সেবারও এরকমই হয়েছিল। প্রথমে স্থবিরতা; তারপর বহু পরে রাগ আর ব্যথা, এবার কালো ঢেউয়ের মত ধেয়ে এল রাগ। তাতে খানিকটা উপশম হল সেনটেইনের গাঢ় চোখে অপমানের হাসি দেখার জ্বালা।
“আমরা ওদেরকে থামাতে পারি না, পা? জানতে চাইল ম্যানফ্রেড। কিন্তু কেউই বলল না “ওরা” কারা। নিজেদের শত্রুকে দুজনেই চেনে।
প্রচণ্ড রাগের তোড়ে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন লোথার। মাথা নাড়লেন কেবল।
“একটা না একটা পথ নিশ্চয় আছে।” আবারো বলে উঠল ম্যানফ্রেড। “আমাদের শক্তি আছে।” মনে পড়ল হাতের নিচে দুর্বল হয়ে পড়া শাসার কথা। আনমনেই হাত ভাজ করল ছেলেটা, “এটা তো আমাদের, পা। এই জমি আমাদের। ঈশ্বর আমাদেরকে দিয়েছেন। বাইবেলেও তো সে কথাই লেখা আছে।” তার পূর্বসূরিদের মত ম্যানফ্রেডও বাইবেলকে নিজের মত করেই ব্যাখ্যা করেছে।
বাবাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে শার্টের হাতা ধরে নাড়া দিল ম্যানফ্রেড, “ঈশ্বর তো এটা আমাদেরকে দিয়েছেন। তাইনা পা?”
“হ্যাঁ।” মাথা নাড়লেন লোথার।
“আর তারপর ওরা আমাদের কাছ থেকে এটা চুরি করে নিয়ে গেছে, পুরো জমি। হীরে, সোনা সবকিছু। এবারে আমাদের নৌকা আর মাছগুলোও নিল। ওদেরকে থামাবার নিশ্চয়ই কোনো পথ আছে।”
“ব্যাপারটা আসলে এত সহজ নয়।” ছেলের কাছে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলেন লোথার। উনি নিজেই তো পুরো ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারছেন না। তাই বললেন, “তুমি যখন বড় হবে নিজেই সবকিছু বুঝতে পারবে ম্যানি।”
বড় হলে ওদেরকে হারাবার পথ ঠিকই বের করে ফেলব।” ম্যানফ্রেড এত জোর দিয়ে কথাটা বলল যে শুকনো ঠোঁট ফেটে রুবির মত লাল ফোঁটা বের হল।
“ওয়েল, বাছা, হয়ত তুমি ঠিকই পারবে।” ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন লোথার।
“দাদার শপথ মনে নেই পা? আমার মনে থাকবে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কখনো শেষ হবে না।”
সূর্য উপসাগরের পানি স্পর্শ না করা পর্যন্ত দু’জনে একসাথে বসে রইলেন। তারপর অন্ধকার নেমে এলে চলে এলেন কুটিরের কাছে। এগোতেই দেখা গেল চিমনির ধোয়া। হেলে পড়া রান্নাঘরে ঢুকতেই চুলার উপর থেকে চোখ তুলে তাকালেন সোয়ার্ট হেনড্রিক।
“ইহুদিটা টেবিল-চেয়ার নিয়ে গেলেও আমি মগ আর পাতিলগুলো সরিয়ে রেখেছি।”
মেঝেতে বসে সকলে মিলে সোজা পাতিল থেকেই খেয়ে নিলেন গমের পরিজ আর শুকনো নোনা মাছ। শেষ না করা পর্যন্ত কেউ কোনো কথা বলল না।
অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন লোথার, “তোমার রয়ে যাবার তো দরকার ছিল না।”
কাঁধ ঝাঁকালেন সোয়ার্ট। “দোকান থেকে কফি আর ডোবাকো কিনে এনেছি। তুমি যে টাকা দিয়েছ তা একেবারে কাটায় কাটায় যথেষ্ট ছিল।”
“আর কিছু নেই। সব শেষ।”
“আগেও তো হয়েছে এমন।” আগুনের লাকড়ি থেকে পাইপ ধরালেন সোয়ার্ট।
এবারের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার আর কোনো আইভরি নেই, শিকারের জন্য কিংবা-” অন্ধ রাগে আবারো দিশেহারা বোধ করলেন লোথার। টিনের মগে কফি ভরে দিলেন সোয়ার্ট।
“বেশ অদ্ভুত লাগছে।” বলে উঠলেন হেনড্রিক, “আমরা যখন ওকে খুঁজে পেয়েছিলাম পরনে ছিল চামড়ার পোশাক আর এখন দেখো বড়সড় হলুদ গাড়ি নিয়ে এসেছে।” মাথা নেড়ে মিটিমিটি হাসলেন, “অথচ দেখো এখন আমাদেরই পরনে ছেঁড়া ত্যানা।”
“তুমি আর আমি মিলেই তো ওকে বাঁচালাম।” বলে উঠলেন লোথার, “তার চেয়েও বড় কথা, ওর জন্য হিরে খুঁজে দিলাম, মাটি খুঁড়ে এত কষ্ট করে খুঁজে বের করলাম।”
“এখন তো সে ধনী হয়ে গেছে। এবারে বললেন হেনড্রিক, “অথচ আমাদের যা আছে তাও নিতে এসেছে। এটা করা উচিত হয়নি। বিশাল কালো মাথাটা নেড়ে বললেন, “নাহ, এটা একেবারেই ঠিক হয়নি।”
আস্তে আস্তে সোজা হয়ে বসলেন লোথার। সাগ্রহে সামনে ঝুঁকলেন হেনড্রিক। অতঃপর প্রথম বারের মত হাসল ম্যানফ্রেন্ড।
“ইয়েস।” হাসতে শুরু করলেন হেনড্রিক। “এবারে কী তাহলে?”
“না, আইভরি নয়। এবার হবে হিরে।” উত্তর দিলেন লোথার।
“হিরে?” হেনড্রিক আরেকটু হলে হোঁচট খাচ্ছিলেন। “কোন হিরে?”
“কোন হিরে?” হেসে ফেললেন লোথার। জ্বলে উঠল তার হলুদ চোখ জোড়া, “কেন ওর জন্য যে খুঁজে পেয়েছি সেসব হিরে।”
“ওর হিরে?” একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন হেনড্রিক, “হানি খনির হিরে?”
“তোমার কাছে কত টাকা আছে?”
লোথারের কথা শুনে চোখ সরু করে ফেললেন হেনড্রিক। “আমি তোমাকে ভালোভাবেই চিনি।” অধৈর্য ভঙ্গিতে হেনড্রিকের কাঁধে চাপ দিলেন লোথার, “তুমি সব সময় খানিকটা সরিয়ে রাখো। কত আছে?”
“বেশি নয়।” হেনড়িক উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতেই চেপে বসিয়ে দিলেন লোথার।
“শেষ সিজনে তুমি ভালোই কামাই করেছে। আমি তোমাকে কত দিয়েছি তার পাই পয়সা পর্যন্ত আমার হিসাব আছে।”
“পঞ্চাশ পাউন্ড।” স্বীকার করলেন হেনড্রিক।
“না।” মাথা নাড়লেন লোথার, “তার চেয়েও বেশি আছে।”
“হ্যাঁ, হয়ত আরেকটু বেশি। আবার মেনে নিলেন হেনড্রিক।
“তোমার কাছে একশ’ পাউন্ড আছে।” যেন পুরোপুরি নিশ্চিত এমনভাবে জানালেন লোথার, “এইটুকুই আমাদের দরকার। আমাকে দাও। তুমি জানো এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ফেরত পাবে। আগেও তাই পেয়েছো ভবিষতেও পাবে।
***
প্রভাতের প্রমম আলোয় খাড়া পাথুরে পথটা বেয়ে বহুকষ্টে উপরে উঠে এল পুরো দল। লিসবিক নদীর তীরে, পর্বতের একেবারে তলদেশে ইয়েলো ডেইমলারকে রেখে প্রভাতের এই ভূতের মত ধূসর আলোয় পেরিয়ে এসেছে পাহাড়।
