প্রতি সকালেই নতুন করে প্রতিজ্ঞা করতে হয় লসট্রিসের কাছে। এরপর অখণ্ড মনোযোগের সাথে আয়নায় নিজের অবয়ব পরীক্ষা করে সে, চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখে এখন তার রূপ ট্যানাসের দর্শানুপযোগী হয়েছে কিনা।
আমার চুলগুলো একদম খড়ের মতো হয়ে গেছে, আর গালেও একটা পুঁটুলি দেখছি, অনুতাপ করে বলতো সে। আবার আমাকে সুন্দরী করে দাও, টাইটা। ট্যানাসের জন্যে, আমাকে আবার সুন্দর হতে হবে যে!
নিজের ক্ষতি করে এখন টাইটাকে ডাকছো, আমি বলতেই হেসে, দুই হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরতোলসট্রিস।
তুমি তবে আছো কিসের জন্যে? আমার খেয়াল রাখাই ভোমার কাজ, বুঝলে!
প্রতি সন্ধাতে যখন বিশেষ শক্তিবর্ধক মিশ্রণ নিয়ে আসতাম ওর জন্যে, প্রতিবার আমার প্রতিজ্ঞা পুনরায় করিয়ে নিতে মিসট্রেস। শপথ করে বলো–ট্যানাসকে তুমি নিয়ে আসবে আমার কাছে, ঠিক যখন আমি তৈরি হবো।
এই প্রতিজ্ঞা পালন করতে হলে কী ধরনের বিপদের মুখোমুখি হতে হবে, মনে মনে সেগুলো উড়িয়ে দিতে চাইলাম আমি। শপথ করলাম। প্রতিদিন বাধ্যগতের মতো বলতাম। আইভরির বিছানায় তখন ঘুমিয়ে পড়তে লসট্রিস, ঠোঁটে অদ্ভুত এক টুকরো হাসি নিয়ে। সময় এলে তখন ভাবা যাবে, কী ভাবে কী করা যায়।
*
আতনের কাছে লসট্রিসের দ্রুত আরোগ্যলাভের খবর পেয়ে সরেজমিনে দেখতে এলেন ফারাও। স্বর্ণ এবং ল্যাপিস-লাজুলিতে তৈরি ঈগলের আকারের একটা হার নিয়ে এলেন তিনি লসট্রিসের জন্যে। সন্ধ্যা পর্যন্ত শব্দের খেলা, ধাঁধা নিয়ে ব্যস্ত রইলেন ওর সাথে। যাওয়ার সময়ে আমাকে ডেকে নিয়ে তাঁর প্রকোষ্ঠ পর্যন্ত হেঁটে গেলেন।
ওর পরিবর্তন দেখেও বিশ্বাস হয় না। এ যে অভূতপূর্ব ব্যাপার, টাইটা। কবে আবার বিছানায় নিয়ে যেতে পারবো তাকে দেখে তো মনে হয়, এখনই আমার সন্তান পেটে নেওয়ার জন্যে একেবারে তৈরি সে।
এখনো নয়, মহান মিশর। কঠোর স্বরে বললাম তাকে। সামান্য পরিশ্রমে আবারো অসুস্থ্য হয়ে পড়তে পারে ও।
এখন আর আমার কোনো কথায় প্রশ্ন করেন না ফারাও, মৃতের জগত থেকে ফিরে আসায় নতুন ক্ষমতা পেয়েছি আমি।
ধীরে ধীরে দাসী মেয়েগুলোও সহজ হয়ে এলো। এখন আর আমার প্রত্যাবর্তন, প্রাসাদের জল্পনা-কল্পনার বিষয় নয়। অন্য একটি বিষয় পেয়ে গেছে তারা। নীল নদের তীরবর্তী প্রতিটি মানুষের জীবনে এখন আকহ্ হোরাস একটি অবাক নাম।
প্রথম যেদিন প্রাসাদের গলিপথে ওই নাম উচ্চারিত হতে শুনেছিলাম, তেমন কিছু ভাবিনি। লোহিতসাগরের পার্শ্ববর্তী তিয়ামাতের বাগান যেনো কতোকাল আগের কথা। হুই যে এই নাম দিয়েছে ট্যানাসকে কবেই ভুলে গেছি আমি। কিন্তু, পরে যখন এই হঠাৎ-দেবতার কাণ্ড-কীর্তি শুনলাম, আচমকা সব মনে পড়লো।
উত্তেজনার প্রাবল্যে দৌড়ে হারেমে ফিরে চললাম, দর্শনার্থী পরিবেষ্টিত অবস্থায় জল-বাগানে পেলাম মিসট্রেসকে।
নিজের অবস্থান ভুলে, জোর করে তাড়িয়ে দিলাম সবাইকে। পরিমরি করে পালালো রাজ-বধূ, জমিদার-পত্নীরা। লসট্রিস ক্ষেপে গেলো আমার এহেন ব্যবহারে।
একি করলে, টাইটা? কি হয়েছে তোমার?
ট্যানাস! যেনো মন্ত্র জপার মতো কথাটা উচ্চারণ করলাম আমি। সাথে সাথেই সব ভুলে আমার হাত চেপে ধরলো লসট্রিস।
তোমার কাছে খবর আছে ওর? তাড়াতাড়ি বলো! না হয় মরেই যাবো!
খবর? হ্যাঁ, খবর তো আছে। কী খবর! কী কীর্তি! কী অবিশ্বাস্য ঘটনা!
হাত ছেড়ে দিয়ে হাত-পাখা তুলে নিলো মিসট্রেস। এই মুহূর্তে তোমার বকবক বন্ধ করো, অস্ত্র হিসেবে হাত-পাখাটা ব্যবহার করলো সে। এ রকম করে আমাকে জ্বালাবে না। এক্ষুনি বলল, না হয় মাথা ফাটিয়ে দেবো।
চলো! আড়ালে গিয়ে বলি! হাত ধরে নৌকা ঘাটে নিয়ে গেলাম ওকে। আমাদের ছোট্ট নৌকাটাতে চড়ে, মাঝ-নদীতে ভেসে এসে তবেই মুখ খুললাম।
পুরো দেশ জুড়ে পরিষ্কার-সজীব বাতাস বইতে শুরু করেছে, বললাম ওকে। সবাই ওটাকে বলছে, আকহ্ হোরাস।
হোরাসের ভাই, শ্বাস টেনে বললো লসট্রিস। ওরা কি এখন এই নামে ডাকে ট্যানাসকে?
কেউ জানে না ওটা ট্যানাস। সবার ধারণা, এ হলো এক দেবতা।
ও তো তা-ই, জোর দিয়ে বললো মিসট্রেস। আমার কাছে ও অবশ্যই দেবতা।
হুমম। যদি তা না-ই হবে, তাহলে ও কেমন করে জানে কোথায় লুকিয়ে আছে শ্ৰাইকের দল? কেমন করে ওদের ভেঁরায় আঘাত হানছে সে? কেমন করে জানতে পারছে, ক্যারাভান পথের কোথায় কোথায় ওঁত পেতে আছে দস্যুরা?
এত্তো কিছু ও একা করেছে? অবাক হয়ে জানতে চায় লসট্রিস।
আরো বহু কিছু। যদি কান কথায় বিশ্বাস করো। সবাই বলাবলি করছে, সমস্ত চোর আর লুটেরার দল আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। একের পর এক শ্ৰাইক বাহিনী পর্যন্ত হয়ে চলেছে। তারা বলছে, আকহ্ হোরাস-এর পাখা আছে, ঠিক ঈগলের মতো, জেবেল-উম-বাহরির প্রচণ্ড খাড়া পাহাড়ের গা টপকে হঠাৎ সে দেখা দিয়েছে নিষ্ঠুর বাস্তির দলের মধ্যে। নিজ হাতে পাঁচশদস্যুকে সে ফেলে দিয়েছে পাহাড়ের চূড়া থেকে।
আরো বলো! হাততালি দিয়ে বললো লসট্রিস, আর একটু হলেই উল্টে গিয়েছিলো নৌকাটা।
সবাই বলাবলি করছে, প্রতিটি রাস্তার বাঁকে, ক্যারাভান পথের মোড়ে নিজের মূর্তি রেখে গেছে সে। নিজের অবস্থানের নিশান।
মূর্তি? কিসের মূর্তি?
মানুষের করোটির স্তূপ, পিরামিডের মতো করে সাজানো। যে সমস্ত দস্যুর প্রাণ হরণ করেছে সে, তাদের সবার মুণ্ডু যাতে করে বাকিরা সতর্ক হয়ে যায়।
