নীল নদের দেবী হলো হাপি। তাহলে এ নদী তার কন্যা, মায়ের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছুটে চলেছে, লাফ দিচ্ছে পাহাড় থেকে, গর্জন করছে। সিংহীর মতো, ফেনায় সাদা দেখাচ্ছে তার দাঁত? জিজ্ঞেস করলো রোয়েন।
শয়তানি হাসিতে নিকোলাসের মুখ ভরে উঠলো। জানি, এরপর কী বলবেন। এ খাজের দিকে তাকিয়ে ওটাই প্রথম আমার মনে এসেছিল! আপনি বলেছিলেন, এ হলো এক সর্বগ্রাসী মুখগহ্বর- আমার কাছে অবশ্য অন্য কিছুর মতো মনে হচ্ছে!
আমি কেবল এইটাই বলতে পারি- আপনার নিশ্চই অসাধারণ কিছু নারী বন্ধু ছিল! রোয়েন বলে ফেলে মুখ ফসকে। এ হে! টাইটার খপ্পরে পরে আমিও আজে বাজে বকছি।
নদীর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো নিকোলাস, একদল কর্মীকে গ্রাস করেছে। পাথরমিস্ত্রী আর রাজমিস্ত্রীদের খেয়ে ফেলেছে।
ফারাও মামোস একজন গড বা দেবতা। নদী একজন গডকে গিলে ফেলেছে…পাথুরে খিলানসহ। নিকোলাসের মতোই উত্তেজিত রোয়েন। খাদের ভেতর পাঁচিলে আপনি ওই কুলুঙ্গিগুলো দেখেছেন বলেই সম্পর্কটা ধরতে পেরেছি আমি। নিকোলাস, ওখানে আবার আমাদের যাওয়া দরকার। খোদাই করা ডিজাইনটা দেখতে হবে।
সেজন্য প্রস্তুতি দরকার, বলল নিকোলাস। রশি কাটতে হবে, একটা পুলি সিস্টেম দরকার হবে। সবার সাহায্যে লাগবে।
আপনি প্রস্তুতি নিন, সেই ফাঁকে পাথরটার অনুবাদ শেষ করি আমি… হঠাৎ থেমে গিয়ে আকাশের দিকে তাকালো রোয়েন। শুনুন!
কান পাতলো নিকোলাস, নদীর কলকল ছলছল ছাপিয়ে জেগে উঠলো রোরের আওয়াজ।
পেগাসাস দেখছি পিছু ছাড়ে নি! আসুন! রোয়েনের হাত ধরে ছুটলো ও, ব্রিজ থেকে নেমে সৈকতে চলে এলো। ব্রিজের নিচে সাদা বালিতে বসে থাকলো ওরা, বোল্ডারের আড়াল থাকায় আশা করছে হেলিকপ্টার থেকে ওদেরকে দেখা যাবে না।
লালচে পাহাড় প্রাচীরের ওদিকটায় চক্কর দিল জেট রেঞ্জার হেলিকপ্টার। ওদেরকে পাইলট দেখতে পায় নি, ঘুরে গিয়ে খাদের এদিক থেকে ওদিক টহল দিতে শুরু করলো। তারপর হঠাৎ ইঞ্জিনের আওয়াজ বদলে গেল, কপ্টারের গতি কমে আসছে। পাহাড়ে কোথাও নামছে, ব্রিজের তলা থেকে ক্রল করে বের হবার সময় বলল নিকোলাস। ওদের এ উঁকি-ঝুঁকি মারা আমার ভালো ঠেকছে না।
খুব একটা চিন্তার কিছু আছে বলে মনে করি না, বলল রোয়েন। ডুরেঈদের খুনীদের সঙ্গে পেগাসাসের যদি কোনো সম্পর্ক থাকে, তার ব্যবস্থা পরে এক সময় করা যাবে। প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছেটা আগের মতোই প্রবল রোয়েনের, তবে হাতের জরুরি কাজগুলো প্রথমে সারতে চাইছে। ওদের চেয়ে এগিয়ে আছি আমরা, তাই না? মঠ বা শিলালিপির তাৎপর্য সম্পর্কে ওদের এখনো কোনো ধারণা নেই।
চলুন ক্যাম্পে ফিরি, বলল নিকোলাস। আমি চাই না খাদের কাছাকাছি ওরা আমাদেরকে আবার ঘুরঘুর করতে দেখে ফেলে।
*
গ্যানট্রি বা মোবাইল একটা ক্রেন তৈরি করলো নিকোলাস, ওকে সাহায্য করলো ট্র্যাকার আর স্কিনাররা। ব্লক আর ট্যাকল নেই, তার বদলে ব্যবহার করা হলো কাঠের পোল। স্লিং শীট তৈরির জন্য কুকিং হাট থেকে কেটে আনল এক টুকরো ক্যানভাস, সেটার চার কোণে চারটি ফুটো করে রশি বাঁধা হলো। প্রস্তুতি শেষ করতে বিকেল হয়ে গেল, রোয়েন ছাড়া বাকি সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো নিকোলাস।
গ্যানট্রি আর রশির কুণ্ডলী নিয়ে সেই স্পটে পৌঁছল ওরা, পাহাড়ের কিনারা থেকে যেখানে নিচে লাফ দিয়েছিল ডিক-ডিক। ওখান থেকে রওনা হলো ভাটির দিকে, পাহাড়-প্রাচীরের কিনারা ধরে এগুচ্ছে। এদিকে ঝোঁপ খুব ঘন, ম্যাটিট দিয়ে কাটার জন্য মাঝে মধ্যে থামতে হলো। জলপ্রপাতের আওয়াজ পথ দেখালো নিকোলাসকে। ভাটির দিকে যতই এগুলো, ততই বাড়ছে শব্দটা। তারপর একসময় পানির গর্জনে পায়ের নিচে কাঁপতে শুরু করলো পাথর। খানিক পর কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে ঝুঁকল নিকোলাস, জলোচ্ছ্বাসের সাদা ফেনা দেখে কিফকে বলল, এই জায়গাই। তারপর ব্যাখ্যা করলো ঠিক কী চাইছে ও।
গ্যানট্রি ঠিক কোথায় সেট করা দরকার জানার জন্য ক্যানভাস স্লিং সিটে বসলো নিকোলাস, কিফ বাহিনীকে বলল, কিনারা থেকে বিশ ফুট নিচে নামাও আমাকে। ও জানে, বিশ ফুট নিচ থেকে শুরু হয়েছে ঝুল-পাথর। ওই পয়েন্ট পর্যন্ত নাইলন রশি পাথরে ঘষা খাবে না, তবে ফুলে থাকা পাহাড়-প্রাচীরের গা চারদিকে অনেকটাই দেখতে পাওয়া যাবে।
দেড়শো ফুট নিচে নদীর পাথুরে গহ্বর, পেছন ফিরে শূন্যে ঝুলছে নিকোলাস, পাথরের গায়ে দুই সারি কুলুঙ্গি প্রায় পরিষ্কারই দেখতে পাচ্ছে। তবে পাঁচিলের গায়ে খোদাই করা ডিজাইন ফুলে থাকা পাথরের আড়ালে থেকে গেল। কিফকে সংকেত দিতে স্লিং সিট ওরে তুলে নিল ওরা।
গ্যানট্রি আরো নিচের দিকে সেট করতে হবে। জিনিসপত্র তুলে নিয়ে ঝোঁপ ভেঙে আবার এগুলো ওরা, পাহাড়-প্রাচীরের কিনারা ধরে। দাঁড়াও! হঠাৎ চিৎকার করলো নিকোলাস। ঝোঁপগুলো এদিকে খাটো কেন? পরীক্ষা করে দেখার পর ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো। পাহাড়-প্রাচীরের এদিকের কিনারা ক্ষয়ে গেছে, ফলে পাথুরে জমিন পেছনের চেয়ে অনেক বেশি ঢালু। নিকোলাস ধারণা করলো, সম্ভবত এ জায়গা থেকে প্রাচীন মাচা নিচে নামানো হয়েছিল। আর সামনে এগোবার দরকার নেই। এখানেই গ্যানট্রি সেট করব আমরা।
ঝোঁপ-ঝাড় কেটে জায়গাটা পরিষ্কার করতে হলো। গ্যানট্রি সেট করার পর হাতে আর সময় থাকলো না, সন্ধ্যে হয়ে আসছে।
