এ সবই সত্যি; কিন্তু তাকে নির্দেশ তো দিতো আকহ সেথ।
কেউ তা বিশ্বাস করবে না, এমনকি ফারাও পর্যন্ত না; যতক্ষণ না বাস্তি নিজ মুখে স্বীকার করছে, অধৈৰ্য্য ভঙ্গিতে বললাম। একরোখা আচরণ করে কী লাভ? বহুবার এই নিয়ে কথা বলেছি আমরা। প্রথমে, বাহিনীর নেতারা; সবশেষে সাপের মাথা-আকহ্ সেন্থ।
জানি, ঠিক বলছো। কিন্তু অপেক্ষা করতে ইচ্ছে হয় না। নিজের উপর বর্তানো দেশদ্রোহীর খেতাব মুছে ফেলতে চাই আমি, আর আর–ওহ্, লসট্রিসকে চাই আমি!
ঝুঁকে পড়ে আমার কাঁধে চেপে ধরে সে। এখানে তোমার কাজ শেষ, বুড়ো বন্ধু। তোমাকে ছাড়া এসব সম্ভব হতো না। তুমি না এলে, এখনো মদে ডুবে থাকতাম। পরে থাকতাম কোনো নোংরা বেশ্যাকে নিয়ে। তোমার ঋণ শোধ হওয়ার নয়, কিন্তু এখন তোমাকে যেতে হবে। অন্য কারো প্রয়োজন তোমাকে। বাস্তি আমার, আর কেউ তাকে ছুঁতেও পারবে না। জেবেল-উম-বাহারি মরুতে তুমি আসছো না আমাদের সাথে। যেখানে তোমার থাকা উচিত আমারও থাকার কথা, কিন্তু যেতে পারি না-ওখানে ফিরে যাও; লসট্রিসের পাশে।
আমার ওজোর-আপত্তি, প্রতিবাদে কোনো কাজ হলো না। একবার যখন মন ঠিক করে ফেলেছে ট্যানাস, তখন ওকে আর কিছু বলে লাভ হবে না ।
একটা কথা ঠিকই বলেছে ট্যানাস–এই মুহূর্তে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে এখানে। আমি কোনো যোদ্ধা নই। তবে সাথে সাথেই চলে গেলে, আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা হতে পারে সবার।
শেষমেষ, নিজের ভেতরের উচ্ছ্বাস গোপন করে গজ-দ্বীপে ফিরে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করলাম।
*
জেবেল-উম-বাহারি মরুতে অভিযানের জন্যে লোকবল এবং রসদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ক্ৰাতাসকে কারনাকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্যানাস। তার পাহাড়ায় অন্তত কারনাক পর্যন্ত যেতে পারবো আমি। এদিকে, ট্যানাসের থেকে বিদায় নেওয়াটা বিশেষ ঝক্কি হয়ে দাঁড়ালো। দু বার তিয়ামাতের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে বেরুতে পিছন থেকে ডেকে নিলো ট্যানাস। লসট্রিসের জন্যে বার্তা আছে ওর।
ওকে বলো, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত আমি ওর কথা ভাবি!
ওটা তো বলেছো একবার, প্রতিবাদ করে বললাম।
বলবে, ওর মিষ্টি মুখটা আমার স্বপ্ন-জাগরণে এখনো অম্লান।
এটাও বলেছো। নতুন কিছু বলার থাকলে বলো, না হয় যেতে দাও আমাকে।
ওকে বলবে, আমন রা র ধাঁধা আমি বিশ্বাস করেছি, আর মাত্র বছর পাঁচেক পর আমরা একসাথে থাকতে পারবো–
ক্রাতাস আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। এখানে যদি আটকে রাখো আমাকে, কেমন করে এগুলো বলবো লসট্রিসকে?
ক্ষান্ত দেয় ট্যানাস। আমি না দেখা পর্যন্ত ভালো খেয়াল নিয়ে ওর। যাও, তাড়াতাড়ি!
ক্রাতাসকে সামনে রেখে, ছুটে চললো আমাদের ছোট্ট বাহিনী। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে কারনাকে পৌঁছে গেলাম আমরা। র্যাসফার বা ইনটেফের কোপানল থেকে বাঁচতে যতোটা সম্ভব কম সময় থাকলাম থিবেসে। প্রথম সুযোগেই দক্ষিণগামী জাহাজে চড়ে বসলাম। ওদিকে, ক্ৰাতাস ব্যস্ত হয়ে পড়লো ট্যানাসের অভিযানের জন্যে একহাজার শক্ত যোদ্ধা খুঁজে বের করতে।
পালে উত্তুরে হাওয়া নিয়ে তরতর করে বয়ে চললো আমাদের জাহাজ। থিবেস ছাড়ার বারোতম দিনে পুব গজ-দ্বীপের ঘাটে ভীড়লাম। এখনো, পুরোহিতের পরচুলা এবং পোশাক পরে আছি, তাই কেউ চিনতে পারলো না আমাকে।
ছোট্ট একটা তামার আংটির বিনিময়ে ফেলুচা ভাড়া করে নদী পাড়ি দেয় পৌঁছে গেলাম রাজকীয় দ্বীপে। হারেমে, আমাদের বাগানের ঘাটে চলে এলাম। সিঁড়িপথ ধরে উঠার সময় পাগলের মতো বাজতে শুরু করলো আমার হৃদয়। অনেকটা সময় আমার কর্ত্রীর কাছ থেকে দূরে সরে ছিলাম। বিচ্ছেদের কালে বুঝতে পেরেছি, ওর প্রতি আমার অনুভূতি কতো প্রবল। আমি নিশ্চিত জানি, আমার আবেগের কাছে ট্যানাসের ভালোবাসা যেনো মরুর ঝড়ের বিপরীতে নদীর মৃদুমন্দ বাতাসের মতো।
লসট্রিসের একজন কূশ দেশীয় দাসী মেয়ে প্রথমে দরোজায় দেখতে পেলো আমাকে। ঢুকতে দিচ্ছে না সে আমাকে। আমার কর্ত্রী অসুস্থ-হে পুরোহিত। এই মুহূর্তে একজন কবিরাজ আছেন ভেতরে, আপনি যেতে পারবেন না।
অবশ্যই পিরবো, ওকে বললাম। এক টানে মাথার পরচুলা খুলে ফেলতে চিৎকার করে উঠলো সে, টাইটাএবারে হাঁটু ভাজ করে বসে পরে শয়তানের বিপরীতে চিহ্ন আঁকলো। তুমি তো মরে গেছে। এটা টাইটা নয়, তার ভুত!
এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে মিসট্রেসের ব্যক্তিগত কক্ষের দিকে চললাম আমি। ওসিরিসের মন্দিরের হাতুড়ে-চিকিৎসকদের একজন দরোজায় আঁকালো।
তুমি এখানে কি করছো? জানতে চাইলাম, এই হাতুড়েগুলো আমার কর্ত্রীর আশেপাশে রয়েছে ভেবেই শঙ্কিত হয়ে পড়েছি। সে উত্তর দেওয়ার আগেই গর্জে উঠলাম, বেরোও এখান থেকে! ওই তুকতাক, মন্ত্র-ফন্ত্র নিয়ে বিদায় হও!
এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে সোজা ঢুকে পড়লাম ভেতরে।
অসুস্থতার গন্ধ ভাসছে বাতাসে শক্তিশালী, তিক্ত বুনো দুঃখবোধ ঘিরে ধরলো আমাকে যখন মিসট্রেসের দিকে চোখ পড়লো। আকৃতিতে ছোট্ট হয়ে গেছে ও, পুরোনো ছাই-এর মতো বিবর্ণ গায়ের ত্বক। ঘুমে অথবা আচ্ছনে আছে সে, কোন্ টা ঠিক নিশ্চিত নই আমি। দুই চোখের নিচে নীলা-ফোলা ছায়া। ঠোঁটদুটো শুকনো, দাগ পড়া দুঃখে বুকটা ফেটে যেতে চাইলো।
গায়ের চাদরটা সরিয়ে দিতে দেখলাম, সম্পূর্ণ নগ্ন ও। আতঙ্ক খামচে ধরলো আমার হৃদয়। ঠিক বুকের হাড়ের মতোই সরু হয়ে গেছে ওর হাত-পা; অসুস্থ চামড়া ঠেলে বেরিয়ে এসেছে কোমড়ের হাড়। বগলের তলায় হাত নিয়ে তাপমাত্রা বুঝতে চাইলাম-ঠাণ্ডা শরীর। কি ধরনের রোগ হতে পারে এটা ভাবতে বসলাম। আগে কখনো এ ধরনের কিছু দেখিনি।
