সে অশুভের প্রতিভূ হয়ে থাকলে, সেক্ষেত্রে তাকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করাই হবে আমাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব।
পরিহাসের হাসি দিলেন দিমিতার। এ কাজেই সারা জীবন কাটিয়ে দিয়েছি, কিন্তু মহিলা যেমন অশুভ তেমনি চতুর। হাওয়ার মতোই অধরা। কোনও আভাই ছড়ায় না সে। জাদু আর কূটকৌশলে নিজেকে এমনভাবে বাঁচায় যা কিনা অতিলৌকিক বিষয়ে আমার জ্ঞানের বাইরে। ওকে যারা ধরার চেষ্টা করে তাদের জন্যে ফাঁদ পাতে সে। এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে অনায়াসে ঘুরে বেড়াতে পারে। কার্মা স্রেফ তার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছেন। তারপরেও একবার ওকে খুঁজে পেতে সফল হয়েছিলাম। নিজেকে আবার শুধরে নিলেন তিনি। কথাটা পুরোপুরি সত্যি না। আমি ওকে পাইনি। সেই আমাকে খুঁজে বের করেছিল।
সাগ্রহে সামনে ঝুঁকল তাইতা। এই চিড়িয়াকে আপনি চেনেন? সামনাসামনি তার দেখা পেয়েছিলেন? বলুন আমাকে, দিমিতার, দেখতে কেমন সে?
হুমকির মুখে পড়লে গিরগিটির মতো চেহারা পাল্টাতে ওস্তাদ। তবে তার অসংখ্য দোষের ভেতর অহঙ্কারের অস্তিত্ব আছে। সে যে কেমন সুন্দর চেহারা নিতে পারে কল্পনাও করতে পারবেন না। সব বুদ্ধি ঘোলা করে দেয়, যুক্তি বোধ লোপ পায়। সে এই রূপ ধরলে তখন কোনও পুরুষের পক্ষে ঠেকানো সম্ভব হয় না। ওর চেহারা এমনকি সবচয়ে ভালো মানুষটিকেও জঘন্য পশুতে পরিণত করে। নীরব হয়ে গেলেন তিনি, বিষাদে ভারি হয়ে এলো দুচোখের পাতা। কুশলী সাধক হিসাবে আমার সমস্ত প্রশিক্ষণ সত্ত্বেও আপন নীচ ইন্দ্রিয়কে সামাল দিতে পারিনি। ক্ষমতা আর পরিণাম আঁচ করার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলেছি। ওই মুহূর্তে আমার কাছে সে ছাড়া আর কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। কামনায় গ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। শরতের হাওয়া যেভাবে ঝরা পাতা নিয়ে খেলে ঠিক সেভাবে আমাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে সে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে বুঝি সবই আমাকে দিচ্ছে সে। এই দুনিয়ার বুকের সব আনন্দ যোগাচ্ছে। আমাকে নিজের দেহ তুলে দিয়েছিল সে। মৃদু কণ্ঠে গুঙিয়ে উঠলেন দিমিতার। এমনকি এখনও সেই স্মৃতি আমাকে প্রায় পাগল করে তোলে। প্রতিটি উত্থান-পতন, মোহনীয় মুখ, সুরভিত আলিঙ্গন…ওকে ঠেকানোর কোনও চেষ্টা করিনি, মরণশীল কোনও পুরুষের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। তার অবয়বে ক্ষীণ। বিক্ষুব্ধ রঙের ছোঁয়া লাগল।
তাইতা, আপনি বলেছিলেন আসল ইয়োস এক অতৃপ্ত নিস্ফোম্যানিয়াক। কথাটা ঠিক। কিন্তু এই ভিন্ন ইয়োস ক্ষুধার দিক থেকে তাকেও হারিয়েছে। সে চুমু খাওয়ার সময় প্রেমিকের মূল রস শুষে বের করে আনে, ঠিক আমি বা আপনি যেভাবে পাকা কমলা থেকে রস বের করব। যখন কোনও পুরুষকে বিচিত্র, নারকীয় মিলনে বন্দি করে, তখন সে তার পুরো সত্তা, তার আত্মা বের করে আনে। পুরুষের সত্তাই তাকে পুষ্টি যোগানো অমৃত। এক ধরনের দানবীয় রক্তচোষা সে, মানুষের রক্তে টিকে থাকে। শিকার হিসাবে কেবল উন্নত সত্তা বেছে নেয়, ভালো মনের নারী-পুরুষ, সত্যির দাস, বৈচিত্র্যময় খ্যাতিমান ম্যাগাস বা প্রতিভাবান ভবিষ্যদ্বক্তা। শিকারের খোঁজ পেলেই নেকড়ে বাঘ যেভাবে হরিণের পিছু নেয় ঠিক সেভাবে তার পিছু ধাওয়া করে। সর্বভূক সে। বয়স বা চেহারা কোনও ব্যাপার নয়, শারীরিক দুর্বলতা বা পঙ্গুত্বেও কিছু আসে যায় না। তাদের মাংসে তার ক্ষুধা মেটে না, আত্মা লাগে। তরুণ-যুবা, নারী-পুরুষ সবাইকে গ্রাস করে সে। একবার আয়ত্তে পেলে, নিজের রূপালি জালে আটকাতে পারলে, তাদের পুঞ্জীভূত শিক্ষা, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা শুষে নেয়। ওদের মুখে অভিশপ্ত চুমু দিয়ে শুষে নেয়। ঘৃণিত আলিঙ্গনে নিংড়ে নেয়। পড়ে থাকে স্রেফ একটা শুকনো খোসা।
এই দৈহিক বিনিময় দেখেছি, বলল তাইতা। কশ্যপ জীবনের প্রান্তে পৌঁছার পর তার জ্ঞান আর প্রজ্ঞা সুমনার কাছে হস্তান্তর করার সময়, ওকে নিজের উত্তরাধিকারী বেছে নিয়েছিলেন তিনি।
আপনি দেখেছেন ইচ্ছাকৃত বিনিময়। ইয়োসের অশ্লীল কর্মকাণ্ড এক ধরনের জৈবিক আগ্রাসন, দখল। সে বিনাশী, আত্মার খাদক।
মুহূর্তের জন্যে বিস্মযে বাক রহিত হয়ে রইল তাইতা। তারপর জানতে চাইল, প্রাচীন ও অশক্ত? সম্পূর্ণ বা পঙ্গু? নারী আর পুরুষ? যাদের মিলিত হওয়ার ক্ষমতা নেই, তাদের সাথে কীভাবে মিলিত হয় সে?
তার এমন ক্ষমতা আছে যেটা কিনা আপনি আর আমি কুশলী সাধক হলেও ধারে কাছে যেতে পারব না বা পরিমাপ করতে পারব না। শিকারের দুর্বল শরীর এক দিনের জন্যে চাঙা করার কায়দা আবিষ্কার করেছে সে, কেবল তার মন আর খোদ সত্তাকে মুছে দিতে।
তারপরেও আমার প্রশ্নের জবাব কিন্তু দেননি, দিমিতার। আসলে কি সে? মরণশীল নাকি অমর; মানুষ না দেবী? ওর বিরল সৌন্দর্যের কোনও মেয়াদ নেই? সে কি আপনার বা আমার মতো সময় বা বয়সের হাতে নাজুক নয়?
আপনার প্রশ্নের জবাব, তাইতা, আমি জানি না। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বয়স্কা নারী হতে পারে সে, দুহাত মেলে অসহায়ত্বের একটা ভঙ্গি করলেন দিমিতার। তবে সে এমন কোনও শক্তি আবিষ্কার করেছে যেটা এর আগে কেবল দেবতাদের জানা ছিল। তাতে কি দেবী হয়ে যাচ্ছে সে? জানি না। অমর না হাতে পারে, তবে নিশ্চিতভাবে জরাহীন।
আপনার প্রস্তাবটা কী, দিমিতার? ওর আস্তানার খোঁজ কীভাবে পাব?
