দিমিতারের ফিসফিসানি জোরাল হলো, নতুন তাগিদের সুর ফুটে উঠল। দেবতা, উপদেবতা, কুশলী সাধক আর দয়াময় অমরদের কথা বলেছি আমরা। এথেকে বুঝতে পেরেছি আপনার এসবের গভীর জ্ঞান রয়েছে। তবে আপনাকে আরও বলতে পারি আমি। মহা বিশৃঙ্খলার সূচনা থেকেই দেবতাদের উত্থান হচ্ছে, তারপর ফের পতন ঘটছে। পরস্পরের বিরুদ্ধে আর মিথ্যার দাসদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তারা। প্রাচীন দেবতা টাইটানদের পরাস্ত করেছিলেন অলিম্পিয় দেবতারা। এক সময় তারাও দুর্বল হয়ে যাবেন। কেউই আর ওদের বিশ্বাস বা পূজা করবে না। ওরা পরাস্ত হবেন, আরও তরুণ দেবতারা তাদের স্থান দখল করবেন কিংবা আমরা পরাজিত হলে, মিথ্যার বৈরী চররা ওদের অতিক্রম করে যেতে পারে। খানিক ক্ষণ নীরব রইলেন তিনি, কিন্তু আবার যখন খেই ধরলেন, বেশ অটল শোনাল তাঁর কণ্ঠস্বর। স্বর্গীয় ধারায় এই উত্থান-পতন মহা বিশৃঙ্খলার মাঝে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্যে আবির্ভূত স্বাভাবিক ও অপরিবর্তনীয় আইনি বিধানের অংশ। এইসব বিধান বিশ্বজগতকে নিয়ন্ত্রণ করে। ওরা জোয়ার ভাটার নির্দেশ দেয়, দিন রাতের পরিবর্তনের আদেশ দেয়। বাতাস ও ঝড়ের নিয়ন্ত্রণ করে। আগ্নেয়গিরি ও জলোচ্ছ্বাসের নিয়ন্ত্রণ করে। সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, ও দিনরাতের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। দেবতারা স্রেফ সত্যির দাস। শেষ পর্যন্ত কেবল সত্যি আর মিথ্যাই টিকে থাকবে। অকস্মাৎ ঘুরে পেছনে চোখ ফেরালেন দিমিতার। অভিব্যক্তি নির্বিকার। কিন্তু হাল ছেড়ে দিলেন। আপনি কি অনুভব করতে পারছেন, তাইতা? শুনতে পাচ্ছেন?
নিজের সমস্ত ক্ষমতা কাজে লাগাল তাইতা, তারপর চারপাশে ক্ষীণ একটা শব্দ শুনতে পেল, অনেকটা লাশের উপর নেমে আসা শকুনের ডানা ঝাপ্টানোর মতো। মাথা দোলাল ও। কথা বলতে পারছে না, এতটাই অলোড়িত বোধ করছে। মহাঅশুভের বোধ ওকে প্রায় অভিভূত করে ফেলেছে। পাল্টা যুঝতে বলতে গেলে নিজের পুরো শক্তি ব্যবহার করতে হলো ওকে।
এরই মধ্যে আমাদের মাঝে এসে পড়েছে সে, নিচু হয়ে গেল দিমিতারের কণ্ঠস্বর, শ্রমসাপেক্ষ, রুদ্ধশ্বাস হয়ে উঠল, যেন কোনও অশুভ উপস্থিতির ভারে ওর ফুসফুস দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। গন্ধ পাচ্ছেন তার?
নাক ফোলাল তাইতা। পচন, অসুস্থতা আর পচা মাংস, প্লেগের তীব্র দুর্গন্ধ, ফাটা মলের পচা দুর্গন্ধ লাগল নাকে। বুঝতে পারছি, গন্ধ পাচ্ছি, জবাব দিল ও।
বিপদে পড়েছি আমরা, বললেন দিমিতার। তাইতার দিকে হাত বাড়ালেন তিনি। হাত মেলান! নির্দেশ দিলেন। ওকে ঠেকাতে দুজনের শক্তি এক করতে হবে!
ওদের আঙুলগুলো পরস্পর মিলতেই মাঝখানে তীব্র নীল ঝলক বিস্ফোরিত হলো। হাত সরিয়ে নিয়ে যোগাযোগ নষ্ট করার ঝোঁকটা অতি কষ্টে দমন করল তাইতা। দিমিতারের হাত শক্ত করে ধরে আঁকড়ে থাকল। শক্তির আদান প্রদান হলো ওদের ভেতর। আস্তে আস্তে শক্তিশালী সত্তার উপস্থিতি মিলিয়ে গেল। আবার মুক্তভাবে শ্বাস টানতে পারল ওরা।
এটা অনিবার্য ছিল, হালছাড়া ভঙ্গিতে বললেন দিমিতার। আমি তার রূপ আর জাদুর মায়া কাটিয়ে পালিয়ে আসার পর থেকেই গত কয়েক শতাব্দী ধরে পিছু ধাওয়া করছে সে। কিন্তু এখন আমরা একসাথে হওয়ার পর এত জোরাল মনস্তাত্ত্বিক শক্তি সৃষ্টি করেছি যে অনেক দূর থেকেই টের পেয়ে গেছে, যেমনটা বড় আকারের হাঙর যেমন দেখার অনেক আগেই সার্দিন মাছের ঝাঁকের অবস্থান টের পায়। বিষাদভরা চোখে তাইতার দিকে তাকালেন তিনি। এখনও ওর হাত ধরে রেখেছেন। এখন আমার মাধ্যমে আপনার কথাও জেনে গেছে মেয়েটা, তাইতা। আবশ্য আমার কারণে না হলেও ভিন্ন কোনও উপায়ে আপনার কথা জানতোই। নক্ষত্রমণ্ডলীতে পাঠানো আপনার সৌরভ অনেক শক্তিশালী। সে হচ্ছে চরম শিকারী।
আপনি মেয়ে বলছেন? এই মেয়েটা কে?
নিজেকে ইয়োস বলে সে।
নামটা আমি শুনেছি। পঞ্চাশ প্রজন্মেরও আগে সরস্বতীর মন্দিরে গিয়েছিল ইয়োস নামে এক মহিলা।
সে-ই।
ইয়োস সূর্য দেবতা হেলিয়াসের বোন ভোরের প্রাচীন দেবী, বলল তাইতা। এক অতৃপ্ত নিম্ফোম্যানিয়াক, তবে টাইটান ও অলিম্পিয়দের লড়াইয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। মাথা নাড়ল ও। সেই একই ইয়োস হতে পারে না।
ঠিক বলেছেন, তাইতা। ওরা এক নয়। এই ইয়োস মিথ্যার দাসী। নিপূণ ভণ্ড, ক্ষমতাদখলকারী, প্রতারক, তস্কর, শিশুখাদক। প্রাচীন দেবীর নাম ভাঁড়িয়েছে, তাঁর কণ্ঠ নকল করেছে। তবে তার কোনও গুণ আয়ত্ত করতে পারেনি।
ইয়োস পঞ্চাশ প্রজন্ম ধরে বেঁচে আছে ধরে নেব? তার মানে এখন তার বয়স দুই হাজার বছর, অবিশ্বাস-ভরা কণ্ঠে বলে উঠল তাইতা। আসলে সে কী? মরণশীল নাকি অমর? মানুষ না দেবী?
গোড়াতে মানুষই ছিল। অনেক বছর আগে ইম্বালিয়নের অ্যাপোলো দেবীর পুরোহিতিনী ছিল সে। স্পার্টানরা শহর দখল করার পর হত্যালীলা এড়িয়ে ইয়োস নাম ভাঁড়ায়, এখনও মানুষই আছে, তবে কীসে পরিণত হয়েছে তার বর্ণনা দেওয়ার মতো ভাষা আমার জানা নেই।
ইম্বালিয়নের এই নারীর আবির্ভাবের উল্লেখ করা খোদাই লিপি দেখিয়েছে আমাকে সুমনা, বলল তাইতা।
সেই একই ব্যক্তি। কার্মা ওকে অন্তর্চক্ষুর উপহার দিয়েছেন। ওকে মনোনীত ভেবেছিলেন তিনি। নিজেকে আড়াল করা আর প্রতারণার বেলায় তার ক্ষমতা এত বেশি যে কাৰ্মার মতো মহান সাধু ও যাজক পর্যন্ত তা ভেদ করে দেখতে পারে নি।
