হ্যা! ধর্মদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক ছিল সে। এই বিচারই পাওনা ছিল তার। তোমার নোংরা কথায় আর কান দিচ্ছি না। চাইলে মেরে ফেল আমাকে, কিন্তু আমি আর মুখ খুলছি না। ওকে বেঁধে রাখা দাড়ির বাঁধন আলগা করার প্রয়াস পেল সোয়ে। কর্কশ হয়ে উঠেছে তার শ্বাসপ্রশ্বাস, চোখে বুনো দৃষ্টি। ধর্মান্ধের চোখ।
মেরেন, আমাদের অতিথি উত্তেজনায় ক্লান্ত। একটু বিশ্রাম নিতে দাও তাকে। সকালে সূর্য উষ্ণ করে তুলবে এমন একটা জায়গায় বেঁধে রাখবে ওকে। শিবিরের বাইরে নিয়ে যাবে, কিন্তু বেশি দূরে নয়, যাতে সে ফের আলাপে রাজি হলে কথা বলার সময় বা ওকে হায়েনার দল খুঁজে পাওয়ার সময় টের পাই।
সোয়ের ঘাড়ে ভালো করে দাড়ি পেঁচিয়ে টেনে দূরে নিয়ে যেতে শুরু করল মেরেন। থেমে তাইতার দিকে তাকাল একবার। ওকে দিয়ে আর কাজ নেই, আপনি নিশ্চিত, ম্যাগাস? আমাদের কিছুই বলেনি কিন্তু।
সবই বলেছে, বলল তাইতা। আত্মা উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
ওর পা ধরো, শাবাকো ও তোনকাকে বলল মেরেন। ধরাধরি করে সোয়েকে দূরে নিয়ে গেল ওরা। পেরেক দিয়ে তপ্ত মাটিতে বেঁধে রাখার আওয়াজ পেল তাইতা। বিকেলের মাঝামাঝি আবার তার সাথে কথা বলতে গেল মেরেন। রোদে পেট আর কুঁচকিতে ফোঁসকা পড়েছে; গালের রঙ লাল, ফুলে উঠেছে।
মহান ম্যাগাস আলাপ চালু করতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তোমাকে, বলল মেরেন। ওকে থুতু মারার চেষ্টা করল সোয়ে, কিন্তু মুখে লালা এলো না। পিঙ্গল জিভ মুখটাকে ভরে রেখেছে। সামনের দাঁতের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে আছে ডগাটা।
সূর্যাস্তের খানিক আগে হায়েনার দল দেখা পেল তার। ওগুলোর বিকৃত গর্জন ও হাসির শব্দে এমনকি পোড়খাওয়া পুরোনো বীর মেরেন পর্যন্ত অস্বস্তি বোধ করতে লাগল।
ওকে ভেতরে নিয়ে আসব, ম্যাগাস? জানতে চাইল সে।
মাথা নাড়ল তাইতা। থাক। কোথায় ডাইনীর খোঁজ করতে হবে বলে দিয়েছে সে।
হায়েনার দল মরণটাকে নিষ্ঠুর করে তুলবে, ম্যাগাস।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল তাইতা। শান্ত কণ্ঠে বলল, কুনো ব্যাঙগুলো দিমিতারের মরণকেও একই রকম নিষ্ঠুর করে দিয়েছিল। ডাইনীর চ্যালা সে। সাম্রাজ্য জুড়ে বিদ্রোহে উস্কানি দিয়ে বেড়াচ্ছে। তার মারা যাওয়াই উচিত। তবে এভাবে নয়। এই ধরনের নিষ্ঠুরতা আমাদের বিবেকের দংশনে জর্জরিত করবে। আমাদেরও অমানুষের কাতারে নামিয়ে দেবে। যাও, ওর গলাটা দুফাঁক করে দাও।
উঠে দাঁড়াল মেরেন। তলোয়ার বের করে একুট থেমে কান খাড়া করল। একটা কিছু গোলমাল হয়েছে। চুপ মেরে গেছে হায়েনার দল।
জলদি, মেরেন। যাও, দেখ কী হচ্ছে। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে নির্দেশ দিল তাইতা।
ঘনায়মান অন্ধকারে ছুটে বেরিয়ে গেল মেরেন। কয়েক মুহূর্ত বাদে পাহাড় থেকে ওর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি শোনা গেল; বুনো চিৎকার ছাড়ছে। লাফিয়ে উঠল তাইতা, দৌড়ে গেল ওর কাছে। মেরেন, কোথায় তুমি?
এখানে, ম্যাগাস।
সোয়েকে যেখানে গেঁথে রেখেছিল ওরা, সেখানেই মেরেনকে পেল তাইতা, কিন্তু গায়েব হয়ে গেছে লোকটা। কী হয়েছে, মেরেন? কী দেখছ?
ডাকিনীবিদ্যা! তোতলাতে তোতলাতে বলল মেরেন। দেখলাম- থেমে গেল ও, কী দেখেছে ভাষায় প্রকাশ করতে পারছে না।
ব্যাপারটা কী? তাগিদ দিল তাইতা। জলদি বলো।
ঘোড়ার মতো বিশাল এক হায়েনা, ওটার পিঠে বসে আছে সোয়ে। নিশ্চয়ই তার পরিচিত হবে। ছুটে পহাড়ে চলে গেছে ওটা, সাথে করে নিয়ে গেছে ওকে। ওদের পিছু ধাওয়া করব? ধরতে পারবে না, বলল তাইতা। বরং মারাত্মক বিপদে ফেলে দেবে নিজেকে। যতটা ভেবেছিলাম, সোয়েকে উদ্ধার করতে ইয়োস তারচেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখে। এযাত্রা যেতে দাও ওকে। অন্য কোনও সময়, ভিন্ন কোথাও ওর সাথে ফয়সালা করব আমরা।
উটচালকরা চলার গতি বাড়ালেও এখনও অধৈর্য হয়ে রয়েছে তাইতা। পরের রাতে আবার কাফেলা ছেড়ে সামনে চলে গেল ও, আশা করছে ডেল্টার ঢালে পৌঁছে বহু বছরের অনুপস্থিতির পর আবার প্রাণপ্রিয় মিশরের দিকে এক নজর তাকাবে। ওর আগ্রহ যেন সংক্রামক, কারণ দুলকি চালে এগিয়ে চলেছে উইন্ডস্মোকও, ওটার ছুটন্ত খুর এক সময় শেষ দূরত্বটুকুও পার হয়ে এলো। ঢালের কিনারায় এসে লাগাম টানল তাইতা। নিচে চাঁদের আলো রূপালি অলোয় ভাসিয়ে দিচ্ছে কৃষি জমিন, স্পষ্ট করে তুলেছে নীলের সীমানায় দাঁড়ানো পামগাছগুলো। রূপালি জলের ক্ষীণতম ঝিলিকের খোঁজে চোখ চালাল ও। কিন্তু এই দূরত্বে নদীর তলদেশ অন্ধকার, গম্ভীর।
ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে মেয়ারের নাকের কাছে এসে দাঁড়াল তাইতা, ওটার ঘাড়ে হাত বোলাতে বোলাতে মুগ্ধ চোখে শহর, চাঁদের মতো শাদা মন্দির প্রাচীর, কারনাকের প্রাসাদগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। ওপারে মেমননের প্রাসাদের আকাশছোঁয়া দেয়াল খুঁজে বের করলেও ঢাল বেয়ে নেমে পলিমাটির সমতল পার হয়ে থেবসের শত শত তোরণের যেকোনও একটার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রলোভন ঠেকাল।
দিমিতারের খুব কাছে থাকা ওর দায়িত্ব, ওকে ফেলে সামনে ছুটে যাওয়া নয়। মেয়ারের মাথার কাছে গোড়ালির উপর বসল ও। তারপর ঘরে ফেরা ও প্রাণের প্রিয় সবার সাথে পুনর্মিলনের দৃশ্য কল্পনা করতে লাগল।
ফারাও ও রানি মিনতাকা ওকে খুবই সমাদর করেন, সাধারণত রাজ পরিবারের উধ্বর্তন সদস্যদের জন্যেই এমনি সমাদর তোলা থাকে। বিনিময়ে ওদের দুজনের জন্যেই অনুগত ভালোবাসা লালন করে ও। ছেলেবেলা থেকেই অপরিবর্তনীয় রয়ে গেছে তা। নেফারের বাবা ফারাও তামোজ নেফার খুব ছোট থাকতে খুন হন, উচ্চ ও নিম্ন মিশরের সিংহাসনে আসীন হওয়ার পক্ষে খুবই ছোট ছিলেন তিনি; তাই একজন রিজেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তামোজের শিক্ষক ছিল তাইতা, সুতরাং তার সন্তানকে সাবালকত্ব অর্জন করার আগ পর্যন্ত ওর হাতে তুলে দেওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। ওর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যাপারটি দেখেছে তাইতা, ওকে ঘোরসওয়ার আর যোদ্ধা হিসাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তারপর যুদ্ধ পরিচালনা ও সেনাবাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়ার কৌশল শিখিয়েছে। রাজকীয় দায়িত্ব, রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা ও কূটনীতি শিখিয়েছে। পুরুষে রূপান্তরিত করেছে তাকে। অনেক বছরের পরিক্রমায় ওদের দুজনের মাঝে একটা বন্ধন তৈরি হয়েছে, অবিচ্ছেদ্য রয়ে গেছে সেটা।
