যাইহোক কয়েকশো মিনোয়ান পরিবার দক্ষিণের মেমফিস আর আসিউত থেকে পালিয়ে হাইকসো রথ এড়িয়ে আমাদের যুদ্ধ সীমান্তরেখা পর্যন্ত পৌঁছলো। সেখানে সেনাপতি ক্রাটাসের নির্দেশে আমাদের লোকজন শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে সদয় ব্যবহার করলো।
এই খবর শোনার সাথে সাথে আমি ঘোড়ায় চড়ে যত দ্রুত সম্ভব হাইকসোদের মুখোমুখি আমাদের সীমান্ত বাহিনীর কাছে গেলাম।
এই বাহিনীর কয়েকজন পদস্থ সেনাকর্মকর্তাকে আমি অনেক আগে থেকে চিনতাম। ওরা আমার কাছেই বিজ্ঞান, যুদ্ধবিদ্যা শিখেছিল আর আমার সুপারিশেই ওরা বর্তমান সামরিক পদবী লাভ করতে পেরেছিল।
এদের মধ্যে সেনাপতি রেমরেমকে থিবসের যুদ্ধ ক্ষেত্রেই ফারাও সম্মানিত করেছিলেন আর এখন সে সর্বাধিনায়ক জেনারেল ক্রাটাসের অধীনে একটি পল্টনের অধীনায়কত্ব করছে।
আমি যখন হুইকে পাকড়াও করি তখন সে ছিল একজন অপরাধী আর এখন সে পাঁচশো রথীর এক ঊর্ধ্বতন অধিনায়ক। পুরোনো এইসব বন্ধু আর পরিচিতরা আমাকে তাদের শিবিরে পেয়ে খুব খুশি হল, এমনকি সেই তিরষ্কারযোগ্য অত্যন্ত দুশ্চরিত্র বুড়ো সর্বাধিনায়ক ক্রাটাসও। সন্ধ্যায় জেনারেল ক্রাটাস আমাকে মদ খাইয়ে মাতাল করার চেষ্টা করলো। পরে আমিই তাকে কোলে করে তার বিছানায় নিয়ে গেলাম আর যখন সে বমি করে সব বের করছিল তখন আমিই তার মাথা ধরে রেখেছিলাম।
পরদিন সকালে সে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার অধীনস্থ এক কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিল যেসব শরণার্থী রাজা গোরাবের কবল থেকে বেঁচে পালিয়ে এসেছে, তাদেরকে আমার সামনে হাজির করার জন্য।
হতভাগ্য এই চল্লিশজন মানুষ কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে, সাথে কিছুই আনতে পারেনি। তাদের পরিবারের কাউকে না কাউকে হাইকসোরা হত্যা করেছে।
সারিবদ্ধ লোকগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলাম, সম্মান দেখিয়ে মাঝে মাঝে দুএকটা প্রশ্ন করলাম।
সারির একেবারে শেষ মাথায় তিনজনের একটি পরিবার জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিবারটির কর্তা আমিথায়ন থেমে থেমে মিসরীয় ভাষায় কথা বললো। তিন সপ্তাহ আগে সে মেমফিসে শস্য, মদ আর চামড়ার ব্যবসা করতো। সফল এই ব্যবসায়ীর নাম আমিও এতদুর থেকে আমার লোকজনের কাছে শুনেছিলাম। হাইকমোরা তার বাড়িঘর আর গুদাম পুড়িয়ে ফেলে আর তার স্ত্রীকে তার চোখের সামনেই ধর্ষণ করেছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মহিলাটি সেখানেই মারা যায়।
তার উনিশ বছর বয়সি ছেলেটির নাম ইকারিওন। তাকে দেখার সাথে সাথেই আমার ভালো লাগলো। লম্বাচওড়া বলিষ্ঠ গড়ন। ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল আর সুন্দর মুখ। এতে ঘটনার পর তার বাবার মতো সে এতোটা ভেঙে পড়েনি।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি নিশ্চয়ই তোমার নিজের হাতে বানানো ডানায় ভর করে উড়ে এসেছো?
ইকারিওন হেসে উত্তর দিল, অবশ্যই। তবে আমি সূর্য থেকে অনেক দূরে ছিলাম প্রভু। তার নাম নিয়ে আমার রসিকতা করাটা সে ঠিকই বুঝেছিল।
তুমি কি লেখাপড়া জান ইকারিওন?
হ্যাঁ জানি। তবে আমার বোনের মত তেমন পছন্দ করি না।
আমি মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম, সে তার বাপভাইয়ের পেছনে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দর। লম্বা কালো চুল আর বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল মুখ। তবে আমার রাজকুমারিদের মতো সুন্দর নয়। অবশ্য সুন্দর চেহারা আজকাল খুব একটা দেখা যায় না।
প্রায় তেহুতির সমবয়সী মেয়েটি বললো, আমার নাম লক্সিয়াস, বয়স পনেরো। পরিষ্কার মিসরী ভাষায় সে কথাগুলো বললো, যেন সে জন্মসুত্রে একজন মিসরী।
তুমি কি লিখতে পার লক্সিয়াস?
হ্যাঁ পারি প্রভু। প্রাচীন পারসিক কুনিলিপি, মিসরীয় গূঢ়লিপি আর মিনোয়ন লিপি–তিন পদ্ধতিতেই লিখতে পারি।
তার বাবা আমিথায়ন মাঝখান থেকে বলে উঠলো, সে আমার ব্যবসার হিসাবপত্র আর চিঠিপত্র লেখার কাজ করতো। খুবই বুদ্ধিমতি।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আমাকে মিনোয়ান ভাষা শেখাতে পারবে?
কয়েকমুহূর্ত ভেবে সে বললো, পিরবো, তবে এটা নির্ভর করবে আপনার শেখার ক্ষমতার উপর প্রভু তায়তা। মিনোয়ান সহজ ভাষা নয়। আমি লক্ষ্য করলাম সে আমার পুরো নাম আর উপাধি ব্যবহার করেছে। এতে বোঝা গেল মেয়েটি আসলেই বুদ্ধিমতি।
আমি তাকে আহ্বান জানিয়ে বললাম, একবার আমাকে পরীক্ষা করে দেখো। মিনোয়ান ভাষায় কিছু একটা বল।
সে রাজি হয়ে বললো, ঠিক আছে। তারপর সে মিনোয়ান ভাষায় দীর্ঘ একটা বাক্য উচ্চারণ করলো।
আমি তা পুনরুক্তি করলাম। শব্দ শুনে মনে রাখার আমার একজন। সংগীতশিল্পির মতো কান ছিল। যেকোনো মানুষের কথা শুনলে আমি তা সহজেই নকল করে বলতে পারি। এই ক্ষেত্রে আমি কী বলছি সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না তবে যা আমি বলেছিলাম তা সঠিকভাবেই বলেছিলাম। ওরা তিনজনেই আমার দিকে হতবাক হয়ে তাকাল আর লক্সিয়াসের মুখ বিরক্তিতে লাল হল।
সে আমাকে বললো, আপনি আমার সাথে তামাসা করছেন প্রভু তায়তা। আমার আপনাকে শেখাবার প্রয়োজন নেই। আপনি আমার মতোই বলতে পারেন। কোথায় শিখেছেন এই ভাষা? আমি কোনো উত্তর না দিয়ে একটা রহস্যময় হাসি হেসে চলে এলাম।
হুইয়ের কাছ থেকে চারটি ঘোড়া ধার নিয়ে আমরা চারজন সেদিনই দক্ষিণে থিবসের পথে রওয়ানা দিলাম। ছোট এই পরিবারটির জন্য আমি শহরের দেয়ালের বাইরে মেশির নামে যে নতুন ভূ-সম্পত্তি লাভ করেছি তার একটি ছোট গ্রামে থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম।
