ট্রোম্পকে অবাক করে দিয়ে অস্ত্র পছন্দের ভারটা তার ওপরই ছেড়ে দেয় পেট। “আমার পিস্তল হলেই চলবে।” ট্রাম্প জানালো।
“আমি তোমার সিদ্ধান্ত নেয়া দেখে অবাক হয়েছি।” অবাক হয়ে বলল হাল। “আমি তোমার তলোয়ার যুদ্ধ দেখেছি। ওটাতে তুমি বেশ ভাল। কিন্তু যেহেতু তুমি বন্দুক বেছে নিয়েছ সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা তোমার জন্য একটু কঠিন হয়ে গেল।”
“ব্যাপারটা হচ্ছে, আমি জানি যে আমি তলোয়ার যুদ্ধে বেশ ভাল। সেক্ষেত্রে একটা সমস্যা আছে। আমি যদি তলোয়ার নিয়ে সামনা সামনি যুদ্ধ করি তবে মাথা মোটা পেটকে হত্যা না করে থাকাটা আমার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু অস্ত্র হিসেবে পিস্তল খুব একটা নির্ভরযোগ্য নয়। সমতল ভূমিতে যে কোনো দূরত্বে পিস্তল দিয়ে লক্ষ্যভেদ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু সাগরের ওপর দোদুল্যমান জাহাজে লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছ থেকে গুলি করে টার্গেটে লাগাতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার। যদি পেট আমাকে হত্যা করেই ফেলে তবে অবশ্যই মানতে হবে যে ঈশ্বর ওর পক্ষে ছিল। কে জানে, আমার সেসব ধর্মীয় ধ্বংসাবশেষ নিয়ে হয়তো বা তিনি মোটেই সন্তুষ্ট নন।”
হাল হাসতে লাগল। সমস্ত বদমায়েশী কাণ্ডকারখানার পরও হাল-এর কাছে ট্রোম্প ঠাণ্ডা, পাণ্ডুবর্ণ ও রক্তহীন পেট-এর চাইতে অধিক পছন্দের মানুষ। তবে পেট-এর অনুভূতি যেরূপই হোক না কেন তাকে অন্তত কাপুরুষ বলা যায় না। পিস্তল হাতে ডেক-এর ওপর যেভাবে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে তাতেই বোঝা যায় যে তার তেজ বা সংকল্পে কোনো ভীরুতা নেই।
ক্যাপ্টেন ট্রাম্প-এর নিজের লোকেরা স্টারবোর্ড-এর রেলিং-এর পাশে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের গোড়ালিতে শেকল পরানো আছে। ট্রোম্প তার নিজের লোকদের উদ্দেশ্য করে বলল যে, “সে যদি এই ইংরেজটার খুলিকে ফুটো করতে পারে তবে সে তাদের হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনতে পারবে। এই কথা শোনার পর ট্রোম্প-এর কিছু লোক চিৎকার করে উঠে, বাকিরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
“এই লোক তো এখনই ঘামছে!” র্যালফ বিগ নামে একজন অভিজ্ঞ সৈনিক ট্রোম্পকে উদ্দেশ্য করে বিদ্রূপ করে উঠে।
“আরে তাই তো! ওর শরীর ঘামে ভিজে একদম একাকার হয়ে গিয়েছে।” পাশ থেকে আরেক নাবিক বলে উঠে। এরপর সবাই মিলে হাসতে থাকে একযোগে।
“কিন্তু মি. পেট-এর দিকে তাকিয়ে দেখ, আরেকজন নাবিক বলল। “একফোঁটা ঘামও নেই। বাধ দেয়া পুকুরের মতই শান্তশিষ্ট।”
প্রতিযোগী দুইজন কেবল একটাই জামা পরে আছে। তাদের পায়ে বা মাথায় অন্যকোনো কাপড় নেই। যেখানে সূর্যের হাত থেকে বাঁচার জন্য জাহাজের প্রায় সবাই মাথায় কোনো না কোনো কাপড় পরে আছে। হাল তার মাথা থেকে বড় ছাউনিওয়ালা টুপিটা খুলে হাতের রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে থাকে। এমনকি আফ্রিকার গরমের ভেতর বেড়ে ওঠা জুডিথও ঘামছিল প্রচণ্ডভাবে।
“আসলেই অনেক গরম পড়েছে। আর এই কারণেই ট্রোম্প ঘামছে, ভয়ের কারণে নয়।” হাল বলে উঠল।
আর ওদিকে ট্রাম্প ভেবে পাচ্ছিল না যে মি. পেট-এর মতো একজন ব্যবসায়ী মানুষ কিভাবে অস্ত্র পছন্দের ভার তার ওপর ছেড়ে দিতে পারল! এবং এখনও পর্যন্ত এতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে কিভাবে লোকটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার নখের ময়লা পরিষ্কার করছে যেখানে ট্রোম্প করার মতো কিছুই পাচ্ছে না।
“তোমরা কী তৈরি?” বিগ ডেনিয়েল জিজ্ঞেস করল। সে ডেক থেকে ছয় ফিট দুরে প্রধান মাস্তুলের রশি ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
দুজন প্রতিদ্বন্দ্বীই তাদের জায়গামত দাঁড়িয়েছে।
“আমি ফায়ার শব্দটা উচ্চারণ করার আগ পর্যন্ত তোমরা কোনো গুলি ছুড়বে না”, ডেনিয়েল বলতে থাকে। তারপর তোমরা তোমাদের ইচ্ছেমত যখন খুশি গুলি ছুড়বে। যেই মুহূর্তে কেউ একজন গুরুত্বর আহত হবে, গুলি করতে অক্ষম হয়ে পড়বে, তখন এই খেলা বন্ধ করতে হবে। বুঝতে পেরেছ তোমরা?
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমাদেরকে এবার শুরু করতে দিন।” ট্রোম্প জবাব দিল। পেট শুধু তার মাথাটা একটু নাড়াল।
হাল উঠে দাঁড়িয়ে জুডিথ-এর সামনে চলে আসলো। কারো পিস্তল থেকে ছুটে আসা গুলি কোন দিকে যাবে বলা তো যায়না। হয়ত তারা নিশানা ঠিক করেই গুলি ছুড়বে, তারপরও হাল কোনোরকম ঝুঁকি নিতে চায় না।
সাগরের মতো করেই সময় বয়ে যেতে লাগল। এরই মাঝে আশেপাশে কেউ একজন শব্দ করে বায়ু ছাড়ল-সশব্দে হেসে উঠল সবাই। দুর্গন্ধটা পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করিয়ে রাখল বিগ ডেনিয়েল। রঙ্গমঞ্চে প্রস্তুত দুজনই তাদের হাত সামনে টানটান করে রেখে পিস্তল ধরে আছে। ট্রাম্প-এর হাতের পিস্তলটা ইতোমধ্যেই কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে।
“ফায়ার”, বিগ ডেনিয়েল তীব্র গর্জন করে উঠে। কয়েক সেকেন্ড পর ট্রোম্প-এর পিস্তল থেকে এক ঝলক আগুন এবং ধোঁয়া পেট-এর দিকে ধেয়ে গেল। পেট-এর বাম কাঁধটা ঝাঁকুনি খেয়ে পেছনে সরে আসলো। কিন্তু তার পা স্থির হয়ে আছে এখনো। ভিড়ের মাঝ থেকে একটা গুঞ্জন ধ্বনি শোনা গেল। পেট-এর শার্টে রক্তের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। হাল ভাবল যে দুটো পিস্তল থেকেই হয়ত গুলি ছোঁড়া হয়েছে, কিন্তু পেট তার গুলিটা ট্রোম্প-এর গায়ে লাগাতে পারেনি। কিন্তু পরমুহূর্তেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। পেট এখন পর্যন্ত গুলিই ছোড়েনি। সে এখনও একইরকমভাবে পিস্তলটা ধরে রেখেছে।
