সবাই ওর কথাটাকে আনন্দধ্বনি আর চিৎকার এর মাধ্যমে সম্মান জানালো। ক্যাপ্টেন কার্টনির জন্য গর্বে তাদের বুক স্ফিত হয়ে গেল।
“সে একেবারে তার বাবার মতই হয়েছে।” নেড টেইলার বিগ ডেনিয়েল এর পাশে দাঁড়িয়ে বলল।
“বৃদ্ধ ফ্রাঙ্কি নিশ্চয়ই ওপর দেখে বেশ খুশি হচ্ছে, বিগ ডেনিয়েল জবাব দিল।
হাল তার গায়ের জামা খুলে ফেলল; খালি গায়ে আর খালি পায়ে তাকে একজন সাধারণ নাবিকের মতই মনে হচ্ছে এখন। তার পিঠের চাবুকের দাগ আর ক্ষতগুলো বের হয়ে গেলে মসি বিস্ময়ের সাথে মুখ হা করে তাকিয়ে থাকে।
“আমিও একসময় সাধারণ একজন দাস ছিলাম, মসি”, হাল বালকটির কৌতূহল বুঝতে পেরে তাকে জানালো।
“আপনি নিশ্চিতভাবেই খুবই অবাধ্য দাস ছিলেন, মাই লর্ড।” মসি হাসতে হাসতে বলল।
হালও হেসে জবাব দিল, “হ্যাঁ, তোমার চেয়েও অনেক বেশি।” সে তার চুলগুলোর বাধন খুলে আবারও পেছনে নিয়ে শক্ত করে বাঁধল। এতে করে লম্বা কালো পিগটেইলটা পেছনে দুই কাঁধের মাঝে পড়ে রইলো।
“আমরা কী প্রস্তুত?” সে মাস্তুলের দিকে ঝুঁকে এমনভাবে মসিকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলল যেন সে কোনো নারীকে সূর্যাস্ত দেখানোর জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
“ক্যাপ্টেন। দেখিয়ে দিন এখনো আপনার মাস্তুলের ওপর উঠার ক্ষমতা রয়েছে আগের মতই”, একজন নাবিক চিৎকার করে উঠে।
“আমি বাজি ধরে বলতে পারি ছেলেটি ক্যাপ্টেন-এর আগে মাস্তুলের ওপর উঠে পড়বে।” একজন নাবিক তার পাশের জনকে বলছিল।
“নাহ”, ক্যাপ্টেন কার্টনির জন্মই হয়েছে মাস্তুলের ওপর উঠার জন্য। সে সবসময় ওখানে রাজার মতই থাকবে”, অন্য লোকটি জবাব দিতে শুরু করল।
“তোমাকে আমার জন্য হলেও জিততে হবে, ডালিং”, জুডিথ ফিসফিস করে বলে উঠল।
“তোমরা সবাই কাজে যাও, বদমাশের দল”, হাল অলসভাবে বসে থাকা নাবিকদের উদ্দেশ্যে খেঁকিয়ে উঠল। যদিও সে খুব ভালভাবেই জানে যে ওরা কেউ ক্যাপ্টেন-এর মাস্তুলে উঠা না দেখে যাবে না।
অ্যাবোলি প্রতিযোগীদের উদ্দেশ্যে বলল, “তোমরা সবাই তৈরি?” সে তার দুই হাত বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিযোগীদের উদ্দেশ্যে তাকাল। দুজন প্রতিযোগই তার দিকে তাকিয়ে হাঁ-সূচক মাথা নাড়াল যদিও তখন দুশ্চিন্তায় তাদের শরীর কাঁপছিল।
“গো!” অ্যাবোলি চিৎকার দিয়ে উঠল। মসি এত দ্রুত দৌড়াতে শুরু করে যে দেখে মনে হয় কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে মাস্তুলের ওপর উঠে যাবে। সত্যিটা হচ্ছে, অ্যাবোলির মুখের শব্দ শেষ হওয়ার পূর্বেই সে দৌড়াতে শুরু করে দিয়েছিল।
দুর্ভাগ্যবশত হাল তার প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অল্প একটু সময় পরে দৌড়াতে আরম্ভ করেছিল। ইতোমধ্যেই গরমের কারণে ঘামের পানি তার কপাল চুঁইয়ে পড়ছে। তার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে। সে মাস্তুলটাকে তার এবং সূর্যের মাঝে রাখার চেষ্টা করছে। তারপরও সে সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সে যে চেষ্টাটা করছে তা হাল ছোট ছেলেটার সাথে তাল মিলিয়ে উপরে উঠতে।
“ছোকরা জন্মগতভাবেই একজন উপমাস্টারম্যান”, নেড টেইলার মসির দিকে তাকিয়ে এমনভাবে বলল যে শুনে মনে হচ্ছিল, কোনো শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর প্রশংসা করছে।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই প্রতিযোগীদের উৎসাহ দেয়ার জন্য চিৎকার করছে।
“সেটা বুঝলাম। কিন্তু আমাদের ক্যাপ্টেন এখনও পাছায় আগুন লাগা বানরের মতো তড়তড় করে মাস্তুলের ওপর উঠতে পারে”, বিগ ডেনিয়েল গর্বের সাথে বলল।
ডেক-এর যথেষ্ট উপরে থাকায় তাদের কারো কথাই হাল-এর কানে পৌঁছাচ্ছে না। এখন শুধু তার সামনে একটাই চিন্তা : মসিকে কীভাবে ধরে ফেলা যায়। কিন্তু ঠিক তখনই…মসি নিচের দিকে তাকাল।
“চোখ উপরের দিকে উঠাও”, হাল বলে উঠল। কিন্তু ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে। মসি প্রায় জমে বরফ-এ পরিণত হয়েছে। তার সারা শরীর কাঁপছে।”
“আমি আটকে গেছি, স্যার!”
“একটা গভীর শ্বাস নাও। এটা তেমন কোনো ব্যাপার না”, হাল বলতে থাকে। “উঠ, আরও উপরে উঠ।” হাল ছেলেটাকে বলতে পারত নিচে নেমে আসতে। কিন্তু সে সেটা করে নি। কারণ সে জানে একবার যদি ছেলেটার মনোবল ভেঙে যায় তাহলে সে আর কোনোদিনও উপরে উঠতে পারবে না।
নিচের সব মানুষ নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সমস্ত উত্তেজনা এখন ভয়ে রূপ নিয়েছে। তারা বুঝতে পারছে ছেলেটি এখন কী পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে সময় পার করছে। প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে গিয়েছে এরইমধ্যে, কিন্তু মসি-এর চেয়েও বড় এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে আছে।
“আমার পা আমার সাথে প্রতারণা করেছে, স্যার।”
“তুমি যা বলবে ওগুলো ঠিক তা-ই করবে। এখন আর কথা না বাড়িয়ে উপরে উঠতে থাক।”
“আমি নড়তে পারছি না। কান্নার সুরে কথাগুলো বলল ছেলেটা। তার হাঁটুদুটো যথেষ্ট দূরে সরে গিয়েছে। পেট ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়ায় হাল তার বুকের পাঁজরের প্রতিটা হাড় গুনতে পারছে।
“তুমি যদি মাস্তলের চূড়ায় উঠতে না পারো তবে পরবর্তী বন্দরে আমি তোমাকে দাসের বাজারে বিক্রি করে দেব”, হাল ছেলেটাকে হুমকি দিল। হাল জানে এটা একটা নিষ্ঠুর হুমকি। কিন্তু উচ্চতার চেয়েও বড় ভয়ের কোনো কিছু তার সামনে দাঁড় করাতে হবে। আর হুমকিতে কাজ হলো। যদিও মসি কাঁপছে, কিন্তু এরপরেও সে আস্তে আস্তে উপরে উঠার চেষ্টা করছে।
