দৌড়ে রান্নাঘরে ছুটলাম আমি। আবারো সফল হয়েছে টাইটার চাতুর্য্য।
গরম দুধ আর মধু মেশালাম একটা পাত্রে। ধীরে ধীরে খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে, অনেকদিন পেটে কিছু পড়েনি আমার কর্ত্রীর। প্রথমে বমি করে ফেলে দিলো সে, পরে আস্তে আস্তে খেতে পারলো। আর একদিন দেরি করে যদি আসতাম, হয়তো বেশি দেরি হয়ে যেতো।
*
দাসী মেয়েগুলোর কল্যাণে মরণের ওপার থেকে আমার প্রত্যাবর্তনে খবর গুটিবসন্তের মতো ছড়িয়ে পড়লো সমগ্র দ্বীপে।
রাত নামার আগেই আতনকে দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠালেন ফারাও। এমনকি সে পর্যন্ত কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করতে লাগলো আমার সাথে। আমি ছুঁতে চাইলে কেঁপে উঠে সরে গেলো, যেনো আমি কোনো অপার্থিব শক্তি। ওর পিছু পিছু প্রাসাদে যাওয়ার পথে দাস, সভাষদেরা ভয়ে ভয়ে দেখতে লাগলো আমাকে।
শ্রদ্ধা এবং ভয়ের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আমাকে স্বাগত জানালেন ফারাও।
কোথায় ছিলে তুমি, টাইটা? এমনভাবে করলেন প্রশ্নটা, যেনো উত্তর না শুনতে পেলে বেঁচে যান।
তার পায়ে পড়লাম। স্বর্গীয় ফারাও, আপনি নিজে যেখানে দেবত্বের প্রতিনিধি, সম্ভবত আমাকে পরীক্ষা করার জন্যে প্রশ্ন করেছেন। আপনি তো জানেন, আমার মুখ বন্ধ। ওইসব রহস্য নিয়ে আমার বলাটা ধৃষ্টতা। দয়া করে আপনার সঙ্গী দেবতা বিশেষ করে, সমাধি-দেব আনুবিসকে জানাবেন, আমার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করেছি। বলবেন, আপনার নেওয়া পরীক্ষা আমি পাশ করেছি।
চিন্তিত চেহারায় বসে রইলেন রাজা। বিলক্ষণ বুঝতে পারছি, প্রশ্নের পর প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে তার মনে; কিন্তু একে একে সেগুলোকে গিলে ফেলছেন উনি। আমি আসলে কোনো ফাঁক রাখিনি তার জন্যে।
শেষমেষ, নিরাসক্ত ভঙ্গিতে মুখ খুললেন ফারাও। সত্যিই, টাইটা। আমার নেওয়া পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েছো তুমি । স্বাগতম। তোমার অভাব আমরা অনুভব করেছি। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, আমার আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পর্কে আরো নিশ্চিত হলেন তিনি।
কাছে ঘেঁষে, ফিসফিস করে তার কানে বললাম, মহান মিশর, আপনি জানেন, কেননা আমাকে ফেরত পাঠানো হলো?
দ্বিধান্বিত চেহারায় মাথা আঁকালেন ফারাও। পায়ের উপরে দাঁড়িয়ে সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক চাইলাম আমি যেনো কোনো অতীন্দ্রিক শক্তির অস্তিত্ব আশঙ্কা করছি। বুকে খারাপ শক্তির বিপরীতে চিহ্ন এঁকে বলে চললাম, কর্ত্রী লসট্রিস। তাঁর অসুস্থতা আসলে ছিলো মুখে কিছু না বলে দুই আঙুলে চিহ্ন আঁকলাম আমি, অন্ধকারের দেবতা সেথ্-এর।
দ্বিধা থেকে এবারে আশঙ্কায় রূপ নিলো রাজার অভিব্যক্তি, কেঁপে উঠে আমার নিকটে ঝুঁকলেন; ওদিকে আমি বলতে লাগলাম, আমাকে নিয়ে যাওয়ার আগে, কর্ত্রীর পেটে ছিলো মহান ফারাও-এর সন্তান। এমন সময় অন্ধকারের দেবতা নষ্ট করে দিয়েছেন ওটাকে।
ভীষণ দেখালো ফারাও-এর মুখাবয়ব। তো, এরই কারণে অমন হয়েছে বলে থেমে গেলেন।
চতুরতার সাথে কথা এগিয়ে নিলাম আমি। ভয় করবেন না, মহান মিশর। অন্ধকারের দেবতার চেয়ে অনেক শক্তিশালী দেবতাদের ইশারায় ফিরে এসেছি আমি, কেবল ওকে বাঁচাতে। যাতে করে আমন রার ধাঁধা সত্যি হয়। আরো একটি পুত্র-সন্ত নি হবে আপনার, বংশধারা রক্ষা পাবে।
তবে তো সুস্থ্য না হওয়া পর্যন্ত লসট্রিসকে কাছছাড়া করা ঠিক হবে না তোমার, আবেগে কেঁপে গেলো ফারাও-এর গলা। যদি ওকে বাঁচাতে পারো, আর আরো একটা পুত্র-সন্তান হয় আমার যা ইচ্ছে পাবে তুমি। কিন্তু যদি ওর কিছু হয় এই পর্যায়ে এসে থেমে গেলেন তিনি। সম্ভবত ভাবলেন, মৃত্যুর ওপার থেকে যে ফিরে এসেছে, তাকে আর কিসের ভয় দেখাবেন?
আপনি অনুমতি দিলে, মহান ফারাও, এই মুহূর্তেই আমি ওর কাছে ফিরে যেতে চাই।
এই মুহূর্তে! ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন রাজা। যাও, যাও!
*
বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে সুস্থ্য হয়ে উঠলো আমার কর্ত্রী। নিজেরে ভেতরে অনাবিকৃত কোনো অতীন্দ্রিক শক্তির কথা ভেবে আমি একটু আত্মপ্রসাদ বোধ করেছিলাম বৈকি।
যেনো চোখের সামনে মাংস লাগলো লসট্রিসের হাড় জিড়জিড়ে শরীরে। বিবর্ণ, ঝুলে পড়া ত্বকে ফিরে এলো ভরাটে উজ্জ্বলতা। বুক জোড়া ফিরে পেলো তাদের অসাধারণ গোলাকার অবয়ব, এতো চমৎকার জোড়া বোধকরি দরোজার কাছে দেওয়ালে আঁকা হাপির মূর্তিরও নেই। রিনিঝিনি হাসিতে আবারো প্রাণ ফিরে এলো আমাদের জল-বাগানে।
বিছানায় ধরে রাখা সম্ভব হলো না লসট্রিসকে। গজ-দ্বীপে আমার ফিরে আসার তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই দাসীদের সাথে খেলাধুলোয় মত্ত হতে লাগলো সে, নাচে-গানে, লাফ-ঝাপে মুখরিত করে ফেললো হারেম প্রাঙ্গন। আমার ভয় হতে লাগলো, না জানি নিজের কোনো ক্ষতি করে ফেলে মেয়েটা । বিছানায় ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিতে একটা শর্তে মেনে নিলো সে। ওর সাথে হয় গান গাইতে হবে আমার নয়তো বাও খেলার নতুন কোনো কৌশল শিখিয়ে দিতে হবে। আজকাল আতনের সঙ্গে খেলায় জয়ের সুবাস পেতে শুরু করেছে লসট্রিস, দু জনেই বেশ আসক্ত এখন ওই খেলায়।
প্রায় প্রতি সন্ধাতেই রাজার প্রতিনিধি হিসেবে লসট্রিসের স্বাস্থ্যের খবরাখবর নিতে আসে আতন। পরে বাও খেলতে বসে আমাদের সাথে। শেষমেষ আমাকে বিপদজনক ভূত হিসেবে দেখা বাদ দিয়েছে সে, তবে নতুন এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ তার আচরণে স্পষ্ট।
