেকে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। এরই মধ্যে পুরো উপত্যকায় গভীর ছায়া নেমে এসেছে এবং আকাশ সূর্যাস্তের সোনালি স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।
তারা দ্রুত আসছে। মনে হচ্ছে কোন বণিক দল নয়, যুদ্ধ রথের সারি। নেফার বলল। হ্যাঁ, আমি তাদের এখন দেখতে পারছি। তার তরুণ উজ্জ্বল চোখগুলো প্রথম রথটা দেখল যার জোড়া ঘোড়াগুলো উঁচু বাহনে বসা রথীকে নিয়ে দুলকি চালে চলছে। তারা হিকস্ নয়। সে বলল। আরো কাছে এলে তা স্পষ্ট হল, এগুলো তো আমাদের। দশটা রথের একটা বহর। হ্যাঁ! প্রথম রথের পতাকা দেখো। ফেট গার্ডের একটা দল। আমরা নিরাপদ। টাইটা!
নেফার পায়ের উপর দাঁড়াল এবং দুই হাত মাথার উপর উঠিয়ে নাড়তে লাগল। এখানে! সে চেঁচাল। এখানে, নীলেরা। এখানে আমি। আমি প্রিন্স নেফার।
টাইটা তার হাড্ডিসার হাতটা উঠিয়ে ভয়ংকর ভাবে টান দিয়ে তাকে বসিয়ে দিল। বসে পড়ো, বোকা কোথাকার। তারা কোবরার দাস।
সে তীরের দিকে আর এক ঝলক তাকাল এবং দেখল যে আগের রথ ঠিকই তাদের দেখতে পেয়েছে কারণ ওটার রথ চালক জোড়া ঘোড়াগুলো পিটিয়ে তাদের দিয়ে ঘুরিয়ে দিল।
এসো! সে নেফারকে বলল। দ্রুত! তারা যেন আমাদের ধরতে না পারে।
বালকটিকে টেনে সে অপর প্রান্তে নিয়ে এল এবং ঢাল বেয়ে নিচে নামতে লাগল। প্রথম দিকে নেফার নারাজ থাকলেও, পরে সে টাইটার সাথে দ্রুত চলল। সে নিজের ইচ্ছায় দৌড়াতে শুরু করল, পাথরের পর পাথরে লাফ দিতে লাগল, তবুও বৃদ্ধ লোকটির নাগাল ধরতে পারল না। টাইটার হাড্ডিসার সরু পাগুলো যেন উড়ে চলছিল এবং তার পিছনের রূপালি চুল ঝর্ণার ন্যায় ঢেউ খেলে দুলতে লাগল। সর্বাগ্নে সে ঘোড়ার নিকট পৌঁছে এক লাফে নিজের মাদী ঘোড়াটার উপর চেপে বসল।
আমি বুঝতে পারছি না কেন আমরা আমাদের নিজেদের লোকজন থেকে দূরে ভাগছি। নেফার হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল। কি হচ্ছে, টাটা?
আগে ঘোড়ায় চাপো। এখন কথা বলার সময় নেই। আমাদের আগে এখান থেকে সরে যেতে হবে।
তারা ওয়াদির মুখ দিয়ে বেড়িয়ে যখন ভোলা স্থানে এল, নেফার তার কাঁধের উপর দিয়ে পিছনে তাকাল। প্রথম রথটা পবর্তের উঁচু স্থান পেরিয়ে দ্রুত আসছে এবং চালক জোড়ে চিৎকার করছে। কিন্তু দূরত্ব ও চাকার আওয়াজে তার কণ্ঠ চাপা পড়ল।
টাইটা সামনে থেকে একটা ভাঙা আগ্নেয় পাথরের মধ্য দিয়ে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে চলল যেখান দিয়ে কোথ রথের পক্ষে এগুনো সম্ভব নয়। ঘোড়াগুলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লম্বা পা ফেলে দ্রুত চলতে লাগল।
যদি আমারা পাথরের মধ্যে থাকি তাহলে রাতের মধ্যেই আমরা তাদের হারাবো। দিনের আর অল্প আলোই বাকি আছে। টাইটা সূর্যের শেষ রশ্মির দিকে তাকাল যা ইতোমধ্যে পশ্চিমের পাহাড়ের পিছনে ডুব দিয়েছে।
সবসময় একজন ঘোড়া চালক একটাই রথ চালায়। নেফার বলল আত্ম বিশ্বাসের সাথে, যা সে প্রকৃতপক্ষে অনুভব করে না। কিন্তু যখন সে তার কাঁধের উপর দিয়ে আবার পিছনে তাকাল সে দেখল তা সত্যি। তারা রথগুলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
নেফার ও টাইটা ভগ্ন প্রান্তরটায় পৌঁছানোর পূর্বে রথগুলো এতো পিছনে পড়ে গেল নিজেদের ধুলো আর সন্ধ্যার নীলে তাদের আর ঠিকমতো দেখা গেল না।
পাথরের শেষ প্রান্তে পৌঁছে ঘোড়াগুলোকে তারা সতর্কতার সাথে চালাতে বাধ্য হল। কিন্তু পদক্ষেপ এতো বিপদ সংকুল এবং আলো এতো কম যে তাদের হাঁটতে হল। আলোর শেষ ঝলকে টাইটা পিছন তাকাল এবং দেখল জঘন্য রাস্তার প্রান্তে অগ্রবর্তী রথের গাঢ় মূর্তি দাঁড়িয়ে। সে চালকের কণ্ঠ চিনতে পারল। লোকটি তার উদ্দেশ্যে চেঁচাচ্ছিল, শব্দগুলো ক্ষীণ শোনাল।
