মুহূর্তখানেকের জন্যও ভুলতে পারে না ভয়ংকর সেই দিন, যেদিন নীল আফ্রিকান আকাশের নিচে তার হাতের মাঝেই মৃত্যুবরণ করেছে অনিন্দ সুন্দরী সে কৃষাঙ্গ দাসী। যার কথা ছিল তার স্ত্রী হবার। তাকিয়ে দেখেছে ভালোবাসার জনের মৃত্যু। এরপর দেহ ঠাণ্ডা হবার আগেই বুকের বুলেটের ক্ষতের মাঝে আঙুল ঢুকিয়ে প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা করেছে। রালেই তাবাকা’র প্রাণশক্তিই আসে এ ঘৃণা থেকে।
টেবিলের ওপাশে থাকা সাদা মুখগুলোকে দেখে নিয়ে নিজের ঘৃণা থেকে শক্তি সঞ্চয় করলেন তাবাকা। “তো” আবারো শুরু করল, “ঠিক হল যে মেয়েটা আপনার দায়িত্ব। এখন চলুন বাকি…”
“এক মিনিট” রালেইকে থামিয়ে দিয়ে সিসেরোর দিকে তাকাল রামোন, “যদি আমি লাল গোলাপ’কে যদি এগোতে চাই তাহলে অপারেশনের বাজেটের প্রশ্নও এসে যায়।”
“এরই মাঝে দুই হাজার ব্রিটিশ স্টালিং দেয়া হয়েছে প্রতিবাদ জানালেন সিসেরো। “প্রাথমিকভাবে যথেষ্ট ছিল। তবে আরো বাড়াতে হবে। ধনী পুঁজিবাদের কন্যা এই মেয়ে, তাকে মুগ্ধ করার জন্য আমাকেও স্প্যানিশ যুবরাজের ভূমিকা পালন করতে হবে।
আরো কয়েক মিনিট ধরে দু’জনে কথা কাটাকাটিই করে চলল। টেবিলের উপর অধৈৰ্য্যভাবে পেন্সিলের টোকা দিয়ে চললেন তাবাকা। আফ্রিকান ডিভিশন হচ্ছে সিনডারেলার মতো, তাই প্রতিটি রুবল হিসাব করে খরচ করতে হবে।
রালেই’র মনে হলো এদের হাউকাউ শুনে যে কারো বোধ হবে যে ধূলিমাখা আফ্রিকান কোনো রাস্তার পাশে কুমড়া বিক্রি করছে এক জোড়া বৃদ্ধা। কিছুতেই মাথায় আসবে না যে শক্রর রাজত্ব ধ্বংস করে পনের মিলিয়ন নিগৃহীত আফ্রিকান আত্মাকে মুক্তি দিতে চাইছে দুই পুরুষ।
অবশেষে দুজনে একমত হলো। তাই আবারো যখন কথা বলে উঠলেন, কণ্ঠের উষ্মা লুকাতে পারলেন না তাবাকা, “আচ্ছা এবার কি আমরা আমার আফ্রিকা টুারের ভ্রমণ বৃত্তান্ত নিয়ে কথা বলতে পারি?” তার ধারণা ছিল যে আজকের মিটিং এর মুখ্য উদ্দেশ্য এটাই। “মস্কো থেকে গ্রীন সিগন্যাল পাওয়া গেছে?”
আলোচনা শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে গেল। কাজ করতে করতে কনস্যুলেট ক্যান্টিন থেকে পাঠানো খাবার দিয়ে লাঞ্চ সেরে নিল তিন জনে। আর অনেক উপরের একটা মাত্র জানালা দিয়ে হারিয়ে গেল জো সিসেয়োর সিগারেটের ধোঁয়ার মেঘ। একেবারে উপরের তলায় হাই সিকিউরিটিতে মোড়া রুমটাকে নিয়মিত পরিস্কার রাখা হয় ইলেকট্রনিক লিসনিং ডিভাইসের হাত থেকে বাঁচাতে। বাইরের কড়া নজরদারির বিপক্ষে সেফ হাউজের মতো কাজ করে এ কক্ষ।
অবশেষে সামনে রাখা ফাইলটাকে বন্ধ করে উপরের দিকে তাকাল জো সিসেরো। ধোয়ার জ্বালায় লাল টকটকে হয়ে গেছে কালো চোখ জোড়া। “আমার মনে হয় আর নতুন কিছু না থাকলে প্রতিটা পয়েন্ট নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। তাই না?”
মাথা নাড়ল বাকি দুজনে।
“সবসময়কার মতো কমরেড মাচাদো আগে যাবে। প্রাথমিকভাবে এ নিয়ম কঠোরভাবে পালন করা হয় যেন জনসমক্ষে তাদেরকে একসাথে না দেখা যায়।
বিল্ডিং এর সবচেয়ে ব্যস্ত অংশ ভিসা সেকশনের প্রবেশ পথ দিয়ে কনস্যুলেট থেকে বের হয়ে এলো রামোন; সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নে বর্তমানে পড়তে যেতে আগ্রহী এমন হাজারো ছাত্র আর পর্যটকের ভিড়ের মাঝে তাকে কেউ খেয়ালই করবে না।
দেয়াল ঘেরা কনস্যুলেটের ঠিক বাইরেই আছে বাস স্টপ। ৮৮ নম্বর বাসে চড়েও পরের স্টপেজে নেমে গিয়ে দ্রুত পায়ে ল্যাঙ্কাস্টার গেইট দিয়ে কেনসিংটন গার্ডেনে চলে গেল। রোজ গার্ডেনে দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ পর্যন্ত না নিশ্চিত হল যে তাকে কেউ অনুসরণ করছে না। তারপর পার্ক পার হয়ে চলে গেল।
কেনসিংটন হাই-স্ট্রিট থেকে বাইরে চিকন একটা গলির মাঝে রামোনের ফ্ল্যাট। লাল গোলাপ অভিযানের জন্যই বিশেষভাবে ভাড়া নেয়া হয়েছে। সিঙ্গল বেডরুম হলেও লিভিং রুমটা বেশ প্রশস্ত আর পাড়াটাও কেতাদুরস্ত।
মাত্র দুই সপ্তাহ হলেও ফ্ল্যাটটাকে এরই মাঝে বেশ সাজিয়ে নিয়েছে রামোন যেন বহুকাল ধরেই আছে এখানে। ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে করে কিউবা থেকে চলে এসেছে ওর ব্যক্তিগত সিন্দুক। এর মাঝে আছে বাবার রেখে যাওয়া কয়েকটা চমৎকার ছবি আর ছোট-খাট আসবাব : যেমন রুপার ফ্রেমে আটকানো পিতা-মাতাসহ ফ্যামিলি পিকচার, আন্দালুসিয়াতে কাটানো সুখের দিনগুলোতে পারিবারিক এস্টেট আর দুর্গের ছবি। কাঁচ আর পোর্সেলিনের সেটগুলো পুরোপুরি না থাকলেও মাচাদো পদবী আঁকা আছে এখনো। লাল গোলাপ সম্পর্কে যতটা জেনেছে, মেয়েটা এসব জিনিস বেশ খেয়াল করে।
যাই হোক তাড়াতাড়ি করতে হবে। ভারী আর ঘন দাড়ি বেশ দ্রুত গজায়। তাড়াতাড়ি কিন্তু সাবধানে শেভু করে চুল থেকে জো সিসেরো’র তার্কিশ সিগারেটের গন্ধ মুছে স্নান করে নিল রামোন।
বেডরুমে গিয়ে আপনাতেই চোখ চলে গেল আয়নাতে। তিন সপ্তাহ আগে রাশিয়া থেকে ফেরার পর স্বাস্থ্য ছিল অত্যন্ত চমৎকার। কৃষ্ণ সাগরের তীরে কেজিবি ট্রেনিং কলেজের সিনিয়র অফিসারদের জন্য রিফ্রেশার কোর্সটা সুঠাম করে তৈরি করে দিয়েছে তার দেহ। তারপর থেকে তেমন একটা শারীরিক কসরৎ না করা হলেও অভাব এখনো চোখে পড়ছে না। শক্ত আর পাতলা গড়নে সমান পেট, কোকড়ানো কালো পশম। কোন রকম অহমিকা ছাড়াই নিজ প্রতিবিম্ব খুঁটিয়ে দেখে নিল রামোন। অনিন্দ সুন্দর দেহ আর মুখশ্রী একে অপরের সাথে চমৎকারভাবে খাপ খেয়ে গেছে; কার্য উদ্ধারের জন্য এই অস্ত্রের জুড়ি নেই। যোদ্ধা যেমন তার অস্ত্র ভালোবাসে তেমনি ভাবেই নিজের এ অংশকে কাজে লাগায় সে।
