চল্লিশ মিনিট গরমে সেদ্ধ হলো ওরা। চোর-বদমাশদের ধরে এনে জেরা করা হচ্ছে, এটা ছাড়া উপভোগ করার মতো আর কিছু নেই এখানে। অবশেষে ইন্সপেক্টর গালাকে পার্টিশনের দরজায় দেখা গেল। কালকের মতো হাসলেন না, মুখ হাঁড়ি করে আছেন, হাতছানি দিয়ে ডাকলেন ওদেরকে। এগিয়ে এসে হাতটা বাড়িয়ে দিল নিকোলাস, ইন্সপেক্টর দেখতে না পাবার ভান করে ওদেরকে পথ দেখিয়ে পেছন দিকের একটা কামরায় নিয়ে এলেন। বসার কোনো অনুরোধ এলো না, নিকোলাসকে বলা হলো, আপনার দখলে একটা আগ্নেয়াস্ত্র ছিল, সেটা হারিয়ে ফেলার জন্য আপনিই দায়ী।
হ্যাঁ, আমি আমার স্টেটমেন্টে বলেছি….
ওকে বাধা দিয়ে ইন্সপেক্টর গালা বললেন, অবহেলা করে আগ্নেয়াস্ত্র হারানো অত্যন্ত সিরিয়াস অফেন্স।
আমার তরফ থেকে কোনো অবহেলা হয় নি, অস্বীকার করলো নিকোলাস।
অস্ত্রটার উপর আপনি নজর রাখার ব্যবস্থা করেন নি। স্টীল সেফে ভরে রাখার কোনো চেষ্টা করেন নি।
অ্যাবি খাদে স্টীল সেফ, ইন্সপেক্টর?
অবহেলা, বললেন ইন্সপেক্টর। অপরাধতুল্য অবহেলা। আমরা জানব কীভাবে অস্ত্রটা সরকারবিরোধী দুস্কৃতকারীদের হাতে পড়ে নি?
আপনি বলতে চাইছেন অজ্ঞাত পরিচয় কোনো ব্যক্তি একটা রিগবি দিয়ে সরকারকে উৎখাত করতে পারে?
নিকোলাসের বিদ্রূপ গ্রাহ্য না করে দেরাজ খুলে দুই প্রস্থ ডকুমেন্ট বের করলেন সালাম। এগুলো আপনাদের বহিষ্কার আদেশ। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ইথিওপিয়া ছেড়ে যেতে হবে।
আরে, ডক্টর আল সিমা তো জীবনেও কোনো আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেন নি। তো, তাকে নিষিদ্ধ করার কি মানে?
অনেক তর্ক-বিতর্ক করেও কোনো লাভ হলো না। অবশেষে নিকোলাস বলল, জেনারেল ওবেঈদর সঙ্গে দেখা করতে চাই আমি।
তিনি উত্তর সীমান্তে গেছেন, কয়েক সপ্তাহ পর ফিরবেন। প্লিজ, ডকুমেন্টে সই করুন।
সই করা শেষ হতে ওরা যখন রোলস রয়েসে উঠছে, তখন রোয়েন বলল, কি ঘটলো এটা?
খুব সহজ। পেগাসাস কেবল নগুকেই হাত করে নি, রাতে তাদের মালিক জেনারেল ওবেঈদের সাথেও কথা বলেছে। হের ফন শিলার সাহেব।
এর মানে বুঝছেন তো, নিকি? আমরা আর ইথিওপিয়ায় ফিরতে পারবো না। মামোসের সম্পদ চিরকাল অধরা থেকে যাবে।
যেবার ডুরেঈদ আর আমি লিবিয়া আর ইরাকে ঢুকেছিলাম, সাদ্দাম হোসেন বা গাদ্দাফি কেউ আমাদের স্বাগত জানায় নি–যতদূর মনে পরে।
মনে হচ্ছে, আইন ভাঙার সম্ভাবনায় একেবারে খুশি আপনি!
ইথিওপিয়ার আইনের থোরাই পরোয়া করি আমি।
কিন্তু ধরা পরলে ওই ইথিওপিয়ার জেলেই ওরা পুরবে আপনাকে, অন্তত ওই ব্যাপারটা মাথায় নিন!
হেসে নিকোলাস বলে, আপনিও মাথায় রাখুন। কেননা, ধরা পরলে আপনারও একই হাল হবে।
*
পরদিন ওদেরকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেওয়ার সময় জিওফ্রে বারবার একই কথা বলছে, হিজ এক্সিলেন্সি সাংঘাতিক রেগে গেছেন। আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ তো জানিয়েছেনই, আরো যা যা করার সবই তিনি করবেন….
এটা নিয়ে এতো হৈ-চৈ করার দরকার কি, বলল নিকোলাস। দু জনের কেউই আমরা এখানে আর ফিরে আসতে ইচ্ছুক নই। কাজেই বলা চলে না যে আমাদের কোনো ক্ষতি হয়েছে।
কিন্তু তোমরা দুজনেই ব্রিটিশ নাগরিক….
সবই ঠিক, তবু এতো গুরুত্ব না দিলেও চলে।
কেনিয়া এয়ারওয়েজের টিকেট আগেই বুক করা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ে প্লেনে চড়ে বসলো ওরা। বিদায়ের সময় জিওফ্রেকে খুব বিষণ্ণ দেখালো। ছুটিছাটায়। লন্ডনে গেলে আমার খোঁজ করো, উৎসাহ দিয়ে হাসলো নিকোলাস।
প্লেন গড়াতে শুরু করেছে, এয়ারপোর্ট বিল্ডিংকে পাশ কাটিয়ে এলো। হঠাৎ নিকোলাসের পাশের সিটে আড়ষ্ট হয়ে গেল রোয়েন। দেখুন! জানালো দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। পেগাসাস!
এয়ারপোট বিল্ডিঙের দূর প্রান্তে একটা একজিকিউটিভ জেট এইমাত্র স্থির হলো। প্লেনটা সবুজ রঙ করা। ওরা তাকিয়ে আছে, জেটের দরজা খুলে গেল। অভ্যর্থনা জানাবার জন্য ছোট্ট একটা ভিড় তৈরি হয়েছে টারমাকে।
জেটের দরজায় প্রথমে উদয় হলেন ছোটখাট একজন মানুষ, পরনে ক্রীম ট্রপিক্যাল স্যুট, মাথায় সাদা পানামা হ্যাট। আকার-আকৃতি যা-ই হোক, ভদ্রলোকের হাবভাবে আত্মবিশ্বাস আর কর্তৃত্বের ছাপ স্পষ্ট। মাথা উঁচু করে রাখার ভঙ্গিটা দম্ভ হতে পারে, ঘাড় ফিরিয়ে তাকানোর ধরনটা ক্ষমতার গর্ব হওয়া বিচিত্র নয়। তার চোয়াল কঠিন, যেনো সারাক্ষণ ছেদ ধরে আছেন।
দেখামাত্র চিনতে পারলো নিকোলাস। সোথবি ও ক্রিস্টি সহ নামকরা দু একটা অকশন ফ্লোরে বেশ কয়েকবারই হের ফন শিলারকে দেখেছে।
হের ফন শিলার, বিড়বিড় করলো।
আমার চোখে লাগছে ফণা তোলা গোক্ষরা!
সিঁড়ি বেয়ে জেট থেকে তরতর করে নেমে আসছেন হের ফন শিলার।
দেখে বিশ্বাস হয়, ভদ্রলোকের বয়স সত্তর? জিজ্ঞেস করলো নিকোলাস। চুল আর ভুরু রঙ করেছেন, তা না হলে এতো কালো দেখাত না।
সর্বনাশ, এ আমি কাকে দেখছি! হঠাৎ আঁতকে উঠলো রোয়েন।
ছোট্ট ভিড়টা থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন ব্লু ইউনিফর্ম পরা জেনারেল ওবেঈদ। হের ফন শিলারকে স্যালুট করলেন তিনি।
কি, বলি নি? ফন শিলারের পকেটে আরো কে কে আছে কে বলবে!
দেখুন, দেখুন! আবার একবার আঁতকে উঠলো রোয়েন, তাকিয়ে আছে জেটের দরজায়। এবার যে আরোহীটিকে ওখানে দেখা গেল তার বয়েস বেশি নয়। সুদর্শন তরুণ, মাথায় ঢেউ খেলানো কালো চুল, মাথায় হ্যাট নেই। ওহ গড, নাহুত গাদ্দাবি!
